ঢাকা,  সোমবার   ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩

[ ফিচার ]

নব্বইয়ের দশকে গ্রামে টিভি দেখার মনোরম দৃশ্য

আনিছুজ্জামান
প্রকাশিত: ১০:১৫, ১২ অক্টোবর ২০২৬
নব্বইয়ের দশকে গ্রামে টিভি দেখার মনোরম দৃশ্য
সেই বন্ধ দরজাগুলো হয়তো তখন আমাদের অনেককে টিভি দেখতে দেয়নি, কিন্তু আজ স্মৃতির দরজা খুললে দেখা যায়

নব্বইয়ের দশকে গ্রামে টেলিভিশন ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। আজকের মতো ঘরে ঘরে টিভি ছিল না। পুরো গ্রামে বা পাড়ায় বড়জোর একটি কিংবা দুটি বাড়িতে সাদাকালো (Black & White) টিভি থাকত। হাতে গোনা দু-একটি বাড়িতে টিভি থাকলেই সেই বাড়িটি হয়ে উঠত পুরো গ্রামের বিনোদনকেন্দ্র।

৯০ এর দশকে গ্রাম বাংলার টিভি দেখার দৃশ্য ছিলো ছোটোখাটো সিনেমা হলের মতো। এখন যাদের বয়স ৩০ এর উপরে তাদের কাছে সেই সময়ের ছবিটি অনেক পরিচিত। 

  • তখন গ্রামে গঞ্জে সাদাকালো  টিভি ব্যাটারি দিয়ে দেখা হতো। গ্রামের সব বাড়িতে টিভি ছিলোনা। দেখা যেত টিভি আছে এক বাড়িতে কিন্তু সেই টিভি চালানোর ব্যাটারি চার্জ করানো হতো পাড়া প্রতিবেশিদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে। 

সবাই এক টাকা, পাঁচ টাকা করে চাঁদা দিতেন শুক্রবারের সিনেমা দেখার জন্য। প্রতি শুক্রবার বিকেল ৩.২০ মিনিটে বাংলা সিনেমা দেখানো হতো। এক শুক্রবার শেষ হলে সবাই দিন গুনতাম কবে আরেক শুক্রবার আসবে।

শুক্রবার আসলে সকাল থেকে সব কাজ গুছিয়ে জুম্মার নামায শেষ করে কোনরকমে দুপুরের খাবার খেয়ে ছুটে চলতাম টিভির সন্ধানে। এক বাড়িতে গিয়ে হয়তো দেখা গেছে তাদের টিভির ব্যাটারির চার্জ নাই তখন দৌড়ে অন্য বাড়িতে চলে আসতাম। 

  • এমন হয়েছে কোন বাড়িতে দরজা বন্ধ করে টিভি দেখতেছে অন্য কাউকে টুকতে দেয় না তখন মনে কষ্ট নিয়ে আরেক বাড়ির সন্ধানে ছুটে চলতাম। সে এক অন্যরকম অনূভুতি যা এখন ভাবলে হাস্যকর মনে হয়। 

আলিফ লায়লা নব্বই দশকের বিটিভির আর একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ছিল। আরব্য রজনীর কাহিনী নিয়ে নির্মিত এই টিভি সিরিজটি ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলো।

আজও হয়তো কেউ কেউ ‘আলিফ লায়লা’র চরিত্রগুলোর কথা চিন্তা করে হেসে ফেলেন। আলিফ লায়লা শিরোনামে গানটিও ছিলো এর দর্শকদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়।

  • সকাল থেকেই শুরু হতো ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের আনাগোনা। কারও হাতে বই, কারও গায়ে স্কুলের পোশাক, আবার কেউ খালি পায়ে দৌড়ে এসেছে—কখন টিভি দেখতে দেবে!

যে বাড়িতে টিভি ছিল, সেই বাড়ির উঠান, বারান্দা আর ঘরের মেঝে ভরে যেত শিশুদের কোলাহলে। কারও চোখ টিভির পর্দায়, কারও চোখ দরজার দিকে। 

কখন দরজা খুলবে, কখন ভেতরে ঢুকে একটু টিভি দেখা যাবে—সেই অপেক্ষায় কাটত কত বেলা!

আবার সব বাড়ির গল্প এক রকম ছিল না। কোনো কোনো বাড়ির বড়রা ছোট বাচ্চাদের টিভি দেখতে দিতে চাইতেন না। বাচ্চাদের ভিড়, চেঁচামেচি আর পড়াশোনার ক্ষতি হবে—এই ভয়ে দরজাটা আধখোলা রেখে বা প্রায় বন্ধ করে দিতেন। ভেতরে চলত টিভি, আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকত কচি কচি মুখগুলো।

  • কেউ দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিত, কেউ জানালার পাশে জায়গা খুঁজত, আবার কেউ সিঁড়িতে বসে শুধু শব্দ শুনেই অনুষ্ঠান বোঝার চেষ্টা করত। 

ভেতর থেকে হাসির শব্দ এলে বাইরের শিশুরাও হেসে উঠত, যদিও পর্দায় কী দেখানো হচ্ছে, তা তাদের অনেকেরই দেখা হতো না!

তবু পরদিন আবার আসত তারা। কারণ সেই বয়সে আনন্দের জন্য দামি খেলনা লাগত না, আলাদা বিনোদনের ব্যবস্থাও ছিল না। একটু কার্টুন, বাংলা সিনেমা কিংবা শুক্রবারের বিটিভির অনুষ্ঠান দেখার আশাতেই কতটা পথ হেঁটে আসত তারা!

আজ আমাদের ঘরে ঘরে বড় টিভি, হাতে হাতে স্মার্টফোন। ইচ্ছা করলেই নিজের ঘরে বসে হাজারো অনুষ্ঠান দেখা যায়। কিন্তু সেই সময়ের মতো একসঙ্গে বসে দেখার আনন্দ কোথায়? 

  • কোথায় সেই প্রতিবেশীর বাড়িতে অনাহূত অতিথি হয়ে যাওয়া, দরজার সামনে অপেক্ষা করা, আর একটু জায়গা পেয়ে আনন্দে চোখ বড় বড় করে পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা!

সেই বন্ধ দরজাগুলো হয়তো তখন আমাদের অনেককে টিভি দেখতে দেয়নি, কিন্তু আজ স্মৃতির দরজা খুললে দেখা যায়—সেই অপেক্ষার দিনগুলোই ছিল আমাদের শৈশবের সবচেয়ে রঙিন সময়।

আহা, নব্বইয়ের দশক! তখন টিভি ছিল অল্প কয়েকটি বাড়িতে, কিন্তু আনন্দ ছিল পুরো গ্রামজুড়ে। 

সৌজন্য : ভার্চুয়াল মোহনগঞ্জ, Mimosa Limu Howlader

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!