ঢাকা,  বুধবার   ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ আন্তর্জাতিক ]

নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় বেরিয়ে গেলেন বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৬:৩২, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় বেরিয়ে গেলেন বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি
সংগৃহীত ছবি

পশ্চিমা বিশ্বের ক্রমবর্ধমান সমালোচনা ও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেই গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে (ইউএনজিএ) ভাষণ দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

শুক্রবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া পশ্চিমা দেশগুলোর তীব্র সমালোচনা করেন তিনি।

Advertisement

নেতানিয়াহু বলেন, ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া ‘লজ্জাজনক সিদ্ধান্ত’। তার ভাষায়, ‘এটি আপনাদের সবার জন্য একটি কলঙ্কের চিহ্ন হয়ে থাকবে।’ তিনি দাবি করেন, এই সিদ্ধান্ত ইহুদি ও বিশ্বজুড়ে নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসবাদকে উৎসাহিত’ করবে।

গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখোমুখি থাকা নেতানিয়াহু যখন মঞ্চে ওঠেন, তখন সাধারণ পরিষদের কক্ষ থেকে বহু প্রতিনিধি বেরিয়ে যান। ফলে তার ভাষণের সময় মিলনায়তনের একটি বড় অংশ ফাঁকা ছিল।

নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সময় নিউইয়র্কের রাজপথেও তার সফরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন হাজারো মানুষ। বিক্ষোভকারীরা গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধের দাবি জানান। গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৬৫ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিক্ষোভে ফিলিস্তিনি যুব আন্দোলনের এক প্রতিনিধি বলেন, ‘নিউইয়র্ক সিটিতে তাকে স্বাগত জানানো হচ্ছে না।’ যুক্তরাষ্ট্র ও নিউইয়র্কের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নেতানিয়াহুকে ‘লাল গালিচা সংবর্ধনা’ দেওয়ার সমালোচনা করে তিনি এটিকে ‘অন্যায় ও বিবেকহীন’ বলে মন্তব্য করেন।

জাতিসংঘের ভাষণে নেতানিয়াহু বলেন, আন্তর্জাতিক চাপ ও সমালোচনা সত্ত্বেও ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েলকে গাজায় ‘কাজ শেষ করতেই হবে’।

তিনি বলেন, ‘পশ্চিমা নেতারা চাপের মুখে নতিস্বীকার করে থাকতে পারেন। তবে আমি আপনাদের একটি বিষয়ে নিশ্চয়তা দিচ্ছি—ইসরায়েল তা করবে না।’

নেতানিয়াহুর ভাষণ লাউডস্পিকারের মাধ্যমে গাজায় সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। ভাষণে তিনি গাজায় আটক ইসরায়েলি জিম্মিদের উদ্দেশে সরাসরি বার্তাও দেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা এক সেকেন্ডের জন্যও তোমাদের ভুলিনি। ইসরায়েলের জনগণ তোমাদের সঙ্গে আছে। তোমাদের সবাইকে ফিরিয়ে না আনা পর্যন্ত আমরা থামব না, বিশ্রাম নেব না।’

নেতানিয়াহু আরও দাবি করেন, তার বক্তব্য হামাসের নেতৃত্বসহ গাজার মানুষের মোবাইল ফোনেও পাঠানো হচ্ছে। তিনি হামাসের প্রতি অস্ত্র সমর্পণ ও জিম্মিদের মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, তা না হলে তাদের ‘মৃত্যু নিশ্চিত’।

তবে সমালোচকেরা বলছেন, গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছাতে নেতানিয়াহুর অনিচ্ছাই জিম্মিদের মুক্তির পথে অন্যতম প্রধান বাধা। ইসরায়েলি পার্লামেন্টের সদস্যসহ দেশটির বিরোধী রাজনৈতিক নেতারাও তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক স্বার্থে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার অভিযোগ করেছেন।

পুরো ভাষণজুড়েই নেতানিয়াহু তার পুরোনো অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন এবং গাজায় সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা হিসেবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।

ইসরায়েলের আঞ্চলিক সামরিক কর্মকাণ্ডের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি ‘সাত ফ্রন্টে যুদ্ধ’-এর কথাও বলেন। ‘দ্য কার্স’ বা ‘অভিশাপ’ শিরোনামের একটি মানচিত্র দেখিয়ে গাজা, ইয়েমেন, ইরান, সিরিয়া, লেবানন ও ইরাকি মিলিশিয়াসহ ইসরায়েল যেসব পক্ষের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলোর তালিকা তুলে ধরেন তিনি।

পশ্চিমা মিত্রদের সমালোচনা করলেও ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেননি নেতানিয়াহু। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান সমর্থক এবং দেশটির প্রধান সামরিক সহযোগী।

পশ্চিমা নেতাদের উদ্দেশে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আপনারা মনে মনে জানেন যে, ইসরায়েল মূলত আপনাদের যুদ্ধটাই লড়ছে।’ এ সময় তিনি দাবি করেন, রুদ্ধদ্বার বৈঠকে পশ্চিমা নেতারা তাঁকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ থেকে তাদের রক্ষার প্রচেষ্টার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।

ভাষণের সময় উপস্থিত মার্কিন প্রতিনিধি দলের সদস্যদের তালি দিতে দেখা যায়।

এদিকে, জাতিসংঘের একটি তদন্ত দল এবং বিশ্বের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করলেও নেতানিয়াহু এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর দাবি, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী যদি গণহত্যা চালাতে চাইত, তাহলে গাজার বাসিন্দাদের এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানাত না।

গাজায় দুর্ভিক্ষ ঘোষণার পরও সেখানে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে জনগণকে অনাহারে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেন নেতানিয়াহু। এর জন্য তিনি হামাসকে দায়ী করে বলেন, সংগঠনটি ত্রাণ চুরি করে তা বিক্রি করে যুদ্ধের অর্থ জোগায়।

তবে জুনের শেষ দিকে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডির একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাঠানো ত্রাণ হামাস পদ্ধতিগতভাবে লুট করেছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদও জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর ভাষণের সমালোচনা করেছেন। তিনি ভাষণটিকে ‘একঘেয়ে ও ঘ্যানঘ্যানে’ এবং ‘পুরোনো চটকদার কৌশলে’ ভরা বলে মন্তব্য করেন।

লাপিদের অভিযোগ, গাজায় আটক ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি নিশ্চিত করতে নেতানিয়াহু কোনো নতুন শান্তি পরিকল্পনাও উপস্থাপন করতে পারেননি।

ডেইলি-বাংলাদেশ/একেকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!