ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ আন্তর্জাতিক ]

গাজা যুদ্ধের ৬ মাস: হামাস নির্মূলে কতটা সফল ইসরায়েল?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:০১, ৭ এপ্রিল ২০২৪
গাজা যুদ্ধের ৬ মাস: হামাস নির্মূলে কতটা সফল ইসরায়েল?
ফাইল ছবি

গত বছর ৭ অক্টোবর হামাসের নজিরবিহীন হামলার শিকার হওয়ার পর ফিলিস্তিনিদের সশস্ত্র এই সংগঠনটিকে ‘গুঁড়িয়ে দেওয়ার এবং নিশ্চিহ্ন করে ফেলার’ প্রতিজ্ঞা নিয়ে গাজার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ইসরায়েল। যাতে হামাস আর কোনো দিন দেশটির জন্য হুমকি হয়ে উঠতে না পারে। 

গাজায় ইসরায়েলের সেই অভিযানের ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। এ ছয় মাসে ৩৩ হাজারের বেশি বেসামরিক ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের একটি বড় অংশ নারী ও শিশু। গাজার বেশিরভাগ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।  গাজার প্রায় ২৩ লাখ মানুষের সবাই বাস্তুচ্যুত, অনাহারে দিন কাটাচ্ছে এবং ছোট্ট এই ভূখণ্ডটিতে দুর্ভিক্ষ আসন্ন।

এদিকে চলমান এ হামলায় সব দিক থেকেই চাপের মুখে রয়েছে নেতানিয়াহু সরকার। তবে এটা পরিষ্কার যে, হামাসকে নির্মূলে সফল হয়নি ইসরায়েল। কীভাবে যুদ্ধ শেষ হবে বা পরবর্তী সময়ে কী করতে হবে– তা নিয়েও ইসরায়েলের কোনো দৃশ্যমান পরিকল্পনা নেই।

Advertisement

গত শনিবার এক দিনে গাজায় ইসরায়েলের হামলায় আরো ৪৬ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৬৫ জন। ছয় মাসে মোট ৩৩ হাজার ১৩৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৭৫ হাজারের বেশি মানুষ। এ অবস্থায় একটি যুদ্ধবিরতির দিকে রয়েছে পুরো বিশ্ব। 

ইসরায়েলি বোমায় বিধ্বস্ত ভবনে বসে আছে দুই ফিলিস্তিনি শিশু দেখছে ক্ষয়ক্ষতি।

লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ ইসরায়েল

বিশ্লেষকদের ভাষ্যমতে, গাজা উপত্যকাটির শাসকগোষ্ঠী হামাসকে নির্মূল ও জিম্মি হওয়া ইসরায়েলিদের দেশে ফিরিয়ে আনার যে দুই লক্ষ্যের কথা জানিয়েছিল ইসরায়েল তার কোনোটিই  অর্জন করতে পারেননি নেতানিয়াহু।

যদিও চলমান সংঘাতে গাজায় নিজেদের সফলতার কিছু ফিরিস্তি দিয়েছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। তাদের দাবি, শীর্ষস্থানীয় বেশির ভাগ নেতাসহ হামাসের কয়েক হাজার সদস্যকে হত্যা করেছে তারা। গত নভেম্বরে যুদ্ধবিরতির সময় শতাধিক জিম্মিকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এরপরও হামাসের হাতে বর্তমানে জিম্মি প্রায় ১৩০ জন। আশঙ্কা তাদের মধ্যে অনেকের মৃত্যু হয়েছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক খালেদ এলগিন্দি বলেন, গাজায় চলমান সংঘাতের স্থায়িত্ব, তীব্রতা, ব্যাপকতা ও প্রাণহানি নিয়ে সবাই যে আশঙ্কা করছিলেন, আমার ধারণা, তা বহুলাংশে ছাড়িয়ে গেছে। গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে ইসরায়েলের কোনো কার্যকর পরিকল্পনা আছে বলে মনে হচ্ছে না।

হামলায় আহত শিশুদের উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছেন ফিলিস্তিনিরা।

হামাস নির্মূল অসম্ভব

বিশ্লেষকদের অনেকের ধারণা, হামাসকে নির্মূলের যে লক্ষ্য নিয়ে ইসরায়েল হামলা শুরু করেছিল, সেটা অর্জন সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে জেরুজালেমভিত্তিক বিশেষজ্ঞ ও লেখক নাথান থরাল বলেন, ইসরায়েল হামাসকে নির্মূল করতে পারবে না। কারণ, পশ্চিম তীর ও গাজায় ফিলিস্তিনি সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে পড়েছে সংগঠনটি। বিগত মাসগুলোয় হামাসের জনপ্রিয়তা আরো বেড়েছে।

৭ অক্টোবর গাজাজুড়ে বোমাবর্ষণ শুরুর পর ওই মাসের শেষের দিকে উপত্যকাটির উত্তরাঞ্চলে স্থল অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। পরে দক্ষিণেও স্থল অভিযান চালানো হয়।

