ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

[ স্বাস্থ্যকথা ]

স্ট্রোক-পরবর্তী প্যারালাইসিসে ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশন

স্ট্রোকের কারণে দেড় কোটি লোক পঙ্গু হচ্ছে
ডা. এম ইয়াছিন আলী
প্রকাশিত: ১০:২১, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
স্ট্রোক-পরবর্তী প্যারালাইসিসে ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশন
স্ট্রোক প্রতিরোধে রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান পরিহার, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ জরুরি

বিশ্ব স্ট্রোক দিবস

  • বিশ্বে প্রতি ৬ সেকেন্ডে একজন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। বছরে আক্রান্ত হন প্রায় ৬ কোটি এবং মারা যান ২ কোটি মানুষ। স্ট্রোকের কারণে দেড় কোটি লোক পঙ্গু হচ্ছে। প্রতি ৬ জনে ১ জনের স্ট্রোকে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি থাকে। স্ট্রোকে আক্রান্তদের মধ্যে ৪০ ভাগ মারা যায়, আর ৩০ ভাগ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তাঁরা বেঁচে থেকেও দুর্বিষহ জীবনযাপন করেন। আমেরিকানদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের মৃত্যুর কারণ স্ট্রোক।

স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান কারণ ধূমপান। তামাকের ক্ষতিকর রাসায়নিক মস্তিষ্কের রক্তনালিতে প্রদাহ সৃষ্টি করে, রক্তনালির সংকোচন ঘটায় এবং রক্ত জমাট বাঁধায়, যা ইসকেমিক স্ট্রোকে রূপ নেয়। ধূমপান ও তামাক সেবন উচ্চরক্তচাপ ও ডায়বেটিসের জন্য দায়ী- যা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য তথ্যানুযায়ী, স্ট্রোক বিশ্বে  মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের সম্মিলিত হিসেবে তৃতীয় প্রধান কারণ। বাংলাদেশে প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে মৃত্যুর প্রধান কারণ ‘স্ট্রোক’। বিশ্বব্যাপী এক কোটি ২২ লাখ মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়, ৬৬ লাখ মারা যায় (২০২২ সালের হিসাবে)।

Paralysis Rehabilitation After Stroke | Fast Recovery & Expert Care - Varia  Physiotherapy Clinic | Vertigo Parkinson's Neuro Physiotherapy Center

  • যারা প্রাণে বাঁচেন তাদের বেশিরভাগ অকালে পঙ্গুত্বের শিকার হন। আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে ৮০ শতাংশ স্ট্রোক বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে ঘটবে।

স্ট্রোকে আক্রান্তের হার দিন দিন বেড়েই চলছে। অনেক ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাবেই এই রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। আমাদের দেশে এখন ১৫ থেকে ২০ লাখ স্ট্রোকের রোগী রয়েছে। স্ট্রোক সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রতিবছর ২৯ অক্টোবর, 'বিশ্ব স্ট্রোক দিবস' উদযাপিত হয়।

বিশ্ব স্ট্রোক দিবস ২০২৬-এর ‘The Time Is Now’ প্রতিপাদ্য আমাদের আহ্বান জানায়—স্ট্রোকের লক্ষণ চিনুন, দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করুন এবং স্ট্রোক-পরবর্তী পুনর্বাসনকে চিকিৎসার অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করুন। 

স্ট্রোকের পর প্যারালাইসিস মানেই জীবনের সব সম্ভাবনার অবসান নয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা, নিয়মিত ফিজিওথেরাপি, সমন্বিত রিহ্যাবিলিটেশন এবং পরিবারের সহযোগিতায় অনেক রোগী আবারও স্বনির্ভর ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনে ফিরে আসতে পারেন।

প্রতিবছর ২৯ অক্টোবর বিশ্ব স্ট্রোক দিবস পালিত হয়। দিবসটির উদ্দেশ্য হলো স্ট্রোক সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং স্ট্রোকজনিত অক্ষমতা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে মানুষকে উৎসাহিত করা। 

