উল্লেখ্য, রমজান মানেই ইফতার-সেহরিতে মুখরোচক বিভিন্ন খাবার খাওয়া নয়; বরং আত্মিকভাবে নিজেকে পরিশুদ্ধ করা।
জনসংখ্যা বিষয়ক অনলাইন ডেটাবেজ ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ’ (ডব্লিউপিআর) থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ২০০ কোটি মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী।
.png)
রমজানে মুসল্লিরা রোজা রাখেন ও দিনশেষে ইফতার করেন। রমজান মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইফতার। অনেক দেশে এটি ‘ইফতর’ নামেও পরিচিত।
তবে ধর্ম এক হলেও বিভিন্ন দেশে দেশে ইফতারের সংস্কৃতি আলাদা। আর ভিন্নতার কারণে ইফতার আয়োজনেও থাকে ভিন্নতা। তবে বেশির ভাগ দেশেই সাধারণত খেজুর বা পানির মতো হালকা কিছু দিয়ে ইফতার শুরু হতে দেখা যায়। অবশ্য ইফতার আয়োজনে বাহারি পদের খাবারও দেখা যায়।
এবার চলুন জেনে নিই দেশে দেশে রোজাদারদের ইফতার আয়োজন যেমন
সৌদি আরব: মুসলিম দেশগুলো নিয়ে আলোচনা করলে সৌদি আরবের কথা না বললেই নয়। আরব নিউজের এক প্রতিবেদন বলছে, সৌদিরা ইফতারের শুরুতে ‘গাহওয়া’ নামক অ্যারাবিক কফি পান করেন এবং সেইসঙ্গে খেজুর খান। এরপর তারা মাগরিবের নামাজ পড়েন। নামাজ শেষে তারা ভারী খাবার খান।
সৌদি আরবেও অঞ্চলভেদে ইফতারের খাবারে ভিন্নতা রয়েছে। দেশটির পশ্চিম অঞ্চলের মানুষ তাদের ইফতারে শৌরাইক রুটি ও দুজ্ঞাহ নামক ঐতিহ্যবাহী খবার খান। পূর্বাঞ্চলের লোকেরা ইফতারে সালুনা নামের একটি খাবার খান, যা মাংস ও সবজির স্টু দিয়ে তৈরি।
দেশটির কেন্দ্রীয় অঞ্চলের মানুষ তাদের রোজা ভাঙেন আসিদাহ, মারগগ, মাফরৌক ও মাতাজিজ নামক ঐতিহ্যবাহী খাবার দিয়ে। এগুলো বাদামি আটা, গরুর মাংস, সবজি, মধু, পিঁয়াজ বা ঘি দিয়ে তৈরি করা হয়।
বাংলাদেশ: উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের মানুষ ইফতারে ভাজা-পোড়া খেয়ে থাকেন। এর মধ্যে থাকে- পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ, ছোলা, পাকোড়া, ইত্যাদি। এ ছাড়া ইফতার আয়োজনে আরো থাকে মুড়ি, জিলাপি, হালিমসহ নানা রকমের শরবত ও ফল।
এসব হালকা খাবারের পাশাপাশি অনেক ইফতারে নানা রকমের তেহারি, বিরিয়ানি, খিচুড়ি, তন্দুরি চিকেনের মতো ভারী খাবারও খান। তবে ফলের মধ্যে খেজুর অপরিহার্য। খেজুর ছাড়া বাংলাদেশি মুসলিমদের ইফতার টেবিল যেন অসম্পূর্ণ। এ ছাড়া মসজিদগুলোতে যে ইফতার আয়োজন করা হয়, সেখানেও খেজুরের উপস্থিতি থাকে। মূলত মহানবী (সা.) ইফতারের শুরুতে খেজুর খেতেন বলে বিশ্বব্যাপী এটি এত জনপ্রিয়।
