ঢাকা,  শুক্রবার   ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ শিল্প ও সাহিত্য ]

প্রেমান্ধ সকাল

মনিরুজ্জামান পলাশ
প্রকাশিত: ১০:২৪, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
প্রেমান্ধ সকাল
তারপর অঘ্রাণের চাঁদ, ধীরে ধীরে তার অবশিষ্ট অর্ধেকও হারায়। ছাতিমের গন্ধে ঘুমিয়ে পড়ে আলোর সমস্ত বংশপরিচয়।

জানালায় ঝুলে আছে অঘ্রাণের আধখানা চাঁদ—
বাকি অর্ধেক, তোমার করোটির ভিতর
কোনো প্রাচীন প্রাসাদান্দরে, নূপুরের ছন্দের মতো খেলা করে।

দূরে কাকজোছনায় ছাতিম সুবাসে
রাত্রির নগ্ন গায়ে কে যেন সেলাই করে দেয়
জরিন সুতোয় কয়েকটি সুগন্ধি বোতাম।

বাতাস বুকপকেটে স্বযত্নে ধরে রাখে
একটি মৃত পাখির অনূদিত পালক,
সে পালকের উদ্ধারকৃত মায়া
উড়ে যায় আলোদের বাড়ি— ওয়ারী-বটেশ্বরে 
সেখানে প্রাগৈতিহাসিক দরজার নিচে জমে আছে
অবাধ্য অন্ধকারের হলুদ কঙ্কাল।

তারা জানে না, আমাদের প্রথম চুম্বনেরও আগে
একটি নীল মাছ জন্মেছিল এখানে শূন্যের গর্ভে?
তার আঁশে লেখা ছিল
হারানো উপপাদ্যের মতো তোমার নাম অচেনা হরফে।

সে হরফ পাঠোদ্ধার করতে গিয়ে দেখি,
প্রতিটি বর্ণের ভিতর ঘুমিয়ে আছে
একেকটি নির্বাসিত ঋতুর স্বেদশ্রুতি 
আর ঋতুগুলোর পায়ে বাঁধা
প্রমিথিউসের চুরি-করা আগুনের শিকল।

তোমার চোখে তখন ইউরিডিসের দ্বিতীয় মৃত্যু—
অথচ অর্ফিয়ুসের হাতে কোনো বাঁশি নেই,
আছে কেবল একটি বিচূর্ণ আয়না।
যার প্রতিফলনে শাসকের চোখ
দেখতে পায় না বঞ্চিত মানুষের বুকে জমা করুণ আর্তনাদ।

আমি পশ্চাতে তাকাই না ফিরে, চলে যাই 
হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোর পথে
সেখানে আমার সমস্ত ছায়া
তোমার দিকে হেঁটে যায় সময়ের উল্টো পায়ে।

তুমি যেন জিউসের ছদ্মাবরণে আসা
কোনো নিরপরাধ বৃষ্টির ষাঁড়—
তোমার শিংয়ে বিদ্ধ কুম্ভকর্ণের ঘুম,
তোমার নিঃশ্বাসে ক্রিটের গোলকধাঁধা,
আর আমার বুকের ভিতর মিনোটরের বদলে গর্জে ওঠে
একটি অনাথ শামুকের অনাদিকালের আদিম ক্ষুধা।

সেখানে থিসিউস নেই,
নেই কোনো সূক্ষ্ম সুতোই বাঁধা শক্তির গোলক,
নেই ফিরে যাওয়ার কোনো পৌরাণিক অনুমতি।

শুধু তোমার ঠোঁট থেকে ঝরে-পড়া
দুটি অক্ষর, যার একটি—মৃত্যু,
অন্যটি—মৃত্যুকে মনে না রাখা।

এইসব দেখে দেখে
সুখের উত্তাপ বুকে তোলে নতুন প্রেমের স্ফটিক
তার স্বচ্ছতার মধ্যে দেখতে পাই ড্যাফনির পাতাহীন রূপান্তর,
নার্সিসাসের জলে ডুবে-যাওয়া আত্মপ্রতিকৃতি,
আর হেডিসের মুকুটে আটকে থাকা
একটি ডালিমের অসমাপ্ত লাল দানা।

তুমি তখন আমার দিকে তাকাও— যেন তাকানো নয়,
কোনো অদৃশ্য জ্যামিতি থেকে দুটি সমান্তরাল শূন্যকে
একটি অসম্ভব চুম্বকে পরিণত করা।
আমি তোমাকে ছুঁতে পারি না।

শুধু জানালার কাচে জমে থাকা শিশিরের ভিতর
নিজের আঙুলের অনুপস্থিতি রেখে দিই সন্তর্পণে।

তারপর অঘ্রাণের চাঁদ, ধীরে ধীরে তার অবশিষ্ট অর্ধেকও হারায়।
ছাতিমের গন্ধে ঘুমিয়ে পড়ে আলোর সমস্ত বংশপরিচয়।

আর আমরা— দুটি নামহীন উপমা,
একটি পরিত্যক্ত প্রাসাদে, পরস্পরবিরোধী ক্ষয়িষ্ণু দুই শিলালিপি—
একই গন্তব্যে যেতে যেতে ক্রমশ পৃথক হয়ে যাই।

কেবল বুকপকেটে, বাতাসের বেগ, ক্ষুদ্র গ্রন্থি কিছুটা
সুগন্ধির মায়া রয়ে যায়,
যার ভিতর, আজও তোমার ঠোঁটের আদলে ফুটে ওঠে
একটি অসম্ভব প্রেমান্ধ সবুজ সকাল।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!