ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

[ ফিচার ]
বিশ্ব সোরিয়াসিস দিবস

ত্বকের গন্ডি পেরিয়ে মানুষটিকে দেখুন

ডাঃ এম আর করিম রেজা
প্রকাশিত: ০৯:৪২, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
ত্বকের গন্ডি পেরিয়ে মানুষটিকে দেখুন
সচেতনতা, সঠিক চিকিৎসা ও নিয়মিত পরিচর্যাই সোরিয়াসিস নিয়ন্ত্রণে রাখার মূল চাবিকাঠি

সোরিয়াসিস (Psoriasis) ত্বকের একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত রোগ। প্রতিবছর ২৯ অক্টোবর বিশ্ব সোরিয়াসিস দিবস পালিত হয় এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি সহমর্মিতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে।

এই রোগ রোগীর  শারীরিক এবং মানসিক সুস্থতাকে প্রভাবিত করতে পারে। আক্রান্ত  হতে পারেন নারী-পুরুষ সবাই।বয়সের ভেদাভেদ নেই। রোগটি মোটেই সংক্রামক নয়।

২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য- Look Beyond My Skin বা "ত্বকের গন্ডি পেরিয়ে মানুষটিকে দেখুন"। বিশ্বজুড়ে ১০ কোটিরও বেশি মানুষ সোরিয়াসিস বা সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস নিয়ে জীবনযাপন করছেন বলে IFPA-সংশ্লিষ্ট তথ্য জানায়। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য প্রয়োজন যথাযথ চিকিৎসা, মানসিক সমর্থন এবং বৈষম্যহীন সামাজিক পরিবেশ।

সোরিয়াসিস একটি দীর্ঘস্থায়ী অটোইমিউন রোগ, যা ত্বকের লালচে দাগ, শুষ্ক স্কেল ও ব্যথার মাধ্যমে রোগীর জীবনমানকে প্রভাবিত করে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি একেবারেই সংক্রামক নয়। মানসিক চাপ, সংক্রমণ বা আবহাওয়ার মতো কারণ উপসর্গকে বাড়িয়ে তুলতে পারে।

চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, শারীরিক লক্ষণগুলোর পাশাপাশি সোরিয়াসিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। অন্যদের কাছ থেকে পাওয়া কলঙ্ক, এড়িয়ে চলা বা অসমর্থনসূচক দৃষ্টি হীনমন্যতাবোধ বাড়িয়ে তুলতে পারে, যার ফলে রোগীরা নিজেদের গুটিয়ে নেয় এবং সামাজিক মেলামেশা সীমিত করে ফেলে। অন্যদিকে, সোরিয়াসিস সংক্রামক নয় এবং সাধারণ সংস্পর্শের মাধ্যমে এটি ছড়ায় না।

 সোরিয়াসিস কী?
সাধারণত ত্বকের পুরোনো কোষ ঝরে পড়ে এবং নতুন কোষ তৈরি হয় একটি নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ায়। কিন্তু সোরিয়াসিসে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্বাভাবিক সক্রিয়তার কারণে ত্বকের কোষ দ্রুত তৈরি হতে থাকে। ফলে ত্বকে লালচে, পুরু ও রুপালি-সাদা আঁশযুক্ত ক্ষত বা প্লাক দেখা দেয়।
এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যার উপসর্গ কখনো কমে আসে, আবার কখনো বেড়ে যেতে পারে।

সোরিয়াসিসের লক্ষণ কী?
🔹 ত্বকে লালচে, পুরু ও আঁশযুক্ত দাগ বা প্লাক দেখা দেওয়া।
🔹 আক্রান্ত স্থানে চুলকানি, শুষ্কতা বা জ্বালাপোড়া অনুভব করা।
🔹 ত্বক ফেটে যাওয়া বা কখনো রক্তপাত হওয়া।
🔹 নখে ছোট ছোট গর্ত, পুরুত্বের পরিবর্তন কিংবা নখের রং বদলে যাওয়া।
লক্ষণ ও তীব্রতা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে।

শরীরের কোন অংশে হয়?
সাধারণত কনুই, হাঁটু, মাথার ত্বক ও কোমরের আশপাশে সোরিয়াসিস দেখা যায়। হাত-পায়ের নখও আক্রান্ত হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে শরীরের বিস্তীর্ণ অংশে ছড়িয়ে পড়ে।

কেন হয়?
সোরিয়াসিসের সুনির্দিষ্ট কারণ পুরোপুরি জানা না গেলেও জিনগত প্রবণতা ও রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্বাভাবিক কার্যক্রম এর সঙ্গে জড়িত।

কিছু বিষয় রোগের উপসর্গ বাড়িয়ে দিতে পারে, যেমন—
🔸 মানসিক চাপ।
🔸 গলায় স্ট্রেপটোকক্কাল সংক্রমণসহ কিছু সংক্রমণ।
🔸 ত্বকে আঘাত বা ক্ষত।
🔸 ঠান্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়া।
🔸 কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ।

মনে রাখবেন, সোরিয়াসিস কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে হাত মেলানো, একসঙ্গে থাকা কিংবা স্পর্শের মাধ্যমে এটি ছড়ায় না।

 চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণ
সোরিয়াসিসের ধরন, তীব্রতা এবং শরীরের কতটা অংশ আক্রান্ত হয়েছে—এসব বিবেচনা করে চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়।

🔹 মৃদু সোরিয়াসিসে: চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধযুক্ত ক্রিম, মলম, লোশন বা জেল ব্যবহার করা হয়। ত্বকের শুষ্কতা কমাতে ময়েশ্চারাইজারও সহায়ক।

🔹 মাঝারি থেকে গুরুতর সোরিয়াসিসে: ফটোথেরাপি, মুখে খাওয়ার ওষুধ কিংবা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া জৈবিক ওষুধ ব্যবহার করা হতে পারে।

সোরিয়াসিসের মতো দেখতে অন্য ত্বকের রোগও রয়েছে। তাই নিজে নিজে ওষুধ ব্যবহার না করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

সোরিয়াসিস মানেই স্বাভাবিক জীবন থেমে যাওয়া নয়।
সোরিয়াসিস দীর্ঘমেয়াদি হলেও উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে এর উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। বর্তমানে এমন চিকিৎসাও রয়েছে, যা অনেকের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে রোগকে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। তবে রোগটি বারবার ফিরে আসতে পারে এবং সবার ক্ষেত্রে চিকিৎসার ফল একরকম হয় না।

কিছু রোগীর ক্ষেত্রে সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিসের কারণে জয়েন্টে ব্যথা, ফোলাভাব ও শক্ত হয়ে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই জয়েন্টে এমন উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সচেতনতা, সঠিক চিকিৎসা ও নিয়মিত পরিচর্যাই সোরিয়াসিস নিয়ন্ত্রণে রাখার মূল চাবিকাঠি। আক্রান্ত ব্যক্তির প্রতি অবহেলা বা বৈষম্য নয়—প্রয়োজন সহমর্মিতা ও সহযোগিতা। 

লেখক : ডাঃ এম আর করিম রেজা 
ত্বক, সৌন্দর্য, সংক্রামক রোগ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!