Stroke Symptoms and Treatment, Warning Signs

স্ট্রোক এমন একটি ইমার্জেন্সি অসুস্থতা, যাতে কয়েক মিনিটের মধ্যে মানুষ প্রাণ হারাতে পারে।

আসুন জেনে নেওয়া যাক স্ট্রোক কী, কেন হয়, কোন কোন উপসর্গ দেখলে সচেতন হওয়া প্রয়োজন, FAST নিয়ম জেনে কীভাবে স্ট্রোক শনাক্ত করা যায়, এবং ব্রেন স্ট্রোকের সময় কী করার দরকার। এছাড়াও জেনে নিন ব্রেন স্ট্রোক থেকে বাঁচার উপায় সম্বন্ধেও।

স্ট্রোক-এর লক্ষণ চিনবেন কীভাবে?
স্ট্রোক চেনার জন্য আন্তর্জাতিক ভাবে FAST নিয়ম মানা হয়। FAST, অর্থাৎ Face, Arm, Speech, ও Time.

F (Face) মুখ বেঁকে যাওয়া
মুখের একপাশ হঠাৎ ঢিলে হয়ে যায় বা ঝুলে পড়ে।

A (Arm) হাত পা অবশ হয়ে যাওয়া
শরীরের একপাশের হাত বা পা হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়া, জোর না থাকা, এগুলি স্ট্রোকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। 

S (Speech) কথা জড়িয়ে যাওয়া
হঠাৎ কথা জড়িয়ে যাওয়াও স্ট্রোকের লক্ষণ।

T (Time) ঠিক সময়ে নিন সঠিক স্টেপ
উপরে দেওয়া লক্ষণগুলির মধ্যে একটিও যদি দেখা যায় কারোর মধ্যে, তাঁকে নিয়ে তৎক্ষণাৎ নিকটবর্তী হাসপাতালে যান।

FAST নিয়ম মনে রাখা মানেই কারোর জীবন বাঁচিয়ে দেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া।

স্ট্রোক কী ও কেন হয়?

মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে অথবা মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে স্ট্রোক হয়। এর ফলে মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, ধূমপান, স্থূলতা, অনিয়মিত হৃদ্‌স্পন্দন এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।

স্ট্রোকের পর অনেক রোগীর শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে যায় অথবা সম্পূর্ণ অবশ হয়ে পড়ে। একে হেমিপ্লেজিয়া বা হেমিপ্যারেসিস বলা হয়। কারও হাঁটাচলা, হাতের কাজ, কথা বলা, গিলতে পারা কিংবা দৈনন্দিন কাজ সম্পাদনে সমস্যা দেখা দেয়।

ফলে রোগীকে দীর্ঘদিন অন্যের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হতে পারে। তবে সময়মতো চিকিৎসা ও পরিকল্পিত পুনর্বাসনের মাধ্যমে অনেক রোগীর কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা সম্ভব।

Hemorrhagic Stroke: Symptoms, Causes & Treatment | Acibadem

স্ট্রোকের লক্ষণ চিনুন, দ্রুত হাসপাতালে নিন

স্ট্রোকের লক্ষণ সাধারণত হঠাৎ দেখা দেয়। মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, এক হাত বা পা দুর্বল হয়ে পড়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, কথা বুঝতে অসুবিধা, হঠাৎ দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, ভারসাম্য হারানো কিংবা তীব্র মাথাব্যথা হতে পারে সতর্কসংকেত।

এসব লক্ষণ দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। লক্ষণ কখন শুরু হয়েছে, সেই সময়টি মনে রাখা জরুরি। স্ট্রোকের ধরন নির্ণয় করে চিকিৎসক দ্রুত উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। নিজে থেকে ওষুধ, বিশেষ করে অ্যাসপিরিন, দেওয়া উচিত নয়; কারণ রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকের ক্ষেত্রে তা ক্ষতিকর হতে পারে।

