ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ ফিচার ]

শহরের মানুষ এবং গ্রামের মানুষের সাইকোলজিক্যাল গ্যাপ

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৫:৩৫, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শহরের মানুষ এবং গ্রামের মানুষের সাইকোলজিক্যাল গ্যাপ
শহরগুলো বহু আগেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে ইন্টারনেটের বদৌলতে শহরের বেশীরভাগ সূবিধা গ্রামেও পাওয়া যাচ্ছে। তাই আসুন আমরা "গ্রামের মানুষ ভালো না" এই বাহানা না করে, কমফোর্ট জোন থেকে বের হয়ে গ্রামকে আরও সুন্দর বসবাসযোগ্য করে তোলার ব্যবস্থা করি।

শহরের ৯০% মানুষই মনে করে গ্রামের মানুষ বিরক্তিকর। তারা পরনিন্দা করে, পরস্পর প্রতিহিংসা লালন করে। অন্যের ব্যক্তিগত জীবনে নাক গলায়।

কিন্তু আপনি কি জানেন? গ্রামের মানুষের এই স্বভাবগুলোই সমাজের মানুষকে অপরাধ করতে দেয় না। অন্যদিকে শহরের মানুষ নিজেকে নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকে যে অন্যের ব্যাপারে চিন্তা করার সময়ই পায় না। 

Advertisement

এই কারনে বর্তমান সময়ে বেশীরভাগ ক্রাইম শহরেই সংঘটিত হয়। আজকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ঢুকলেই দেখা যায় রক্ত হিম করা সব ক্রাইম। এর নব্বই ভাগই ঘটে শহরে।

গ্রামের মানুষ সম্পর্কে আমাদের কিছু ভুল ধারণা নিয়ে আলোচনা করবো। আর সেজন্য শহরের মানুষ এবং গ্রামের মানুষের সাইকোলজির তুলনামূলক পার্থক্য তুলে ধরা প্রয়োজন।

শহরের মানুষের তুলনায় গ্রামের মানুষের চিন্তাধারা, আবেগ এবং পারস্পরিক সম্পর্কের ধরন বেশ আলাদা। অনেকের কাছে বেশ জটিল। শহরের মানুষ ও গ্রামের মানুষের সাইকোলজির প্রধান পার্থক্যগুলো হলো :

সামাজিক নির্ভরশীলতা: গ্রামের মানুষ একে অপরকে ভালো করে চেনে। এমনকি রাতের আধারে কেউ হেটে গেলে তারা বোঝে কে হেটে যাচ্ছে। পরস্পর যতোই ঝগড়া বিবাদে জড়াক, দিন শেষে তাদের মধ্যে ভাতৃত্বের বন্ধন খুব গভীর। একজনের সুখে-দুঃখে পুরো বাড়ির মানুষ এগিয়ে আসে। তাদের মধ্যে "আমি" ভাবনার চেয়ে "আমরা" ভাবনাটা বেশি কাজ করে। এর কারন কি জানেন?
কারন তারা জানে যে, এই গ্রামেই তাদের জন্ম, এখানেই তাদের মরণ। প্রত্যেকে তাদের গ্রামকে আপন করে নিয়েছে।

অন্যদিকে শহরের মানুষ একে অপরকে চেনা তো দূরের কথা, পাশের ফ্ল্যাটে কেউ মরে পড়ে থাকলে, যতদিন পর্যন্ত পচা দূর্গন্ধ বের হবে না, ততদিন কারও খবর হয় না। একে অপরের বিপদে, না পারতে, এগিয়ে যায়। শহরের মানুষ প্রচন্ড রকমের আত্মকেন্দ্রিক। বেশীরভাগ মানুষ শহরকে আপন করে নিতে পারে না। কারন তারা জানে, বেচে থাকা অবস্থায় যতই তারা শহরে থাকার বড়াই করুক, মৃত্যুর পর তার লাশটা ঠিকই গ্রামে নিয়ে দাফন করা হবে।

  • শহরের মানুষ অনেক বেশী স্বার্থপর। তারা নিজের বা পেশাদারিত্বের স্বার্থে অন্যের সাথে সম্পর্ক রাখে।

সামাজিক মর্যাদা ও লোক লজ্জা : গ্রামের মানুষ দু'বেলা খেতে পাক আর না পাক, তাদের কাছে সামাজিক সম্মান এবং বংশের মর্যাদা অনেক বড় বিষয়। সমাজ বা পাড়া প্রতিবেশী কি বলবে - এই চিন্তা তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গ্রামের একজন মানুষ চাইলেই যেমন খুশী তেমন চলতে পারে না। মোটামুটি সবাই কম বেশি ধর্ম কর্ম করে। অন্তত ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সবাই।

