ঢাকা,  সোমবার   ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ স্বাস্থ্যকথা ]
জ্বর সেরে গেলেও ব্যথা ও দুর্বলতা থাকলে অবহেলা নয়

ফিজিওথেরাপিতে চিকুনগুনিয়া-ডেঙ্গুর ব্যথা নিরাময়

ডা. এম ইয়াছিন আলী
প্রকাশিত: ১১:২১, ৫ অক্টোবর ২০২৬
ফিজিওথেরাপিতে চিকুনগুনিয়া-ডেঙ্গুর ব্যথা নিরাময়
চিকুনগুনিয়া বা ডেঙ্গুর পর দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, দুর্বলতা কিংবা অস্বাভাবিক কোনো উপসর্গকে অবহেলা করা উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পাশাপাশি অভিজ্ঞ ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে ব্যায়াম ও পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করলে অনে

চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু—দুটি রোগই বর্তমানে আমাদের দেশে বেশ পরিচিত। এসব রোগে জ্বর, শরীরব্যথা ও দুর্বলতা সাধারণ উপসর্গ হলেও অনেকের ক্ষেত্রে জ্বর সেরে যাওয়ার পরও শরীরে নানা ধরনের সমস্যা থেকে যায়। বিশেষ করে চিকুনগুনিয়ার পর হাত-পা ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, আড়ষ্টতা, ফোলা এবং দুর্বলতা দীর্ঘদিন স্থায়ী হতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে দৈনন্দিন কাজ ও স্বাভাবিক চলাফেরাও ব্যাহত হয়।

ডেঙ্গু থেকে সুস্থ হওয়ার পরও অনেকের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা, পেশিতে ব্যথা, ক্লান্তি বা শরীরের বিভিন্ন স্থানে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। এসব উপসর্গকে স্বাভাবিক ভেবে দীর্ঘদিন অবহেলা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। রোগের তীব্র পর্যায় পার হওয়ার পর ধীরে ধীরে শারীরিক সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে বিশ্রাম, পর্যাপ্ত পানি, পুষ্টিকর খাবার এবং উপযুক্ত ব্যায়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কেন ফিজিওথেরাপি প্রয়োজন?

Advertisement
  • চিকুনগুনিয়ার পর দীর্ঘস্থায়ী অস্থিসন্ধির ব্যথা ও শক্ত হয়ে যাওয়ার কারণে অনেকেই হাত-পা কম নাড়াচাড়া করেন। এতে পেশির শক্তি আরও কমে যেতে পারে এবং অস্থিসন্ধির স্বাভাবিক নড়াচড়া ব্যাহত হতে পারে।

রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী পরিকল্পিত ফিজিওথেরাপি ও ব্যায়াম অস্থিসন্ধির নড়াচড়া বজায় রাখা, পেশির শক্তি বাড়ানো এবং দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে।

তবে সবার জন্য একই ধরনের ব্যায়াম উপযুক্ত নয়। তাই রোগীর বয়স, ব্যথার মাত্রা, অস্থিসন্ধির অবস্থা ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যার বিষয় বিবেচনা করে ফিজিওথেরাপি পরিকল্পনা করা উচিত।

সপ্তাহভিত্তিক পুনর্বাসন পরিকল্পনা

সপ্তাহ ১–২: ব্যথা ও আড়ষ্টতা নিয়ন্ত্রণ

  • প্রথম পর্যায়ে লক্ষ্য থাকবে ব্যথা কমানো এবং অস্থিসন্ধির স্বাভাবিক নড়াচড়া বজায় রাখা। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দিনে ২–৩ বার ১০–১৫ মিনিট হালকা গরম সেঁক দেওয়া যেতে পারে।

এর পাশাপাশি হালকা Range of Motion (ROM) ব্যায়াম করা যায়। যেমন—আঙুল ধীরে মুঠো করা ও খোলা, কবজি ঘোরানো, গোড়ালি ওঠানো-নামানো এবং হাঁটু ধীরে ভাঁজ ও সোজা করা। প্রতিটি ব্যায়াম ৮–১০ বার দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। ব্যথা বেড়ে গেলে ব্যায়াম বন্ধ করে বিশ্রাম নিতে হবে।

সপ্তাহ ৩–৪: স্ট্রেচিং ও হালকা ব্যায়াম

এ পর্যায়ে আগের ব্যায়ামগুলো চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি হালকা স্ট্রেচিং শুরু করা যায়। হাত-পায়ের পেশি ধীরে টেনে ১০–১৫ সেকেন্ড ধরে রাখা যেতে পারে। হ্যামস্ট্রিং বা উরুর পেছনের পেশি এবং কাঁধের জন্য উপযুক্ত স্ট্রেচিং করা যেতে পারে। প্রতিটি স্ট্রেচ রোগীর সক্ষমতা অনুযায়ী ৩–৫ বার করা যেতে পারে।

সপ্তাহ ৫–৬: পেশির শক্তি বাড়ানো

ব্যথা ও আড়ষ্টতা কমে এলে থেরাব্যান্ড বা হালকা রেজিস্ট্যান্স ব্যবহার করে শক্তিবর্ধক ব্যায়াম শুরু করা যেতে পারে। পাশাপাশি সহনীয় মাত্রায় প্রতিদিন ২০–৩০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস করা ভালো। তবে হঠাৎ করে ব্যায়ামের মাত্রা বাড়ানো উচিত নয়।

সপ্তাহ ৭–৮: স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পর্যায়

এ পর্যায়ে ধীরে ধীরে দৈনন্দিন কাজ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করতে হবে। হাঁটার সময় ও গতি বাড়ানো, হালকা ফ্রি-হ্যান্ড ব্যায়াম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যোগব্যায়াম করা যেতে পারে। ব্যথা নিয়ন্ত্রণে থাকলে ধীরে ধীরে সিঁড়ি ব্যবহারের অভ্যাসও করা যায়।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

ব্যায়ামের সময় ব্যথা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে, অস্থিসন্ধি অতিরিক্ত ফুলে গেলে বা নতুন কোনো উপসর্গ দেখা দিলে ব্যায়াম বন্ধ করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। পর্যাপ্ত পানি পান, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ ও পর্যাপ্ত বিশ্রামও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

  • ব্যথা বা ফোলা বেশি হলে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে ডেঙ্গুর পর ব্যথানাশক ওষুধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চিকুনগুনিয়া বা ডেঙ্গুর পর দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, দুর্বলতা কিংবা অস্বাভাবিক কোনো উপসর্গকে অবহেলা করা উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পাশাপাশি অভিজ্ঞ ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে ব্যায়াম ও পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করলে অনেক রোগী স্বাভাবিক চলাফেরা ও দৈনন্দিন জীবনে ফিরতে পারেন।

লেখক: ডা. এম ইয়াছিন আলী, চেয়ারম্যান ও চিফ কনসালট্যান্ট
ঢাকা সিটি ফিজিওথেরাপি হাসপাতাল, বাড়ি ১২/১, রোড ৪/এ, ধানমন্ডি, ঢাকা।
(আল আকসা মসজিদের পাশে), হটলাইন: ০১৭৮৭১০৬৭০২

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!