রোহিঙ্গাদের নিজ গ্রাম থেকে উৎখাত করতে কেন মরিয়া আরাকান আর্মি
দিন দিন ক্রমেই জটিল হচ্ছে মিয়ানমারের পরিস্থিতি। দীর্ঘ ১১ মাসের লড়াই-সংঘাতের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ)।
জানা গেছে, গত রোববার দুপুরে মংডু টাউনশিপের দক্ষিণে দেশটির বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) সর্বশেষ ৫ নম্বর সীমান্ত ব্যাটালিয়নটিও দখলে নেয় তারা। ফলে, মংডু আরাকান আর্মির দখলে চলে যাওয়ায় দেশটির রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তাঝুঁকি বেড়েছে। রাখাইন রাজ্যে এখনো পাঁচ লাখের মতো রোহিঙ্গা আছে। তাদের সঙ্গে আরাকান আর্মির বিরোধ আছে।
একটি সূত্র জানিয়েছে যে, আরাকান আর্মি নামে পরিচিত বৌদ্ধ উগ্রপন্থী রাখাইন জঙ্গি গোষ্ঠী মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের মংডু শহরের অবশিষ্ট রোহিঙ্গা গ্রাম ও ওয়ার্ডগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে পুড়িয়ে দিচ্ছে।
.png)
মংডুর এক বাসিন্দা জানান, আরাকান আর্মি মংডুর ডাউনটাউনের মং নি পাড়া, পিউ জি পাড়া, আলী পাড়া এবং ০২ নং ওয়ার্ডের ঘরবাড়ি ও ভবন ইচ্ছাকৃতভাবে পুড়িয়ে দিচ্ছে কারণ তারা রোহিঙ্গাদের আসল গ্রাম ও ওয়ার্ডে থাকতে দিতে চায় না। তাদের লক্ষ্য শহরের কেন্দ্রস্থলকে রোহিঙ্গামুক্ত এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা।
মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম ডেমোক্রেটিক ভয়েস ফর বার্মার তথ্যানুযায়ী, মিয়ানমারে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আরাকানে থেকে যাওয়া ৬ লাখ রোহিঙ্গা গণহত্যা, জোরপূর্বক স্থানান্তর, নির্যাতন, ইচ্ছামতো গ্রেফতার ও আটক, যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং আরো বহু ধরনের নৃশংসতার শিকার হয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির (এএ) হাতে তারা এই দমনপীড়ন ভোগ করছে এবং দুই পক্ষের সংঘর্ষের মাঝে আটকে পড়েছে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, বাংলাদেশ সীমান্ত কঠোরভাবে বন্ধ থাকায় রোহিঙ্গারা পালিয়েও যেতে পারছে না।

আগে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করার লক্ষ্যে তাদের নির্যাতন করতো। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর আরাকানে আরাকান আর্মি (এএ) আরো শক্তিশালী হয়ে উঠায় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ইচ্ছামতো কাজ করার সুযোগ পেয়েছে, বিশেষকরে টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে।
আরকান আর্মির লক্ষ্য কী
মিয়ানমারের সব বিদ্রোহী বাহিনীই সামরিক শাসনের অবসান চাইলেও তাদের প্রত্যেকের চূড়ান্ত লক্ষ্য ভিন্ন। অধিকাংশ জাতিগত সংখ্যালঘু বাহিনী এবং গণতন্ত্রপন্থী মিলিশিয়ারা (বর্মণ সম্প্রদায়ের) একটি গণতান্ত্রিক ফেডারেল ইউনিয়ন চায়। তবে আরাকান আর্মি (এএ) রাখাইন রাজ্যের জন্য একটি অস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত ‘কনফেডারেট স্ট্যাটাস’ দাবি করেছে।
আরাকান আর্মির নেতা তোয়ান ম্রাত নাইন ২০২২ সালে এশিয়া টাইমস পত্রিকাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, মিয়ানমারের ফেডারেল ইউনিয়নে আমাদের আরাকানবাসীর জন্য চাওয়া কনফেডারেশনের জন্য রাজনৈতিক জায়গা থাকবে কি না, তা আমরা দেখব।
রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার
মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে স্থলসীমান্ত থাকায় উভয় সীমান্তে রাখাইন ও রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের লোক আছে। বাংলাদেশে রাখাইন সম্প্রদায়ের যেসব লোক আছে, তারা শুধু পূর্ণ নাগরিক মর্যাদা উপভোগ করছেন না, তাদের অনেকেই অনেক রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে মিয়ানমার ঠিক উল্টো আচরণ করেছে।
সম্প্রতি আরকান আর্মিরা রোহিঙ্গা বেসামরিক লোকদের ওপর তাদের নৃশংসতা বাড়িয়ে তুলেছে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বক্তব্য ও মিথ্যা প্রচারণা চালাচ্ছে এবং রোহিঙ্গাদের তাদের প্রকৃত পরিচয়—আরাকানের স্থানীয় জনগোষ্ঠী—হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করছে।

বর্তমান পরিস্থিতি রোহিঙ্গাদের নিয়ে প্রশ্নই সামনে হাজির করে যে, আরাকান আর্মি যে ‘আরাকান ড্রিমের’ কথা বলে, তা কি শুধুই রাখাইন বৌদ্ধদের জন্য। যদি ‘আরাকান ড্রিম’ সত্যিই আন্তরিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, তাহলে আরাকান আর্মি অবশ্যই রোহিঙ্গা এবং আমাদের স্বদেশের অন্যান্য জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ বন্ধ করতে হবে এবং একসঙ্গে একটি শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। কিন্তু আরাকান আর্মি তা করছে না।
রোহিঙ্গা ও আরাকান আর্মির সর্ম্পক
রাখাইন রাজ্যের অধিকাংশ এলাকা যেহেতু আরাকান আর্মির দখলে চলে যাওয়ায় রাজ্যটি যে এএ’ই শাসন করবে, তা প্রায় নিশ্চিত বলে ধরা নেয়া হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করেন, রাজ্যটি আরাকান আর্মির শাসনে রোহিঙ্গাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হতে পারে। কারণ রোহিঙ্গা মুসলমানদের প্রতি আরাকান আর্মির মনোভাব পরিবর্তিত হয়েছে। তাদের অবস্থান প্রথমে সহিষ্ণু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মনে হলেও, এ বছর তারা গণহত্যার অভিযোগের সম্মুখীন হয়েছে।
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে আরাকান আর্মির কঠোর অবস্থানের পেছনে কারণ ছিল জান্তার একটি প্রচারণা। আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য জান্তা বাহিনী প্রায়ই রোহিঙ্গা পুরুষদের জোর করে মিলিশিয়া বাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করত।
জাতিসংঘের তদন্তকারীরা রোহিঙ্গাদের ওপর আরাকান আর্মি ও জান্তা বাহিনীর আক্রমণের প্রমাণ পেয়েছেন। গত ৫ আগস্ট মংডু শহর থেকে বাংলাদেশে পালাতে চাওয়া অনেক রোহিঙ্গাকে ড্রোন ও আর্টিলারি হামলায় হত্যা করা হয়। বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই হামলা এএ চালিয়েছে। তবে এএ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।