অন্যদিকে শহরের মানুষ সমাজের কে কি বলবে সেটার ধার ধারে না। উদাহরণ সরুপ, শহরে একটি মেয়ে যদি আপত্তিকর পোশাক পরে রাস্তায় হেটে বেড়ায়, কেউ তাকে কিছু বলার সাহস করে না। অথচ সবাই বোঝে যে এর দ্বারা সমাজে বিরুপ প্রভাব পড়ছে। শহরে কেউ নামাজ না পড়লে তাকে কেউ কিছু বলার সাহস করে না। অথচ আল্লাহ যতবারই নামাজের কথা বলেছেন ততবারই বলেছেন নামাজ কায়েম করো। নামাজ কায়েম করার মানে এই নয় যে আমি একা একা নামাজ পড়বো। সমাজের সবাইকে নিয়ে নামাজ পড়লেই সমাজ টা সুন্দর হবে। শুধু ইসলাম ধর্ম না, যেকোনো ধর্মই মানুষকে ধর্মকর্মের দিকে আহবান করার কথা বলা হয়েছে। অন্যথায় সমাজে ক্রাইম বেড়ে যাবে।

আতিথেয়তা : অপরিচিত বা মেহমানদের প্রতি গ্রামের মানুষের মনে এক ধরনের সহজাত উদারতা থাকে। নিজের সাধ্যের বাইরে গিয়েও তারা অতিথিকে আপ্যায়ন করতে পছন্দ করে। কারন তারা বিশ্বাস করে যে অতিথি এলে ঘরের বরকত বৃদ্ধি পায়।

অন্যদিকে শহরের মানুষ অতিথি দেখলে সবচেয়ে বেশি বিরক্ত হয়। কারন তাদের পার্সনাল লাইফে ব্যাঘাত ঘটে। তারচেয়ে বড় কারন হলো তারা আতিথিয়তা করবে কি, নিজেদের খাবার খরচ জোগাড় করতেই তো রীতিমতো হিমসিম খেতে হয়। দিন দিন যেভাবে শহরের জীবন যাত্রার মান বাড়ছে।

বিশ্বাস প্রবণতা : গ্রামের মানুষ সাধারণত অন্যকে দ্রুত বিশ্বাস করে। দ্রুত বিশ্বাস করার কারনে যে সে বিপদে পড়তে পারে সেটা তারা সহজে বোঝে না। শহরের মানুষ দ্বারা গ্রামের মানুষ প্রতারিত হওয়ার ঘটনা অহরহ শোনা যায়।

অন্যদিকে শহরের মানুষ কাউকে সহযে বিশ্বাস করতে চায় না। যার কারনে তারা পরস্পর দুঃখ কষ্টের কথা কাউকে শেয়ার করে না। নিজের কষ্ট নিজের মধ্যেই রেখে দেয়।

প্রকৃতির ওপর নির্ভরতা : বেশীরভাগ গ্রামের মানুষ পেশায় কৃষক হওয়ায় তারা প্রকৃতির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। ফলে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও অনেক বেশি।

অন্যদিকে শহরের মানুষের সাথে প্রকৃতির কোনো সম্পর্ক থাকে না। কিছু কিছু ফ্ল্যাট তো এমন থাকে যে কখন দিন হচ্ছে, কখন রাত হচ্ছে সেটাই বোঝার উপায় থাকে না। ফলে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত দূর্বল। তারা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত টাকা ইনকামের জন্য ছুটতে থাকে। কিন্ত সারা জীবন যা সঞ্চয় করে, শেষ জীবনে তা ডাক্তারকে দিতে হয়।

বেশিরভাগ শহরের মানুষ এজন্য গ্রামে যেতে চায় না, কারন তারা তাদের কমফোর্ট জোন থেকে বের হতে নারাজ। প্রচন্ড রকম অলস। তারা যে শুধু শারিরীকভাবে দূর্বল তা নয়। বরং অনেকের মানুষিক সমস্যাও প্রকট আকার ধারন করেছে। যেমন, শহরে কেউ যদি সখ করে মুরগি বা হাস পালে, সে যতই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখুক, তাকে সবাই সমাজ থেকে বের করে দিবে। কিন্তু যে কুকুর, বিড়াল পালে তাকে সবাই স্মার্ট ভাবে।

