ঢাকা,  রোববার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ বিনোদন ]

নূতন ৫৬ বছর ধরে স্বীকৃতি পাওয়ার আশায়

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ০০:১০, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নূতন ৫৬ বছর ধরে স্বীকৃতি পাওয়ার আশায়
ছবি: সংগৃহীত

যার যৌবন কেটেছে পর্দার আলোয়, ক্যামেরার সামনে যার জীবনের ৫৬টি বছর পেরিয়ে গেছেসেই নায়িকা নূতনের হৃদয়ে আজও রয়ে গেছে একটি না পাওয়ার গল্প। সময় তাকে কিংবদন্তির মর্যাদা দিয়েছে, দর্শক দিয়েছে ভালোবাসা; অথচ রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ স্বীকৃতির তালিকায় তার নাম এখনো যেন অসম্পূর্ণ এক অধ্যায়।

দীর্ঘ অভিনয় জীবনে একবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন নূতন। তাও শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব চরিত্রের জন্য। অথচ তার পথচলার পরিধি ছোট নয়। নৃত্যের ছন্দ, অভিনয়ের বহুমাত্রিকতা আর নিজের জায়গা তৈরি করার একরোখা জেদ নিয়ে তিনি পেরিয়েছেন চলচ্চিত্রের দীর্ঘ পথ। ‘নতুন প্রভাত’ দিয়ে শুরু, এরপর ‘ওরা ১১ জন’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘ফকির মজনু শাহ’, ‘রাজদুলারী’, ‘অলংকার’, ‘স্ত্রীর পাওনা’সহ বহু চলচ্চিত্রে তার উপস্থিতি ছিল উজ্জ্বল ও স্মরণীয়। অভিনয়ের স্বতন্ত্রতা আর পর্দায় সাবলীল উপস্থিতির মাধ্যমে তিনি জায়গা করে নিয়েছিলেন দর্শকের হৃদয়ে।

কিন্তু এত বছর পরও তার মনে প্রশ্নতাকে কি সত্যিই তার যোগ্যতা অনুযায়ী ব্যবহার করা হয়েছিল? সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সেই পুরোনো অভিমানই যেন আবার ঝরে পড়েছে তার কণ্ঠে। নূতন বলেছেন, চলচ্চিত্রে তাকে ঠিকমতো ব্যবহার করা হয়নি। অভিনয়ের যে সামর্থ্য তার ভেতরে ছিল, তা মেলে ধরার সুযোগও পাননি। নৃত্য জানতেন, তাই নৃত্যের জন্য ডাক এসেছে; কিন্তু একজন অভিনেত্রী হিসেবে তার ভেতরের গল্পটি পর্দায় তুলে ধরার মানুষ খুব বেশি ছিলেন না।

Advertisement

সবচেয়ে বড় আক্ষেপ প্রকাশ করে নূতন জানান, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত এবং কালজয়ী মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ ছিলেন তিনি। অথচ সেই চলচ্চিত্রের অবদানের জন্য যখন অন্যদের পুরস্কৃত বা সম্মানিত করা হয়, তখন তার নামটি বারবার বাদ পড়ে যায়। নূতন প্রশ্ন তোলেন, অনেকের সঙ্গে তো কাজ করেছি। ‘ওরা ১১ জন’-এর মতো ইতিহাসের অংশ হওয়া সত্ত্বেও আমার নাম কেন কেটে দেওয়া হয়? আমি কেন সম্মাননা পাব না?

এটিই প্রথম নয়, এর আগেও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং আজীবন সম্মাননা দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন এই অভিনেত্রী। সিনেমার পেছনে নিজের জীবনের সুবর্ণ ৫০টি বছর বিলিয়ে দেওয়ার পর আজীবন সম্মাননা পাওয়ার জন্য আর কী কী ‘অজানা’ যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হয়, তা নিয়েও চলচ্চিত্র জুরি বোর্ডের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলেন তিনি।

নূতনের এই ক্ষোভ কেবল তার একার নয়, বরং বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের বহু সিনিয়র ও প্রবীণ শিল্পীর ভেতরের জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসেরই বহিঃপ্রকাশ। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এই ইন্ডাস্ট্রির নিয়মই এমন, মানুষ বেঁচে থাকতে তার খোঁজ নেয় না। যখন আমরা মারা যাব, তখন সংবাদপত্রে বড় বড় ছবি ছাপা হবে, আমাদের ভালো কাজের গুণগান গাওয়া হবে। কিন্তু বেঁচে থাকতে কেন এই মূল্যায়নটুকু করা হয় না?

সম্মাননা না পাওয়ার তীব্র কষ্ট থাকলেও সিনেমার প্রতি নূতনের ভালোবাসা এতটুকু কমেনি। শত অবহেলার পরও তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, ‘আমি মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এই চলচ্চিত্রের সঙ্গেই থাকতে চাই।’ আজও তাই অপেক্ষা করেন একটি স্বীকৃতির। তবে মৃত্যুর পর নয়, বেঁচে থাকতেই সেটি চান। তিনি বলেন, যে শিল্পী সারাজীবন আলো জ্বালিয়ে রাখেন, সেই আলো নিভে যাওয়ার পর তার পরিবারের হাতে পুরস্কার তুলে দিয়ে কী হবে? নূতনের এই আক্ষেপ আসলে একটি ট্রফির জন্য নয়। এটি একজন শিল্পীর জীবদ্দশায় তার শ্রম, ত্যাগ আর অস্তিত্বকে স্বীকার করে নেওয়ার আকুতি।গুণী শিল্পীদের তাদের জীবদ্দশায় যোগ্য সম্মান দেওয়া না হলে, আগামী দিনে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি তার নিজস্ব ঐতিহ্য ও অভিভাবকহীনতায় ভুগবে নূতনের এই ক্ষোভের মাঝে যেন সেই আশঙ্কাই লুকিয়ে রয়েছে।

 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমএ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!