ডলফিন মাংসাশী প্রাণী, মাছ এবং স্কুইড এদের প্রধান খাদ্য। ধারণা করা হয়, দশ মিলিয়ন বছর আগে মায়োসিস যুগে ডলফিনের উদ্ভব। পৃথিবীতে ১৭টি গণে প্রায় ৪০ প্রজাতির ডলফিন রয়েছে। ডলফিনকে সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণীদের কাতারে ধরা হয়। বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ এবং খেলোয়াড়সুলভ মানসিকতার জন্য মানুষের কাছে ডলফিন খুব জনপ্রিয়। সমুদ্রে মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু বলা হয় ডলফিনকে। ১.২ মিটার (৪ ফুট) দৈর্ঘ্য এবং ৪০ কেজি (৯০ পাউন্ড) ওজন থেকে শুরু করে ৯.৫ মিটার (৩০ ফুট) দৈর্ঘ্য এবং ১০ টন ওজন পর্যন্ত বিভিন্ন আকারের ডলফিন দেখা যায়।
সম্প্রতি পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট থেকে শুরু করে ৩২ কিলোমিটার সিবিচ এলাকায় বেশকিছু মৃত ডলফিন ভেসে এসেছে। কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটির সদস্যরা সৈকতের বালুচর থেকে মৃত্যু ডলফিনগুলোকে উদ্ধার করে। পরে এগুলো সঠিক নিয়মে মাটি চাপা দেওয়া হয়।
.png)
কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটির সদস্য কে এম বাচ্চু বলেন, ভেসে আসা ডলফিনগুলো বেশিরভাগই সদ্য মৃত বলে মনে হয়েছে। এদের শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন থাকে।
স্থানীয় একাধিক জেলেরা জানান, কিছু অসাধু ট্রলারমালিক তাদের ট্রলারে ট্রলিং জাল ব্যবহার করে। এসব জাল সমুদ্রে ফেলার জন্য ট্রলারে ক্রেনের মতো থাকে। ওই ক্রেন দিয়ে ট্রলারের দুই পাশে জাল ফেলা হয়। এসব ট্রলিং জালে সামুদ্রিক কচ্ছপ, ডলফিন, হাঙ্গর ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী আটকা পড়ে। এগুলো বিক্রি নিষিদ্ধ হওয়ায় তা আবার সাগরেই ফেলে দিয়ে আসে জেলেরা। এসব প্রাণীর মধ্যে যেগুলো মারা যায়, সেগুলোই পরে তীরে ভেসে আসে।
কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটির দলনেতা রুমান ইমতিয়াজ তুষার জানান, গত জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত কুয়াকাটা সৈকতে পাঁচটি মৃত ডলফিন ভেসে এসেছে। এর আগে ২০২০ সালে ১৮টি এবং ২০২১ সালে ২৪টি মৃত ডলফিন ভেসে এসেছে এই সৈকতে। তাছাড়া গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে কুয়াকাটায় চারটি মৃত ওলিভ রেডলি কচ্ছপও ভেসে এসেছে। মৃত প্রাণীগুলো মাটিচাপা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

উপকূলের জীববৈচিত্র্য রক্ষা, মৎস্য ব্যবস্থাপনা এবং সমুদ্রের নীল অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড ফিসের ইকো ফিশ-২ প্রকল্পের সহযোগী গবেষক সাগরিকা স্মৃতি। তার কাজের এলাকা পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া। ডলফিনের এমন মৃত্যু প্রসঙ্গে সাগরিকা স্মৃতির সঙ্গে কথা হয় ডেইলি বাংলাদেশের। সাগরিকা স্মৃতি বলেন, ‘গত দুই বছর ধরে কুয়াকাটা সৈকতে একের পর এক মৃত ডলফিন ভেসে আসার ঘটনা ঘটেছে। অথচ কোনো প্রতিকার হয়নি।’
