ক্ষমতায় ফেরার দ্বিতীয় বার্ষিকী উদযাপন করছে তালেবান
আফগানিস্তানের তালেবানরা তাদের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের দ্বিতীয় বার্ষিকী উদযাপন করেছে। প্রায় ২০ বছর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিদেশি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পর ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট পুনরায় ক্ষমতায় ফিরেছিল গোষ্ঠীটি।
মঙ্গলবার (১৫ আগস্ট) তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘কাবুল বিজয়ের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে আমরা আফগানিস্তানের মুজাহিদ (পবিত্র যোদ্ধা) জাতিকে অভিনন্দন জানাতে চাই এবং তাদের এই মহান বিজয়ের জন্য সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই।’
এদিকে মঙ্গলবার ছুটি ঘোষণা করায় রাজধানীতে ছিল কঠোর নিরাপত্তা। তালেবান যোদ্ধা, সমর্থক এবং কাবুলের কিছু বাসিন্দা রাস্তায় জড়ো হয়েছিল বিজয় উদযাপনের জন্য। রাস্তাগুলোতে কালো ও সাদা পতাকা নেড়ে সেনা ও শিশুদের নিয়ে অনানুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজ করেছে তালেবান।
.png)
কাবুলের বাসিন্দা সাইয়েদ হাশমতুল্লাহ সাদাত বলেন, ‘আজ আমি এখানে তালেবানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর স্মৃতিচারণ করতে এসেছি। সেই দিনটি ছিল যেদিন আফগানিস্তানের শত্রুকে আমাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল, সে কারণেই আমি এখানে উদযাপন করতে এসেছি।’
যেভাবে সবাইকে অবাক করে দিয়ে কাবুলের পতন ঘটায় তালেবান
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তান সফরে এসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা জেনারেল মার্ক ম্যাকেঞ্জি। দোহা চুক্তি অনুযায়ী, আফগানিস্তান থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহার করে নেওয়ার কয়েক মাস আগে ইসলামাবাদ সফরে যান তিনি।
এর আগের বছর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাতারের রাজধানী দোহায় তালেবানের সঙ্গে চুক্তি করে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র কথা দেয় আফগানিস্তানে শান্তি ফিরিয়ে আনতে তারা নিজ সেনাসহ সব বিদেশি সেনাদের প্রত্যাহার করে নিয়ে যাবে।
তার এ সফরের মাত্র পাঁচ মাস পর বিনা বাধায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে নেয় তালেবান। তাদের পুনরায় ক্ষমতা দখলের দুই বছর পূর্ণ হয়েছে ২০২৩ সালের ১৫ আগস্টে। সেনা প্রত্যাহার করার আগে ধারণা করা হয়েছিল তালেবান সহজেই ক্ষমতা দখল করতে পারবে না। এ নিয়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্যও তৈরি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান। কিন্তু তাদের সেসব তথ্য পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত হয়। কিন্তু কেন সেসব পূর্ব ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়?
মার্কিন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা মার্ক ম্যাকেঞ্জি পাকিস্তান সফরে গিয়ে দেশটির তৎকালীন সেনাপ্রধান কামার জাবেদ বাজওয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন। তাদের আলোচনার মূল বিষয় ছিল— মার্কিন সেনারা চলে গেলে তালেবান কতদিনের মধ্যে ক্ষমতা দখল করতে পারে।
জেনারেল ম্যাকেঞ্জি পাকিস্তানের অনুমান বা গোয়েন্দা তথ্য জানতে চেয়েছিলেন, কারণ আফগানদের সঙ্গে পাকিস্তানের ভালো সম্পর্ক ছিল এবং তারা আফগানিস্তানের প্রতিবেশী দেশ ছিল।
গোয়েন্দা সংস্থার বরাতে জেনারেল বাজওয়া তখন বলেছিলেন, তালেবান হয়ত দেশের অন্যান্য অঞ্চলের দখল দ্রুত নিয়ে নেবে। কিন্তু এত সহজে রাজধানী কাবুল দখল করতে পারবে না।
কারণ হিসেবে বাজওয়া বলেছিলেন, যখন তালেবান কাবুল দখল করতে আসবে তখন আফগানিস্তানের সেনাবাহিনী তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
এমনকি বাজওয়া আরো বলেছিলেন, তার বিশ্বাস মার্কিন সেনারা চলে যাওয়ার পর কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নিতে তালেবানের ১ বছর বা তারও বেশি সময় লাগবে।
তিনি ওই বৈঠকে মার্কিন জেনারেলকে বলেছিলেন, এ সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আফগানিস্তানে একটি সর্বদলীয় সরকার গঠনে সব পক্ষকে রাজী করতে পর্যাপ্ত সময় পাবে। পাক সেনাপ্রধানের এমন তথ্যে যুক্তরাষ্ট্র মনে করেছিল, খুব দ্রুতই কিছু হবে না।
তবে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণা করেন তখন দৃশ্যপট পাল্টে যায়। প্রথম অবস্থায় মার্কিন গোয়েন্দারা ধারণা করেন, সেনা প্রত্যাহারের ৯ মাসের মধ্যে তালেবানের হাতে কাবুলের পতন হবে। কিন্তু কিছুদিন বাদে সেটি তিন মাসে নামিয়ে আনা হয়।
তালেবান যখন একের পর এক প্রদেশ দখল করতে থাকে তখন নিজেদের গোয়েন্দা তথ্যে পরিবর্তন আনে মার্কিনিরা।
কিন্তু সেনা প্রত্যাহারের এক বছর, নয় মাস, তিন মাস তো দূরে থাক— যখন সব সেনাই প্রত্যাহার করা সম্ভব হয়নি তখন কাবুলের উপকণ্ঠে চলে আসে তালেবান। আর সবাইকে চমকে দিয়ে আফগান সেনাবাহিনীর সব সেনা পালিয়ে যান।
প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনিও উপায়ন্তর না দেখে দ্রুত দেশ ত্যাগ করেন। এরমাধ্যমে কোনো রক্তপাত ছাড়া কাবুল দখল করে তালেবান।
কাবুলের এমন দ্রুত পতনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে গোয়েন্দা তথ্যের দুর্বলতা তখন স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছিল।
মূলত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে তৈরি করা সেনাবাহিনীর কোনো প্রতিরোধ না গড়া এবং প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি মার্কিনিদের সব গোয়েন্দা তথ্যকে ভুল প্রমাণ করে। এখন দুই বছর পর পুরো দেশজুড়ে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে তালেবান।
সূত্র: এক্সপ্রেস ট্রিবিউন