গ্যাবনের নতুন নেতা, কে এই ব্রিস ওলিগুই এনগুয়েমা
মধ্য আফ্রিকার দেশ গ্যাবনে অভ্যুত্থানের পর নতুন নেতা হিসেবে জেনারেল ব্রিস ওলিগুই এনগুয়েমার নাম ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি গ্যাবনের অভিজাত রিপাবলিকান গার্ডের নেতা হিসেবে এতদিন দায়িত্ব পালন করছিলেন।
ক্ষমতা দখলের আগেও এনগুয়েমা গ্যাবনের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অন্যতম একজন ছিলেন। তার বাবা ছিলেন সেনা কর্মকর্তা। সন্তান এনগুয়েমা মরক্কোর মেকনেসে রয়াল মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেন।
গত বুধবার (৩০ আগস্ট) গ্যাবনের নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা করা ফল অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট আলী বোঙ্গো অনডিম্বা তৃতীয়বারের মতো নির্বাচনে জয়ী হন। কিন্তু কিছুক্ষণের মাঝেই সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে নির্বাচনের ফল বাতিল বলে ঘোষণা দেন।
.png)
স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো জানায়, দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী নিরাপত্তা ইউনিট ‘গ্যাবনিজ রিপাবলিকান গার্ড’ এর কমান্ডার-ইন-চিফ ব্রিস ওলিগুই এনগুয়েমা এই অভ্যুত্থানের সর্বময় নেতৃত্বে রয়েছেন।
শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব এনগুয়েমা
এনগুয়েমা মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেয়ার পর গ্যাবনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ওমর বোঙ্গোর রিপাবলিকান গার্ডের একজন কমান্ডার হিসেবে কাজ করেন।
২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট ওমরের মৃত্যু হলে অক্টোবরে তার ছেলে আলী বোঙ্গো ক্ষমতাসীন হন। এনগুয়েমাকে মরক্কো ও সেনেগালে কূটনীতিক মিশনে পাঠানো হয়। বছর দশেক পর তিনি দেশে ফিরে রিপাবলিকান গার্ডের প্রধান হিসেবে নিয়োগ পান।
সবুজ ব্যারেট (এক ধরনের টুপি) পরিহিত এই বাহিনীর কাজ প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই বাহিনীর প্রধান হিসেবে এনগুয়েমা গ্যাবনের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এমন কিছু সংস্কার করেন, যা আলীর ক্ষমতায় থাকার পথ মসৃণ করে।
জানা যায়, এনগুয়েমা তার অধীনস্থ বাহিনীর জন্য একটি গানও রচনা করেন। এতে বলা ছিল, ‘থাকব বিশ্বস্ত, দিয়ে এই মন প্রাণ, রক্ষা করব প্রেসিডেন্টের সম্মান।’
বিতর্কিত ব্যবসার সঙ্গে সংযুক্তির অভিযোগ
সেনাবাহিনী ও কূটনীতিক দায়িত্বের পাশাপাশি, এনগুয়েমা ব্যবসায়ী হিসেবেও সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠতে থাকেন। গ্যাবনের হাতে গোনা কোটিপতিদের একজন তিনি। ‘অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্ট’ (ওসিসিআরপি) ২০২০ সালে বোঙ্গো পরিবারের সম্পদ নিয়ে তদন্তে নামে। এই তদন্তে জানা যায়, এনগুয়েমা আবাসন ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন, নগদ অর্থ দিয়ে মূল্য পরিশোধ করেন।
ওসিসিআরপির রিপোর্ট থেকে আরও জানা যায়, এনগুয়েমা ২০১৫ ও ২০১৮ সালে রাজধানীর বাইরে উপশহরে ৩টি জমি কেনেন। ম্যারিল্যান্ড, হায়াটসভিলের উপশহর ও রাজধানীর একদম কাছে অবস্থিত সিলভার স্প্রিং এলাকায় তিনি এই জমিগুলো কেনেন। এসব এলাকায় মূলত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের বাস। এখানে থাকা বাড়িগুলো এনগুয়েমা ১ মিলিয়ন ডলার নগদ অর্থ দিয়ে কেনেন।
সাংবাদিকরা এ নিয়ে প্রশ্ন তুললে তিনি একে ব্যক্তিগত ব্যাপার বলে পাশ কাটিয়ে যান। বলেন, ‘আমার মনে হয় ব্যক্তিগত জীবন ব্যক্তিগতই, তা সে ফ্রান্স বা আমেরিকা- যেখানেই হোক না কেন; আর সেটার প্রতি অন্যদের সম্মানটুকু থাকা দরকার।’
ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট এনগুয়েমা
গত বুধবার ফরাসি দৈনিক লে মোন্ডেতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এনগুয়েমার কথায় তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রতিধ্বনিত হয়।
তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপ্রধান আলী বোঙ্গোর শাসন নিয়ে অসন্তুষ্টির পাশাপাশি তার অসুস্থতাও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। ২০১৮ এর অক্টোবরে তার স্ট্রোক হয়, তিনি দুর্বল হয়ে পড়েন। এ নিয়ে সবাই বলছিলেন, কিন্তু দায়িত্ব নিতে কেউ এগিয়ে আসছিলেন না। টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসীন হবার অধিকার তার ছিল না, এটা সংবিধানের লঙ্ঘন; এমনকি নির্বাচনটিও সঠিক হয়নি। তাই সেনাবাহিনী ঠিক করল, তারা নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।’
‘আলী বোঙ্গো অবসর নিয়ে অন্যান্য গ্যাবনিজ নাগরিকদের মতো সব সুবিধা ভোগ করে সসম্মানে জীবন যাপন করতে পারবেন’, যোগ করেন এনগুয়েমা।
বোঙ্গো এখন গৃহবন্দি রয়েছেন। ৬৪ দশমিক ২৭ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হলেও তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়, যার কলকাঠি নাড়েন এনগুয়েমা।
গ্যাবনের সেনাসদস্যরা ইতোমধ্যে এনগুয়েমার ক্ষমতায় আরোহণ উদযাপন করতে শুরু করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কিছু ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। যাতে দেখা যায়, একদল সৈন্য এনগুয়েমাকে নিয়ে নাচছেন, বলছেন এনগুয়েমাই ‘আগামীর সিংহপুরুষ।’
সূত্র: আল-জাজিরা