কী কারণে এত ডলফিন মারা যাচ্ছে? জানতে চাইলে সাগরিকা স্মৃতি বলেন, নানা কারণে ডলফিনের মৃত্যু হচ্ছে। ধরুন, নানা সময়ে সমুদ্রে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকে। এ সময়গুলোতে ডলফিনরা ওদের গণ্ডির বাইরে অবাধে বিচরণ করতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেই জেলেরা সমুদ্রে মাছ ধরার জন্য যত্রতত্র জাল ফেলছেন। এতে ডলফিনের চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। সাধারণত যেখানে মাছের বিচরণ বেশি, সেখানেই ডলফিন বিচরণ করে থাকে। আর মাছ যেখানে বেশি, জেলেরা সেখানে জাল ফেলে। সেসব জালে মাছের সঙ্গে ডলফিনও আটকে যায়। এ ক্ষেত্রে জেলেরা সচেতন হয়ে আটকা পড়া ডলফিন ছাড়িয়ে দিতে পারেন। কিন্তু তারা তা করছেন না। মানুষের এমন অসচেতনতার কারণে ডলফিনগুলো মারা যাচ্ছে।
সাগরিকা স্মৃতি আরো বলেন, বর্ষা মৌসুমে সমুদ্রে প্রবল জোয়ার থাকে। এ সময় সমুদ্রে বিষাক্ত শৈবাল ও শামুক-ঝিনুক জন্মায়। সামুদ্রিক মাছ এসব বিষাক্ত শৈবাল খায়। ডলফিন যদি ওইসব বিষাক্ত শৈবাল খাওয়া মাছ খেয়ে থাকে, তবে ডলফিনের মৃত্যু হতে পারে। এ ছাড়াও সুন্দরবন এলাকায় অনেক অসাধু জেলে বিষ দিয়ে মাছ ধরে। বিষ খাওয়া মাছ মরে সমুদ্রের পানিতে ছড়িয়ে যায়। এসব মাছ পেটে গেলে ডলফিনের মৃত্যু হতে পারে। পাশাপাশি সমুদ্রে চলাচল করা বড় জাহাজের আঘাতে ডলফিনের মৃত্যু হতে পারে। সমুদ্রে যত্রতত্র ছেঁড়া জাল, পলিথিনে ভেসে বেড়ায়। এসবের সঙ্গে পেঁচিয়েও ডলফিনের মৃত্যু হয়।
তিনি আরো বলেন, আমি মনে করি সমুদ্রে মাছ ধরা জেলেদের সংখ্যা অনেক। জেলেদের সচেতন করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। জেলেদের বোঝাতে হবে, জালে ডলফিন, হাঙর, শাপলাপাতা মাছ, কাছিম–জাতীয় প্রাণী আটকা পড়লে ছেড়ে দিতে হবে। জেলেরা যাতে মাছ ধরতে গিয়ে ডলফিনের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করেন, তা তাদের বোঝাতে হবে। কীভাবে জালে আটকা পড়া প্রাণী ছেড়ে দিতে হবে, তার কৌশলও জেলেদের শেখানো দরকার। পাশাপাশি ডলফিনের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন করতে হলে ডলফিনের ময়নাতদন্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য মৃত ডলফিনের অন্ত্র, জিব, দেহের গুরুত্বপূর্ণ অংশ দ্রুত সংগ্রহ করে তা প্রক্রিয়াজাত করার যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। ডলফিন কেন মারা যাচ্ছে, তা বের করতে হলে যথাযথ ময়নাতদন্ত ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার, ঢাকায় বন অধিদপ্তরের পরীক্ষাগারে ময়নাতদন্ত করা যায়। তা ছাড়া দেশে যে ভেটেরিনারি হাসপাতালগুলো আছে, সেখানেও ময়নাতদন্তের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
সাগরিকা স্মৃতি আরো বলেন, বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, ডলফিন রক্ষার দায়িত্ব বন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের। আগে এই উপকূলে ডলফিন রক্ষার ব্যাপারে তেমন তৎপরতা ছিল না। তবে একের পর এক ডলফিন মারা যাওয়ার খবরে বন বিভাগ ২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর লতাচাপলী ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে, ১০ সেপ্টেম্বর কুয়াকাটা পৌর মিলনায়তনে এবং ১১ সেপ্টেম্বর কুয়াকাটার রাখাইন পাড়া কমিউনিটি সেন্টারে জেলেসহ আড়তদারদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভা করে।
তিনি বলেন, ডলফিনগুলোর মারা যাওয়ার সঠিক কারণ খুঁজে বের করতে উদ্যোগ নেওয়া দরকার। সমুদ্রে জীববৈচিত্র্যের নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করাও জরুরি বলে আমি মনে করি। সমুদ্র এবং সমুদ্রের জীব বাঁচাতে হলে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের একযোগে কাজ করতে হবে।