ভারত: জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বে বর্তমানে ২য় অবস্থানে রয়েছে ভারত। দেশটির ১৪ শতাংশ মানুষ মুসলিম। বিশাল আয়তনের এই দেশটির একেক রাজ্যের ইফতার আয়োজন একেক রকম।
এ বিষয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদন বলছে, ভারতের হায়দ্রাবাদের মুসলিমরা ইফতারে হালিম খেতে পছন্দ করেন। আবার, কেরালা ও তামিলনাড়ুর মুসলমানরা ইফতার করেন ‘নমবু কাঞ্জি’ নামে এক ধরনের খাবার দিয়ে। (নমবু কাঞ্জি হলো মাংস, সবজি এবং পরিজের সমন্বয়ে তৈরি এক ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবার)
তবে সামগ্রিকভাবে দেখলে ভারতেও ইফতারে ভাজাপোড়া খাবার খাওয়ার চল আছে। বিভিন্ন দোকানে ইফতারের আগে নানা ধরনের পাকোড়া, সমুচা, চপ ইত্যাদি বিক্রির ধুম পড়ে যায়। তবে দিল্লিসহ দেশটির উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে ইফতারের শুরুতে পানির সঙ্গে থাকে খেজুর, ছোলা-বুট, হরেক রকম ফল ও ফলের শরবত, দুধ, ডিম, দইয়ের মতো খাবার। এ ছাড়া ভারী খাবারের মাঝে থাকে বিভিন্ন ধরনের কাবাব, হালিম, শর্মা, বিরিয়ানি ইত্যাদি।
পাকিস্তান: সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মুসলিম বসবাস করে পাকিস্তানে। ডব্লিউপিআর-এর তথ্য বলছে, দেশটির মোট জনসংখ্যার শতকরা ৯৮ ভাগেরও বেশি মানুষ মুসলিম।
পাকিস্তানে ইফতার আয়োজনে পানি এবং খেজুর তো থাকেই। তবে সেখানে প্রাধান্য পায় মাংস ও রুটির মতো ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো। নানা ধরনের কাবাব, তান্দুরি, কাটলেট, টিক্কার উপস্থিতি প্রায় প্রতিদিনের ইফতারেই রাখেন পাকিস্তানিরা।
এসব ভারী খাবারের পাশাপাশি ইফতারের সময় বিভিন্ন ভাজাপোড়া খাবারও খেয়ে থাকেন তারা। যেমন রোল, নিমকি, সমুচা, বিভিন্ন ধরনের চপ, পাকোড়া ইত্যাদি। এ ছাড়া শরবত, ফল বা ফলের সালাদ, ছোলা-বুট, ফালুদা, জিলাপি, এমনকি বিরিয়ানি দিয়েও তাদের ইফতারের টেবিল সাজানো হয়। তবে পানীয় হিসেবে রুহ আফজার কদর সবচেয়ে বেশি।
ইন্দোনেশিয়া: ডব্লিউপিআর-এর তথ্য অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ শতাংশ অর্থাৎ দেশটির প্রায় সাড়ে ২৩ কোটি মানুষ মুসলিম। দেশটির মানুষজন ইফতারে তেল ও মশলা জাতীয় খাবারের পরিবর্তে বিভিন্ন রকম ফল এবং শরবতকে প্রাধান্য দেয়। এ ছাড়া তাদের ইফতার আয়োজনে নানা রকম মিষ্টি জাতীয় খাবারও থাকে।
ইন্দোনেশিয়ার সংবাদপত্র দ্য জাকার্তা পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুবুর চ্যান্ডিল নামক এক ধরনের মিষ্টান্ন; মিষ্টি আলু দিয়ে তৈরি বিজি সালাক; কলা, মিষ্টি আলু অথবা কুমড়া দিয়ে তৈরি কোলাক; কলা দিয়ে তৈরি এস পিসাং ইজোসহ আরো নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবার ইন্দোনেশিয়ানরা ইফতারে খায়।
