৪৫ বছরে গৃহিণী থেকে দেশ সেরা বডিবিল্ডার
৪৫ বছর বয়সী কিরন ডেম্বলা। ভারতের হায়েদ্রাবাদে বাস করেন। যিনি সারা বিশ্বের একমাত্র না হলেও অল্প কিছু নারী বডিবিল্ডারদের একজন। তেরো বছর আগে কিরন ছিলেন একজন গৃহিণী। যিনি বাড়িতে বসে গান শেখাতেন। বিয়ে হয়ে গিয়েছিল কিরনের, আর বিয়ের পর তো ঘর-গেরস্তি, বাচ্চা- এটাই তো স্বাভাবিক।
২০০৬ সালে, ৩৩ বছর বয়সে, কিরনের মস্তিষ্কে জমাট বাঁধা রক্তের অস্তিত্ব মেলে। সংসারবন্দী কিরন অসুস্থতার কারণে ঘরবন্দী হয়ে যান। শরীর ভালো না থাকলে মন ভালো থাকে না সত্যি। দুই বছর ধরে ওষুধ খেতে হয়েছিল তাকে। কড়া ওষুধের কারণে তার ওজন অনেক বেড়ে যায়। স্বাস্থ্য নিয়ে আতস্ক তাকে জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবিয়ে তোলে।
ছোটবেলায় নিয়মিত গান করতেন কিরন। বিয়ের পর সংসারে বুঁদ হয়ে সে চর্চাটা আর হয়নি ঠিকই, তবে গানের প্রতি ভালোবাসাটা সবসময়ই ছিল। সেই গান দিয়েই 'নিজের জন্য কিছু করার শুরুটা করলেন। মায়ের কাছ থেকে তার ১০ বছরের পুরোনো গানের বইপত্র আনলেন, নতুন করে তবলা-হারমোনিয়ামও কিনলেন, শুরু করলেন বাচ্চাদের গান শেখানো। নিজের পুরোনো কোনো অভ্যাসে ফিরতে পেরে যেন নিজেকেই ফিরে পেলেন কিরন।
.png)
প্রতিদিনকার সংসারের কাজের পাশাপাশি গান করতো। বিয়ের পর মেয়েরা ভীষণ নির্ভরশীল হয়ে যায় স্বামীর উপর। এটা স্বাভাবিক, বিশেষ করে আমরা, ভারতীয় গৃহিনীরা একটু বেশিই নির্ভরশীল হয়ে পড়ি। ছোট-বড় যেকোনো বিষয়ে স্বামীর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকি। স্বামী-সংসার ঘিরেই আবর্তিত হয় জীবন, থাকে না নিজের জন্য কোনো জায়গা, হয়ে ওঠে না নিজের জন্য কিছু করা। আগে এই উপলব্ধিটা অল্পস্বল্প হলেও সংসারের ব্যস্ততায় কখনো ওরকম তীব্র আক্ষেপ হয়নি।
কিরন মনে করেন, বিয়ের পর কিংবা মা হওয়ার পর একজন নারী ভুলে যায় তার নিজেরও একটা জীবন আছে। তিনি জানতো না , কেন কেউ একজন নারীকে জিজ্ঞাসা করে না। কিংবা একজন মাকে জিজ্ঞাসা করে না সে তার জীবন থেকে কি চায়? সে মনে করতেন, প্রত্যেক নারীরই একটা স্বপ্ন থাকে এবং সে কিছু একটা অর্জন করতে চায়।
তার মনে হয় ওই সময়ে এই ব্যাপারটিই বেশি পিরা দিয়েছে। তিনি বাড়ির কাছের একটা ব্যায়ামাগারে ভর্তি হন। সাত মাসে ২৪ কেজি ওজন কমান তিনি। তারপর তিনি একজন প্রশিক্ষক হন এবং এমনকি তারকাদেরকেও প্রশিক্ষণ দেন। তারপর তিনি ভিন্ন কিছু করার চিন্তা করে। তারপর তিনি সিক্স প্যাক বানানো শুরু করে।
আট মাসে তিনি সিক্স প্যাক, বাইসেপ এবং সল্ডারসহ পেটানো পেশীবহুল একটি শরীরের মালিক হন। তিনি নিজেকে দেখে খুশি হতে শুরু করেন। ২০১৩ সালে হাঙ্গেরীর বুদাপেস্টে অনুষ্ঠিত 'ওয়ার্ল্ড বডিবিল্ডিং চ্যাম্পিয়নশিপ' প্রতিযোগিতায় একমাত্র নারী হিসেবে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ পান তিনি। তবে এবারও বাঁধা!
সেই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হওয়ার পনেরদিন আগে এক দুর্ঘটনায় পরিবারের তিনজন সদস্য মারা যায় তার, ফলে দৃঢ় মানসিকতা অনেকটাই টলে যায়, অনেকটাই ভেঙে পড়েন তিনি। তবে তার স্বামী জানতেন এই প্রতিযোগিতাটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিরনের জন্য এবং স্বামীর সহযোগিতায়, ভরসায় আস্থা পেয়ে প্রতিযোগিতাটিতে অংশগ্রহণ করেন তিনি।
সে প্রতিযোগিতায় ষষ্ঠ স্থান অর্জন করেন তিনি এবং সবচেয়ে সুন্দর শরীরের খেতাব পান। বিশ্বের অন্যান্য দেশের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করলেও ভারতের কোনো প্রতিযোগিতায় তিনি কখনোই অংশগ্রহণ করেন না। কারণ হিসেবে বলেন, 'বডিবিল্ডিংয়ে নারীদের বিকিণি পরবার প্রয়োজন হয়
কিরন জানান, বেশিরভাগ ভারতীয়রা তার বিকিণির দিকেই তাকিয়ে থাকবে, সে জিতলাম কি হারলাম, সেটা কোনো বিষয় না তাদের কাছে। তবে অন্যান্য দেশে বডিবিল্ডিংকে খেলা হিসেবেই নেয়া হয় এবং বিকিণি তাদের কাছে শুধুই একটি পোশাক।' নিজেকে অনুপ্রেরণা যোগাতে কিরন তার ৪৫তম জন্মদিনে নিজের সিক্স প্যাক বডির ফটোশ্যুট করে নিজেই নিজেকে উপহার দিয়েছেন। তার সে ছবিগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রশংসিতও হয়েছে!
সাহসী এই নারী শুধু ফিটনেস ট্রেইনার হিসেবেই নিজেকে আটকে রাখেননি, ডিজে বেলে নামেও সুপরিচিত তিনি। উদ্যমে ভরপুর ৪৫ বছর বয়সী এই নারী বর্তমানে এভারেস্টকে জয় করার লক্ষ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। হয়তো জয় করেও ফেলবেন এভারেস্ট, কারণ তিনি তো হার মানতে শিখেননি। কিরন ডেম্বলার মতো নারীরাই তো সমাজকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বলেন- ন ডরাই!
যতক্ষণ না মানুষ এটাকে একটা ক্রীড়া হিসেবে গ্রহণ করবে। কিছুই বদলাবে না, মানসিকতার এই পরিবর্তন শুরু হওয়া প্রয়োজন ঘর থেকেই। সালোয়ার কামিজ ছেড়ে ছোট প্যান্ট পরা আমার জন্য সহজ ছিল না। এটা মোটেই সহজ ছিল না। তবে আমার সেই মানসিকতা আমি বদলেছি।