স্ট্রোক-পরবর্তী প্যারালাইসিসে ফিজিওথেরাপির গুরুত্ব

স্ট্রোকের চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীর সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মস্তিষ্কের ক্ষতির কারণে হারিয়ে যাওয়া নড়াচড়া, ভারসাম্য ও দৈনন্দিন কাজের দক্ষতা পুনরুদ্ধারে নিয়মিত ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক পুনর্বাসন কার্যকর ভূমিকা রাখে।

রোগীর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল হলে চিকিৎসক ও পুনর্বাসন দলের পরামর্শে যত দ্রুত সম্ভব পুনর্বাসন শুরু করা উচিত। ফিজিওথেরাপিস্ট রোগীর দুর্বলতা, পেশির শক্তি, জয়েন্টের নড়াচড়া, ভারসাম্য ও চলাফেরার সক্ষমতা মূল্যায়ন করে চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করেন।

What Stroke Recovery Looks Like Today | Tufts Now

ফিজিওথেরাপির গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে—

১. জয়েন্টের নড়াচড়া ও পেশির নমনীয়তা বজায় রাখা: আক্রান্ত হাত-পায়ের উপযুক্ত ব্যায়াম জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া, পেশি সংকুচিত হওয়া এবং ব্যথার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

২. পেশির শক্তি ও নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি: ধাপে ধাপে নির্ধারিত ব্যায়ামের মাধ্যমে রোগীর নড়াচড়ার ক্ষমতা উন্নত করা হয়।

৩. বসা, দাঁড়ানো ও হাঁটার প্রশিক্ষণ: ভারসাম্য অনুশীলন, স্থানান্তর প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হাঁটার সহায়ক উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে রোগীকে নিরাপদে চলাফেরা করতে শেখানো হয়।

৪. হাতের কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনা: দৈনন্দিন কাজের উপযোগী পুনরাবৃত্তিমূলক অনুশীলনের মাধ্যমে হাতের ব্যবহার ও সমন্বয় উন্নত করার চেষ্টা করা হয়।

৫. জটিলতা প্রতিরোধ: সঠিক অবস্থানে শোয়ানো ও বসানো, আক্রান্ত কাঁধের যত্ন, নিরাপদ চলাচল এবং উপযুক্ত ব্যায়াম ব্যথা, জয়েন্টের সমস্যা ও দীর্ঘক্ষণ শুয়ে থাকার কারণে সৃষ্ট জটিলতার ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।

সমন্বিত পুনর্বাসন কেন প্রয়োজন?

স্ট্রোকের পর শুধু ফিজিওথেরাপিই নয়, রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি, গিলতে পারার সমস্যা ব্যবস্থাপনা, পুষ্টি পরামর্শ এবং মানসিক সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ।

Brunnstrom Stages of Stroke Recovery: What Each Phase Mean

নিউরোলজিষ্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, অন্যান্য পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞ ও পরিবারের সদস্যদের সমন্বিত প্রচেষ্টা রোগীর পুনরুদ্ধারকে আরও কার্যকর করতে পারে।

পরিবারের সদস্যদের রোগীকে নিরাপদে বসানো, স্থানান্তর করা, নির্ধারিত ব্যায়ামে সহায়তা করা এবং নিয়মিত চিকিৎসা অনুসরণ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ নেওয়া উচিত। রোগীকে অতিরিক্ত নির্ভরশীল না করে তাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী নিজে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। তবে প্রশিক্ষণ ছাড়া জোর করে হাঁটানো বা আক্রান্ত হাত টেনে তোলা উচিত নয়।

প্রতিরোধ ও সচেতনতাই প্রধান

স্ট্রোক প্রতিরোধে রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান পরিহার, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে স্ট্রোকের লক্ষণ সম্পর্কে পরিবার ও সমাজের সচেতনতা বাড়াতে হবে।


লেখক : ডা. এম ইয়াছিন আলী
চেয়ারম্যান ও চীফ কনসালটেন্ট, ঢাকা সিটি ফিজিওথেরাপি হাসপাতাল 
ধানমন্ডি,  ঢাকা। মোবাঃ ০১৭৮৭১০৬৭০২
।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!