নাইজেরিয়া: নাইজেরিয়ার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ইফতারে শর্করা জাতীয় খাবার ও ফলমূলকে প্রাধান্য দেয়া হয়। এছাড়া জল্লফ রাইস নাইজেরিয়ানদের অন্যতম প্রধান খাবার। চাল, পিঁয়াজ, টমেটো, মরিচ ইত্যাদির সমন্বয়ে এটি তৈরি করা হয়।
পাশাপাশি মই মই (পুডিং), ইয়াম (এক ধরনের আলু), আকারা (বিন কেক), মাসা (রাইস কেক), ইলুবো ও আমালার (ইয়াম দিয়ে তৈরি এক বিশেষ খাবার) মতো আরও নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবারও তাদের ইফতার তালিকায় থাকে।
মিশর: মিশরে ইফতার মানেই একধরনের আনন্দ-উৎসব। দেশটিতে মুসল্লিরা ইফতারের সময় মৃদু আলো জ্বালিয়ে ইফতার করেত পছন্দ করেন। শুধু বাড়িতে নয়, পুরো রমজান জুড়ে মিশরের পথেঘাটেও বিভিন্ন ধরনের রঙিন আলো জ্বলতে দেখা যায়।
মিশরে ইফতার টেবিলের উল্লেখযোগ্য খাবারগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘আতায়েফ’ ও ‘কুনাফা’। আতায়েফ হলো এক ধরনের প্যানকেক ও কুনাফা এক ধরনের সিরাপ। এই দুটো খাবার মিশরীয় মুসলমানদের ইফতারের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলা যেতে পারে। তবে দেশটির অনেক পরিবার ইফতারে বাদামি রুটি এবং মটরশুঁটি, টমেটো, বাদাম ও অলিভ অয়েল দিয়ে তৈরি ‘ফুল মেদেমাস’ নামক এক ধরনের খাবার খেতে পছন্দ করেন।
তুরস্ক: অন্য মুসলিম দেশগুলোর মতো ইফতারের টার্কিশদের পছন্দের শীর্ষে থাকে খেজুর। সেই সঙ্গে বিভিন্ন ফলমূল, শরবত, হরেক রকম কাবাব তাদের খাদ্য তালিকায় থাকে। তবে রমজানে দেশটির মুসলমানদের সবচেয়ে পছন্দের খাবার হলো রামাজান পিদেসি, যা মূলত এক ধরনের রুটি।
ইরান: মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরান, যার ৯২ শতাংশ মানুষ (৮ কোটি ২৫ লক্ষ) মানুষ মুসলিম। এখানে রুটি, স্যুপ, র্যাপ, কাবাবের মতো সুপরিচিত খাবারের পাশাপাশি ইফতারে ইরানের ঘরে ঘরে তৈরি হয় জাফরানের ঘ্রাণযুক্ত এক ধরনের ঐতিহ্যবাহী পার্শিয়ান হালুয়া। এ ছাড়া জাফরান চাল দিয়ে তৈরি ‘শোলেহ জার্দ’ নামক এক ধরনের পুডিংও ইরানিদের খুব প্রিয়।
আলজেরিয়া: ডব্লিউপিআর-এর হিসাবে, আলজেরিয়াতে মাত্র সাড়ে ৪ কোটি মুসলিম বসবাস করে। আলজেরিয়ান মুসলিমরা পিৎজা ‘সোয়ারবা’, সবজি রোল, আলু, সবজি দিয়ে তৈরি দোলমা ইত্যাদি দিয়ে তাদের ইফতার শুরু করেন।
মাগরিবের নামাজের পর তারা ‘সিগার’ নামক এক ধরনের পানীয় পান করেন, যা বাদাম দিয়ে তৈরি। এ ছাড়া তাদের ইফতারের তালিকায় বিভিন্ন স্যুপও থাকে।
সূত্র: বিবিসি