হাঁটাহাঁটি : শারিরীক ও মানসিক সুস্থতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখে
সুস্থ থাকার সবচেয়ে সহজ অভ্যাসগুলোর একটি হলো হাঁটা। নিয়মিত হাঁটা হৃদ্যন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায় এবং মানসিক সুস্থতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
পাশাপাশি, এটি মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তির অবনতি ধীর করতে সহায়ক হতে পারে। তবে সবার শারীরিক অবস্থা এক নয়। তাই কিছু মানুষের হাঁটার সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
নিয়মিত হাঁটার স্বাস্থ্য উপকারিতা
- হৃদ্যন্ত্রের সুরক্ষা: দ্রুত হাঁটা রক্তসঞ্চালন উন্নত করে এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
- রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ: নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা উন্নত করতে সহায়তা করে।
- মানসিক প্রশান্তি: হাঁটা মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমাতে এবং মেজাজ ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে।
- স্মৃতি ও মনোযোগ: নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও চিন্তাশক্তি বজায় রাখতে সহায়ক। দীর্ঘমেয়াদে এটি জ্ঞানীয় সক্ষমতা হ্রাসের ঝুঁকি কমানোর সঙ্গেও সম্পর্কিত।
- পেশি ও ভারসাম্য: হাঁটা পায়ের পেশি সক্রিয় রাখে, চলাফেরার সক্ষমতা বজায় রাখে এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।
মস্তিষ্কের সুস্থতায় হাঁটার ভূমিকা
হাঁটার সময় মস্তিষ্ক, মেরুরজ্জু, স্নায়ু ও পেশি সমন্বিতভাবে কাজ করে। মস্তিষ্ক চলাফেরার নির্দেশ দেয়, সেরিবেলাম ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে, আর স্নায়ু সেই নির্দেশ পেশিতে পৌঁছে দেয়।
নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বাড়ায় এবং মস্তিষ্কের কোষের কার্যক্রম ও স্নায়ু-সংযোগ বজায় রাখতে সহায়তা করে। ব্যায়ামের ফলে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু উপাদানের কার্যক্রমেও ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটতে পারে।
তবে হাঁটা সরাসরি নতুন স্নায়ুকোষ তৈরি করে বা ডিমেনশিয়া প্রতিরোধের নিশ্চয়তা দেয়—এমন দাবি করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। বরং নিয়মিত হাঁটা মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস।
হাঁটা: শরীরের পাশাপাশি মনেরও অনুশীলন
হাঁটার সময় শরীর সক্রিয় থাকে, আর পরিবেশের সঙ্গে মনোযোগের সংযোগ তৈরি হয়। প্রকৃতির মধ্যে হাঁটা অনেকের ক্ষেত্রে মানসিক চাপ কমাতে, মনকে শান্ত করতে এবং চিন্তাকে গুছিয়ে নিতে সাহায্য করে।
দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকার অভ্যাস কমিয়ে মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটাচলা করাও উপকারী। এতে শরীর সচল থাকে এবং নিষ্ক্রিয়তার ক্ষতিকর প্রভাব কমানো সম্ভব হয়।
প্রতিদিন কতক্ষণ হাঁটা উচিত?
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যকলাপ—যেমন দ্রুত হাঁটা—করার পরামর্শ দেওয়া হয়। অর্থাৎ, সপ্তাহের পাঁচ দিন প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিনিট হাঁটা একটি ভালো লক্ষ্য।
তবে একবারে ৩০ মিনিট হাঁটা সম্ভব না হলে সময়টিকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে নেওয়া যায়। শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী ধীরে শুরু করে ধীরে ধীরে সময় ও গতি বাড়ানো ভালো। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে মাঝেমধ্যে উঠে কিছুক্ষণ হাঁটাচলাও উপকারী।
যাঁদের হাঁটার সময় সতর্ক থাকা প্রয়োজন
হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসে ভুগছেন যাঁরা, হাঁটু-কোমরের গুরুতর সমস্যা, পায়ে ক্ষত বা স্নায়ুর সমস্যা রয়েছে যাঁদের, ভারসাম্যহীনতা কিংবা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে এমন বয়স্ক ব্যক্তি এবং অস্ত্রোপচার বা গুরুতর অসুস্থতা থেকে সেরে উঠছেন যাঁদের, তাঁদের হাঁটার সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। গর্ভাবস্থায় জটিলতা থাকলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
তবে এসব সমস্যা থাকলেই হাঁটা বন্ধ করতে হবে, এমন নয়—শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী হাঁটার সময় ও গতি নির্ধারণ করা উচিত। হাঁটার সময় বুকে ব্যথা, অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট বা মাথা ঘোরা দেখা দিলে অবিলম্বে থামতে হবে এবং গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

সুস্থ জীবনের সহজ অভ্যাস
হাঁটার জন্য ব্যয়বহুল সরঞ্জাম বা বিশেষ জায়গার প্রয়োজন নেই। নিরাপদ পরিবেশে নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস গড়ে তোলাই যথেষ্ট। বয়স, শারীরিক সক্ষমতা ও স্বাস্থ্যগত অবস্থা অনুযায়ী হাঁটার ধরন ও সময় নির্ধারণ করা উচিত।
প্রতিটি পদক্ষেপ সুস্থতার দিকে এক ধাপ। নিয়মিত হাঁটা শরীরকে সচল রাখে, মন ভালো রাখতে সাহায্য করে এবং দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের সুস্থতা বজায় রাখার সম্ভাবনা বাড়ায়।
তাই প্রতিদিনের জীবনে হাঁটার জন্য কিছুটা সময় রাখাই হতে পারে সুস্থ ভবিষ্যতের দিকে একটি সহজ, কার্যকর পদক্ষেপ।
লেখক : ডাঃ এম আর করিম রেজা
ত্বক, সৌন্দর্য, সংক্রামক রোগ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।