ইসরায়েলের দাবি, এসব অঞ্চলে হামাসকে পরাজিত করেছে তারা। এখন ইসরায়েলের লক্ষ্য সর্ব দক্ষিণে মিসর সীমান্তের রাফা এলাকা। হামলার মুখে গাজার ২৪ লাখ বাসিন্দার বেশির ভাগই আশ্রয় নিয়েছেন সেখানে।

নাথান থরাল বলেন, উত্তরে হামাসকে পরাজিত করা হয়েছে, ইসরায়েলের এমন দাবির পর থেকে আপনি দেখতে পাবেন, প্রতি সপ্তাহেই সেখানে ইসরায়েলি সেনারা মারা যাচ্ছেন। ইসরায়েল রাফায় হামলা চালাক বা না চালাক, তাই এটা পরিষ্কার যে যুদ্ধের পরও হামাস থেকে যাবে। এর অর্থ সংঘাত থেকে বের হওয়ার কার্যকর কোনো পথ খোলা নেই ইসরায়েলি নেতাদের সামনে। 

আল-শিফা হাসপাতালটি সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে ইসরায়েলি বাহিনী

ভবিষ্যতে কী হবে?

গত ফেব্রুয়ারিতে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, যুদ্ধের পর তিনি গাজাকে সম্পূর্ণ অস্ত্রমুক্ত করতে চান। মিসরের সঙ্গে উপত্যকাটির সীমান্তও বন্ধ করবেন। ঢেলে সাজাবেন সেখানকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা। একই সময়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিতে আন্তর্জাতিক মহলের যে চাপ রয়েছে, তাও অগ্রাহ্য করেন তিনি। যুদ্ধের পর ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের গাজা শাসনের বিষয়টিও উড়িয়ে দিয়েছে তার সরকার।

গাজায় শিগগিরই যুদ্ধবিরতির কোনো সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। গত নভেম্বরের পর নতুন যুদ্ধবিরতির সব আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাস হলেও তা নাকচ করে দিয়েছে ইসরায়েল সরকার। জাতিসংঘের সমালোচনা করে নেতানিয়াহু সরকার বলেছে, কেউ পাশে না থাকলেও গাজায় হামলা চালিয়ে যাবে তারা।

গাজার রাফাহ এলাকায় খাদ্যসহায়তা নিতে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে কয়েকটি শিশু

এমন পরিস্থিতিতে সামনের দিনগুলোতে কী হতে পারে, তা সম্পর্কে একটি ধারণা দিয়েছেন গবেষক খালেদ এলগিন্দি। তিনি বলেন, যেটা হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, তা হলো গাজায় অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী থেকে যাবে। এতে সেখানে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে পারে। বিশৃঙ্খলা বাড়তে পারে। কেউ যদি মনে করে গাজায় এমন অবস্থা চলছে, তা ইসরায়েলিদের জন্য নিরাপত্তা বয়ে আনবে, তাহলে তিনি বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছেন।

চাপের মুখে ইসরায়েল সরকার

গাজায় ভয়ানক মানবিক সংকট সত্ত্বেও অব্যাহতভাবে হামাসকে তাড়া করা বৈশ্বিক পর্যায়ে ইসরায়েলকে একঘরে করে দিয়েছে। ইসরায়েলের বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকার সব দিক থেকেই চাপের মুখে রয়েছে। বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, ইসরায়েল যা করেছে, তা গণহত্যা বলে গণ্য হতে পারে। ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশগুলোও এখন নেতানিয়াহু সরকারের সমালোচনা করছে। ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ না করতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ওপর চাপ বাড়ছে। 

গাজায় ইসরায়েলের হামলার ছয় মাসে ১৯৬ জন ত্রাণকর্মী নিহত হন। ফাইল ছবি

ছয় মাসে ইসরায়েলি হামলায় যত ত্রাণকর্মী নিহত

গাজায় ইসরায়েলের হামলার ছয় মাসে ১৯৬ জন ত্রাণকর্মী নিহত হন। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ইসরায়েলের কাছ জানতে চান, তাদের কেন হত্যা করা হয়েছে। অবরুদ্ধ উপত্যকার পরিস্থিতি একেবারেই খারাপ। তাঁর প্রত্যাশা, ইসরায়েল গাজায় ত্রাণ সরবরাহে বাধা দেবে না। গত সপ্তাহে তিনটি গাড়িতে হামলা চালিয়ে বিদেশি সাত কর্মীকে হত্যা করে ইসরায়েল। নিহতদের মধ্যে তিনজন ব্রিটিশ, একজন পোলিস, একজন অস্ট্রেলীয়, একজন মার্কিনি ও একজন ফিলিস্তিনি রয়েছেন। এ ঘটনা বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় তোলে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ফোন করে নেতানিয়াহুকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের হুমকি দেন।    

ডেইলি-বাংলাদেশ/আরএএইচ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!