জনবহুল কংক্রিটের এ এলাকাটির মানুষের স্বস্তি ফেলার যেন এক খণ্ড সবুজ জায়গা। তাই অবসর সময় কাটাতে ও শারীরিক কসরতের জন্য অনেকেই ছুটে এক একরের এই জায়গাতে।
এছাড়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি কবি নজরুল কলেজ, সরকারি শহিদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, মহানগর মহিলা কলেজ, সরকারি মুসলিম স্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পার্কটির কাছাকাছি থাকায় শিক্ষার্থীদের আড্ডার প্রাণকেন্দ্রও এই পার্ক। তাইতো প্রতিদিনই এখনে বসে এক প্রাণের মেলা।
.png)
তবে অনেকেই হয়ত জানেন না যে, আজকের এই প্রাণপূর্ণ পার্কটিই হলো ইংরেজ শাসনের পৈশাচিক নির্যাতনের এক জ্বলন্ত সাক্ষী। একসময় এ এলাকার মানুষের কাছে ভীতিকর জায়গা ছিল এই পার্ক। ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোয় বিদ্রোহী দেশীয় সেনাদের ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে রাখা হতো পার্কটিতে।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, প্রথমে জায়গাটির নাম ছিল আন্টাঘর। এর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ঢাকার নবাব আব্দুল গণি ও নবাব আহসান উল্লাহ। তবে এটি কবে প্রতিষ্ঠিত হয় তা জানা না গেলেও ১৮০০ সালের দিকে এই আন্টাঘরে ঢাকায় আগত আর্মেনীয়দের আড্ডাস্থল ছিল বলে জানা যায়। পরে ১৮৫৭ সালের ২২ নভেম্বর ইংরেজ সেনারা ঢাকার লালবাগ কেল্লায় আক্রমণ করে এ দেশীয় সেনাদের পরাস্ত করে। এরপর সিপাহীদের ধরে এনে এই আন্টাঘর ময়দানে পৈশাচিক নির্যাতন করে প্রকাশ্যে কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়। লাশ গাছে গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয় বহুদিন। এ নিয়ে এ এলাকায় এক ধরনের ভীতিকর অবস্থা ছড়িয়ে পড়ে।
এ সময় ভারতবর্ষে ব্রিটেনের রানি ভিক্টোরিয়ার শাসনভার চলাকালে জায়গাটির নামকরণ করা হয় ভিক্টোরিয়া পার্ক। পরে ব্রিটিশরা চলে গেলে ১৯৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের শতবার্ষিকী উপলক্ষে পার্কে একটি চার কোনাকৃতির স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। নতুন নাম দেওয়া হয় বাহাদুর শাহ পার্ক। সেই থেকে এ নামেই পরিচিত পার্কটি।
পার্কের সামনেই রয়েছে লম্বা আরেকটি স্মৃতিস্তম্ভ, যা ১৮৮৪ সালে ঢাকার নবাব স্যার খাজা আহসানুল্লাহর জ্যেষ্ঠ পুত্র খাজা হাফিজুল্লাহর মৃত্যুতে নির্মিত হয়। রয়েছে নানা প্রজাতির গাছ। এর মধ্যে ঔষধিসহ বিরল প্রজাতির গাছও রয়েছে। তাই ভোরবেলায় জনবহুল পুরান ঢাকার এ স্থানে পাখির কিচিরমিচির শব্দে ভরে ওঠে। বিকেলে রিকশা ও ছোট যানবাহনের শব্দকে ছাপিয়ে পাখির কলরবই যেন শোনা যায় বেশি।
এছাড়া সেখানে বিদ্রোহী সেনাদের ফাঁসিতে ঝুলানো হয় সে জায়গাটি বর্তমানে ফাঁকা রয়েছে। সেখানে নিয়মিত শারীরিক কসরত করার জন্য পূর্বে সরঞ্জাম থাকলেও এখন শুধুই আড্ডাস্থল।
জানা যায়, ২০২০ সালের ১১ মার্চ বাহাদুর শাহ পার্কটি সংস্কারের পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন উদ্বোধন করেন। সংস্কারের পর পার্কটি আগের থেকে আরও বেশি সুন্দর হয়েছে। বসার জন্য কংক্রিটের বেঞ্চের আসন তৈরি করা হয়েছে। পার্কের উত্তর কোণে গ্যালারির মতো বসার জায়গা করা হয়েছে। পার্কের চারপাশে হাঁটার রাস্তাও হয়েছে আগের থেকে ভালো।
ভোরের আলো ফুটতেই বাহাদুর শাহ পার্কে কেবল শোনা যায় জুতার শব্দ। নানা বয়সীরা এখানে আসেন শারীরিক ব্যায়ম করতে। শরীরকে সুস্থ ও মনকে প্রাণবন্ত রাখতে পার্ককে প্রদক্ষিণ করে হাঁটা বা দৌড়াতে দেখা যায় তাদের। ব্যায়াম করতে আসা পুরান ঢাকার বাসিন্দা ফয়সাল আহমেদ বলেন, সকালে শহর ফাঁকা থাকে, বাতাসও থাকে পরিচ্ছন্ন। তাই তো ঐতিহাসিক এই পার্কে এসে ব্যায়াম করি। আর এখানে আসার সুবাদে স্মরণ করি ফাঁসিতে ঝুলে দেশের জন্য জীবন দেওয়া সিপাহীদের।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কবি নজরুল কলেজসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত আড্ডা বসে এখানে। আড্ডারত কবি নজরুল কলেজের শিক্ষার্থী ও পুরান ঢাকার বাসিন্দা সাদিয়া সওদামনি সিনথি বলেন, ক্লাস শেষে অনেক সময়ই বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে এখানে বসে আড্ডা দেওয়া হয়। ঘনবসতিপূর্ণ পুরান ঢাকার বুকে এটি ভালো একটি আড্ডাস্থল।
কবি নজরুল কলেজে নতুন ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী মো. রোমান মোল্লা বলেন, সিপাহী বিদ্রোহের কথা বইয়ে পড়েছি। কিন্তু সিপাহীদের যে এ পার্কেই ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল তা আগে জানা ছিল না।