কওমি মাদরাসায় শারীরিক শাস্তি পুরোপুরি নিষিদ্ধ
কওমি মাদরাসাভিত্তিক সর্বোচ্চ শিক্ষা বোর্ড আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ দেশের সব কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দেশের ছয়টি কওমি মাদরাসা বোর্ড ও অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থী সুরক্ষা কমিটি গঠন ও কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) আল-হাইআতুল উলয়ার চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসানের নির্দেশে অফিস ব্যবস্থাপক মু. অছিউর রহমান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এসব নির্দেশনা জানানো হয়।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের শাসনের মূল উদ্দেশ্য হবে তাদের সংশোধন ও কল্যাণ নিশ্চিত করা। কোনোভাবেই প্রতিশোধমূলক আচরণ করা যাবে না। বিশেষ করে রাগ বা উত্তেজনার সময় কোনো শিক্ষার্থীকে শাস্তি দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
শিক্ষার্থীর ভুল সংশোধনে প্রথমে নম্রভাবে সতর্ক করা এবং প্রয়োজন হলে মৃদু ভর্ৎসনা বা ধমকের মাধ্যমে সংশোধনের চেষ্টা করতে বলা হয়েছে। এরপরও প্রয়োজন হলে অভিভাবককে ডেকে বিষয়টি লিখিতভাবে জানিয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে কোনো পর্যায়েই শিক্ষার্থীকে প্রহার করা যাবে না।
লাঠি, বেত বা অন্য কোনো বস্তু দিয়ে আঘাত করা, মুখমণ্ডল, মাথা বা স্পর্শকাতর স্থানে আঘাত করা এবং হাড় ভাঙা, রক্তপাত বা শরীরে দাগ সৃষ্টি হতে পারে—এমন সব ধরনের শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
শুধু শারীরিক শাস্তিই নয়, শিক্ষার্থীদের প্রকাশ্যে অপমান, গালমন্দ, কটু ভাষায় সম্বোধন, অবমাননাকর নামে ডাকা কিংবা যেকোনো ধরনের মানসিক নির্যাতন থেকেও বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অমান্যকারী শিক্ষক বা শিক্ষিকাকে শরিয়ত ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী জবাবদিহির আওতায় আনা হবে বলে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া সব মাদরাসায় ছাত্র-ছাত্রী সুরক্ষা কমিটি গঠন বা পুনর্গঠন করে তা সক্রিয় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অসদাচরণ, নির্যাতন কিংবা হয়রানির অভিযোগ থাকলে তা কমিটির কাছে জানানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
অভিযোগ পাওয়ার পর সাত দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে। গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত চলাকালে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার কথাও বলা হয়েছে।
কোনো মাদরাসায় সুরক্ষা কমিটি না থাকা, কমিটি নিষ্ক্রিয় থাকা কিংবা অভিযোগ পাওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ইলহাক স্থগিত বা বাতিলের কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে সতর্ক করেছে আল-হাইআতুল উলয়া।
নির্দেশনায় শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত ইসলাহি মজলিস আয়োজনের পাশাপাশি নবনিযুক্ত শিক্ষকদের জন্য বাধ্যতামূলক তারবিয়াতি মজলিস এবং অভিভাবক-সমাবেশ বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের মধ্যে যোগাযোগ ও আস্থার সম্পর্ক আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া মাদরাসাবিরোধী অপপ্রচার প্রতিরোধে প্রতিটি বোর্ডকে অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম তদারকির জন্য পৃথক ‘মাদরাসা মনিটরিং সেল’ গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ গ্রহণের জন্য পৃথক হটলাইন চালুর কথাও বলা হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পর বোর্ড, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও সুরক্ষা কমিটিকে সমন্বিতভাবে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।
শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রার্থীর চরিত্র ও বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মিথ্যা অপবাদ, ভিত্তিহীন সংবাদ বা মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার নিরপরাধ শিক্ষক, শিক্ষিকা, মুহতামিম বা প্রতিষ্ঠানের জন্য বোর্ডগুলোর আইনজীবী প্যানেলের মাধ্যমে আইনগত প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রয়োজনে আল-হাইআতুল উলয়ার কেন্দ্রীয় হটলাইন ০১৭০০-৭৬৩১৭৮ (হোয়াটসঅ্যাপ) নম্বরে যোগাযোগ করা যাবে বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
আল-হাইআতুল উলয়া জানিয়েছে, কোনো ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে অপরাধ বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করা এবং অপরাধীকে কোনো ধরনের প্রশ্রয় না দেওয়াই তাদের নীতি। একই সঙ্গে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনার দায় পুরো কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী কিংবা আলেম-উলামার ওপর চাপিয়ে দেওয়াকে তারা যৌক্তিক মনে করে না।
.png)