দীর্ঘ এক যুগ ধরে পিরোজপুর শহরের স্বর্ণকার পট্টিতে নৈশ প্রহরীর কাজ করেন রতন বড়াল (৫৪)। জেলা হাসপাতালের পেছনে শহর মাছিমপুর এ তাদের আদি বসতি। শরীরের গড়নটা বেশ ছিপছিপে তার। গায়ের রংটাও কালো, যেন তার জীবনটার মতোই।
রতন জানায়, আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে (রতনের বয়স যখন মাত্র চার বছর) মারা যায় তার মা সুপ্রভা মিত্র। দুই ছেলে ও তিন মেয়ে রেখে মারা গেলেন মা। এ সময় তার ছোট বোন শিখা রানীর বয়স মাত্র দুই বছর। তার বাবা কার্ত্তিক বড়ালও আর দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। বাবা কার্ত্তিকও মারা গেলেন প্রায় ১৫ বছর আগে। তখন পাঁচ ভাই-বোনের এই পরিবারটি যেন এক কূলহীন সাগরে পড়লেন। আর বাবা মারা যাওয়ার পর বড় ভাই জ্যোতিষ বড়াল পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে চলে যায়। এরপর আর দেশে ফিরে আসেননি, তাদের কোনো খোঁজ খবরও নেননি। তার ছোট বোন শিখাও ৩৫ বছর আগে বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে ভারতে পাড়ি জমিয়েছেন। আর কখনো ফিরে আসেনি। অন্য দুই বোন নীলা বড়াল ঝালকাঠি এবং পুষ্প রাণী বড়াল পিরোজপুরের নেছারাবাদে শ্বশুর বাড়িতে থাকে। এর মধ্যে পুষ্পর স্বামীও মারা যায়।
.png)

নবম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করে রতন। পরিবারের দায়িত্বভার নেওয়ার কারণে আর লেখাপড়া শেষ করতে পারেনি। লেখাপড়া চলমান যখন ছিল, তখনই স্বর্ণের দোকানে গহনা তৈরির কাজ শেখেন সে। এরপর দীর্ঘদিন স্বর্ণের কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন। সেই থেকেই স্বর্ণের সঙ্গে গড়ে ওঠে তার বন্ধুত্ব। স্বর্ণকে বেশ ভালোবাসেন। আবেগ-অনুভূতি আর মেধা খাটিয়ে শিখেছেন স্বর্ণ তৈরির বাহারি ডিজাইন।
তবে গহনা তৈরিতে নিত্য নতুন যন্ত্রের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারেননি তিনি। পাশাপাশি কমেছে চোখের দৃষ্টি শক্তি। শক্তিহীন চোখে আর স্বর্ণকারের কাজটি বেশিদিন চালিয়ে যেতে দেয়নি। ফলে এ পেশা ছাড়তে হয়েছে রতনকে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণের কাজ করায়, মায়া ও ভালোবাসা থেকে ছাড়তে পারেনি স্বর্ণকার পট্টি। আর তাই এক যুগ আগে স্বর্ণের দোকানের নিরাপত্তায় নিয়েছেন স্বর্ণকার পট্টির নৈশ প্রহরীর কাজ।
প্রতিদিন রাত ১১ টা থেকে ফজরের আজান অবধি দায়িত্ব পালন করে রতন। পাহারার মধ্যে কখনোই চোখের দুই পাতা এক করেনি সে। সারাক্ষণ বাঁশি নিয়ে ঘুরে বেড়ায় স্বর্ণকার পট্টির এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।
কিন্তু পাহারার টাকায় তো সংসার চলে না। তাইতো হয়েছেন চা দোকানিও। পাহারার কাজ শেষে তিন থেকে চার ঘণ্টা ঘুমিয়েই খোলেন চায়ের দোকান। জেলার প্রেসক্লাবের পুরনো ভবনের সামনেই তার এই দোকান।
কথায় বলে ‘অভাগা যেদিকে চায়, সাগর শুকিয়ে যায়’। দোকানের অবস্থা ভালো না হওয়ায় এ ব্যবসা থেকেও খুব একটা লাভ হয় না রতনের। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রতনের নৈশ প্রহরীর কাজে বেতন কিছুটা বাড়লেও তা দিয়ে সংসার চালানো কষ্টকর। ফলে, তার আর্থিক অবস্থারও কোনো পরিবর্তন হয়নি। পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ুয়া একমাত্র ছেলে লিয়ন বড়ালের লেখাপড়াসহ পরিবারের ভরণ পোষণের জন্য স্ত্রী দিপালী বড়ালও শহরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নামে মাত্র বেতনে সেবিকার কাজ করেন।

শীত কিংবা বৃষ্টি কোনো কিছুই রতনকে তার দায়িত্ব থেকে দূরে রাখতে পারে না। স্বর্ণের প্রতি ভালোবাসা থেকে স্বর্ণের দোকানের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার এক দৃষ্টান্ত রতন। আজও নিষ্ঠার সঙ্গে নৈশ প্রহরীর কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। আর তার এ কাজের প্রতি সন্তুষ্ট শহরের স্বর্ণ ব্যবসায়ীরাও।
রতন অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করছে বলে জানান নিউ ডিজাইন জুয়েলার্সের মালিক বিশ্বজিৎ সর্বন।
রানী জুয়েলার্সের মালিক উজ্জ্বল পাল জানান, রতন নৈশ প্রহরী থাকায় নির্বিঘ্নে রাতে বাড়িতে ঘুমিয়ে থাকতে পারেন স্বর্ণকাররা সবাই। তবে রতন যে পারিশ্রমিক পায় তা দিয়ে এ বাজারে সংসার চালানো খুবই কঠিন।
স্বর্ণের প্রতি রতনের যতই ভালোবাসা থাক না কেন, এই স্বর্ণ কারিগর কখনোই নিজের জন্য একটু স্বর্ণ গড়তে পারেনি। সংসার চালাতেই কষ্ট, স্বর্ণ বানাবেন কোথা থেকে? সংসার চালাতে যত কষ্টই হোক না কেন, স্বর্ণের প্রতি ভালোবাসা থেকে যে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন রতন, তা যথাসম্ভব নিষ্ঠার সঙ্গেই পালন করবেন বলে জানান তিনি।