ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ আন্তর্জাতিক ]

সিরিয়ার অর্থনীতি পুনর্গঠন: স্থিতিশীলতা ফিরে পেতে চ্যালেঞ্জ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৭:৫৬, ৮ জানুয়ারি ২০২৫
সিরিয়ার অর্থনীতি পুনর্গঠন: স্থিতিশীলতা ফিরে পেতে চ্যালেঞ্জ
ফাইল ফটো

সিরিয়ায় স্বৈরাচারী শাসক বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর বলা যায় উত্তরাধিকারসূত্রেই একটি সংকট-বিধ্বস্ত অর্থনীতি পেয়েছে দেশটি। ফলে ক্রমাগত যুদ্ধ এবং নিষেধাজ্ঞায় বৈদেশিক মুদ্রা তলানিতে ঠেকা দেশটির অর্থনীতিকে সচল করতে গিয়ে মুদ্রাস্ফীতির মুখোমুখি হচ্ছে নতুন নেতৃত্ব।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে একজন সিরিয়ান কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানে পাউন্ডের মূল্য হ্রাস পেয়ে মুদ্রাস্ফীতি তিন অঙ্কে পৌঁছেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মাত্র ২০০ মিলিয়ন ডলার। ২০১০ সালের শেষেও, যা প্রায় ১৭ বিলিয়ন ছিলো। প্রায় ১৩ দশমিক ১ মিলিয়ন সিরিয়ান নাগরিক খাদ্যকষ্টে ভুগছেন। শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা।

এই পরিস্থিতিতে সিরিয়ার বর্তমান ক্ষমতায় থাকা হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) যেটি এখনো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যদের দ্বারা সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে অনুমোদিত দেশ পুনর্গঠনে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে।

Advertisement

যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞা
সিরিয়া প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ একটি দেশ। ২০১১ সালের আগে, সিরিয়ার অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে ছিল।  

বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে ২০১১ সালে শুরু হওয়া বিদ্রোহ সহিংসতায় রূপ নিলে কমপক্ষে অর্ধ মিলিয়ন লোক মারা গিয়েছিল। রাস্তা এবং কৃষিজমিসহ অনেক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ঐ সময় আসাদ সরকারকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। দামেস্ককে পুঁজিবাজারে প্রবেশাধিকার, পশ্চিমা সাহায্য এবং পণ্যের রাজস্ব সব কিছুতে তাদের প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ফলে ২০১০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সিরিয়ার মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৫৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ৯০ শতাংশ সিরিয়ান এখনো দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে। 

ম্যাসাচুসেটসের হ্যাম্পশায়ার কলেজের সিরিয়ার অর্থনীতির অধ্যাপক ওমর দাহি বলেছেন, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাব এখনো বিদ্যমান। যুদ্ধ-সম্পর্কিত খরচ ছাড়াও নিষেধাজ্ঞাগুলো ব্যবসায়িক কার্যকলাপ হ্রাস করেছে এবং সরকারের করভিত্তিক আয় সংকুচিত করেছে। তবে কয়েক বছর ধরে, রাশিয়া এবং ইরান পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাগুলো উপেক্ষা করে আল-আসাদ সরকারকে সহায়তা করেছিল। মস্কো এবং তেহরান, সিরিয়াকে খাদ্য ও জ্বালানি আমদানির অনুমতি দিয়েছিল।

অভিবাসী সংকট
১৪ বছরের অব্যাহত সংঘাতে দেশ ছেড়েছে প্রায় ৫০ লাখ সিরীয় মানুষ, যা দেশটির সমগ্র জনসংখ্যার প্রায় ২০ ভাগ। পাশাপাশি ইউনাইটেড নেশনস অফিস ফর দি কো-অর্ডিনেশন অব হিউম্যানিটেরিয়ান অ্যাফেয়ার্সের (ওসিএইচ) তথ্যমতে, যুদ্ধের কবলে পড়ে দেশের মধ্যেই বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন প্রায় ৭০ লাখ সিরীয়। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর আবাসন নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। 

মুদ্রাস্ফীতি
পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যাপক অবমূল্যায়ন হয়েছে দেশটির মুদ্রারও। এর জেরে সিরিয়ার মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে বিপুলভাবে। সিরিয়ান সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ-এর তথ্যমতে, বর্তমানে সিরিয়ার অর্ধেকের বেশি লোক অবস্থান করছে দারিদ্র্যসীমার নিচে। তাদের মধ্যে বেশিরভাগ প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় খাদ্য সংগ্রহেও হিমশিম খাচ্ছে।

যুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত সিরিয়া ছিল মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সমৃদ্ধ দেশ। দেশটির অর্থনীতির প্রধান দুই ভিত্তি ছিল তেল সম্পদ ও কৃষি উৎপাদন। সিরীয় সরকারের রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস ছিল তেল উত্তোলন। পাশাপাশি কৃষি ছিল জিডিপির মূল ভিত্তি। তবে প্রায় দেড় দশকের যুদ্ধে বর্তমানে তেল শিল্প ও কৃষি উৎপাদন দুই খাতই বিধ্বস্তপ্রায়। যুদ্ধের শুরুতেই বাশার আল-আসাদের সরকার নিয়ন্ত্রণ হারায় সিরিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় অবস্থিত তেল ক্ষেত্রগুলো থেকে।

বিনিয়োগের অভাব
সিরিয়ার অর্থনীতি পুনর্গঠনের পথে আরো একটি বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অভাব। কারণ যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার পুনর্গঠনে প্রয়োজন হবে বিপুল পরিমাণ অর্থের। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না এলে দেশটির জন্য আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

২০১৯ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার পুনর্গঠনে তখনই প্রয়োজন ছিল প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার। এরপর যুদ্ধে আরো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশটি। ফলে সিরিয়া পুনর্গঠনের বর্তমান খরচ বেড়ে দাঁড়াবে অনেক বেশি। পাশাপাশি নিজ দেশের জনগণের ওপর নির্যাতন, গণহত্যা এবং অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে সাবেক শাসক বাশার আল-আসাদের সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব। বাশার আল-আসাদ বিদায় হলেও পশ্চিমা বিশ্ব এ নিষেধাজ্ঞা তুলবে কি না সে ব্যাপারেও রয়েছে অস্পষ্টতা।

এ পরিস্থিতিতে বাশার আল-আসাদ পরবর্তী সিরিয়ার এই নতুন নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি দিতে হবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই। বাশার আল-আসাদের পতনের পর থেকেই তুরস্কসহ প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেয়া সিরীয় শরণার্থীরা দলে দলে দেশে ফিরতে শুরু করেছেন। পাশাপাশি যুদ্ধের কারণে নিজের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়ে বিভিন্ন আশ্রয় শিবির কিংবা দেশের ভেতরেই অন্যত্র আশ্রয় নেয়া সিরীয়রা নিজ নিজ ঘরবাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন। 

এই বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রয়োজনীয় সুবিধা দেওয়া থেকে শুরু করে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করারও চাপ মোকাবিলা করতে হবে সিরিয়ার নতুন শাসকদের। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এ পরীক্ষায় তারা কতটা সফল হতে পারবেন তার ওপরই নির্ভর করবে সিরিয়ার ভবিষ্যৎ।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!