এটা ঠিক যে শহর হাস, মুরগি পালার জায়গা নয়। আবার এটাও ঠিক, যেখানে একটা মুরগি পালা যায় না, একটা গাছ লাগানো যায় না, ঠিক মত আকাশটা দেখা যায় না, বৃষ্টিতে ভেজা যায় না, সেখানে কোনো রক্ত মাংসে গড়া মানুষের পক্ষে বসবাস করা সম্ভব নয়, সেখানে একমাত্র রোবটেরই বসবাস করা সম্ভব।

গোপনীয়তা বা Privacy : গ্রামে গোপনীয়তা বজায় রাখা কঠিন। পারিবারিক বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করাটা সেখানে স্বাভাবিক। এটি সমাজের জন্য খুবই ইতিবাচক। যেমন, একটি নব বিবাহিত দম্পতির ক্ষেত্রে (যেহেতু তাদের বয়স কম) স্বামী চাইলেই স্ত্রীর গায়ে হাত তুলতে পারে না। বাড়ির মুরব্বিদের তারা ভয় পায়, সম্মান করে। ফলে বিবাহ বন্ধন স্থায়ী হয়।

অন্যদিকে শহরের মানুষের প্রাইভেসিই তাদের ক্ষতির কারন হয়। যেমন, শহরে একটি নব দম্পতি একা ফ্ল্যাট নিয়ে থাকতে পছন্দ করে। ফলে তাদের মধ্যে পারস্পরিক কলোহ, ঝগড়া-বিবাদ হলে একে অন্যের গায়ে হাত তুলতে দিধা করে না, যেহেতু ঘরে কোনো মুরব্বি থাকে না, তাই তারা নিজেদের স্বাধীন মনে করে। ফলে গ্রামের তুলনায় শহরে বিবাহ বিচ্ছেদের পরিমান উল্লেখযোগ্য হারে বেশী।

মানুষিক চাপ বা স্ট্রেস : কথায় আছে গ্রামে সময় থমকে দাঁড়ায়। গ্রামের মানুষ প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকায় তাদের মানুষিক চাপ কম থাকে। তারা পরিবারকে তাদের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটা দিতে পারে, সেটা হলো সময়।

অন্যদিকে শহরের মানুষ অতিরিক্ত শব্দ দূষণ, বায়ু দূষন, যানজট, একাকিত্ব, মাত্রাতিরিক্ত কাজের চাপের কারনে প্রচন্ড স্ট্রেসে থাকে। পরিবারকে ঠিকমত সময় দিতে পারে না। মেজাজ খিটখিটে থাকে। তারা চারপাশের ঘটনার প্রতি উদাসীন, আবেগহীন।

গ্রামের মানুষের দন্দের বিষয় হলো জায়গা জমি। বেশীরভাগ গ্রামের মামলাগুলো হয় জায়গা জমি সংক্রান্ত। কারন বেশীরভাগ মুরব্বি তার জায়গা সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে যায় না। তবে যাদের জায়গা জমি ভাগ হয়ে যায় তাদের মধ্যে বিবাদ কম দেখা যায়। 

অন্যদিকে শহরের মানুষ বছরে একবার (ঈদে) গ্রামে গিয়ে নিজের সীমানায় ইটের দেয়াল দিয়ে আসে। অথচ সে জায়গাটি গ্রামের অন্য মানুষ যুগ যুগ থেকে রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করছিলো। আবার অনেকে গ্রামে গিয়ে বাড়ির উঠান, পুকুর পাড় ইত্যাদি পাকা করে দিয়ে আসে। গ্রামের মানুষ সেটা পছন্দ করছে কি না সেটা জানারও প্রয়োজন মনে করে না। অনেকে তো গ্রামের মানুষকে মানুষই মনে করে না।

শহরের চাকচিক্য আমাদেরকে যতোই গ্রাস করুক, গ্রামের সেই জোৎস্না রাত, ধান ক্ষেত, পুকুর পাড়ের সুন্দর্য কখনোই শহরে বসে উপভোগ করা সম্ভব নয়।

শহরগুলো বহু আগেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে ইন্টারনেটের বদৌলতে শহরের বেশীরভাগ সূবিধা গ্রামেও পাওয়া যাচ্ছে। তাই আসুন আমরা "গ্রামের মানুষ ভালো না" এই বাহানা না করে, কমফোর্ট জোন থেকে বের হয়ে গ্রামকে আরও সুন্দর বসবাসযোগ্য করে তোলার ব্যবস্থা করি। 

আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আলিসান ফ্ল্যাট আর দামি দামি গাড়ি না কিনে তাদের জন্য (গ্রামে) সুন্দর একটি বসবাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাই।

Sabbir Ahmed-এর পেইজ থেকে

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!