ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ আন্তর্জাতিক ]
হিলিয়াম সংকট

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় বিপর্যস্ত হতে পারে এমআরআই সেবা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ২১:৩৪, ২৮ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় বিপর্যস্ত হতে পারে এমআরআই সেবা
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা বৈশ্বিক হিলিয়াম সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী অবস্থান এবং তেহরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ফলে বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হিলিয়াম সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। চিকিৎসাক্ষেত্রে এমআরআই স্ক্যান থেকে শুরু করে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প—উচ্চপ্রযুক্তির বহু খাতে এই গ্যাস অপরিহার্য হওয়ায় এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

এই সংকটের পেছনে প্রধান কারণ দুটি—হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা এবং বিশ্বের অন্যতম বড় উৎপাদক কাতারের উৎপাদন ব্যাহত হওয়া। উপসাগরীয় এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে উত্তেজনা বাড়ার পর জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ইরানের পক্ষ থেকে প্রণালি ব্যবহারে কঠোর শর্ত আরোপ করায় সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

উৎপাদনের দিক থেকে কাতারের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ২০২৫ সালে দেশটি প্রায় ৬৩ মিলিয়ন ঘনমিটার হিলিয়াম উৎপাদন করে, যা বৈশ্বিক মোট উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ফলে কাতারে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া মানেই বিশ্ববাজারে বড় ধাক্কা। কাতারএনার্জি জানিয়েছে, তাদের তরল হিলিয়াম রপ্তানি বছরে প্রায় ১৪ শতাংশ কমে যেতে পারে।

Advertisement

হিলিয়াম মূলত এলএনজি উৎপাদনের একটি উপ-পণ্য। তাই এলএনজি উৎপাদন কমে গেলে হিলিয়ামও কমে যায়। কাতারের রাস লাফান ও মেসাইয়িদ অঞ্চলে জ্বালানি স্থাপনায় হামলার অভিযোগের পর উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে আগুন লাগার ঘটনায় দেশটির এলএনজি রপ্তানির প্রায় ১৭ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার আর্থিক ক্ষতি বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। মেরামতের কারণে বছরে ১২.৮ মিলিয়ন টন এলএনজি উৎপাদন আগামী ৩ থেকে ৫ বছর বন্ধ থাকতে পারে।

হিলিয়াম পরিবহনও একটি জটিল প্রক্রিয়া। এটি খুবই হালকা গ্যাস হওয়ায় তরল করে বিশেষ কনটেইনারে সংরক্ষণ করা হয় এবং ৪৫ দিনের মধ্যে পরিবহন সম্পন্ন করতে হয়। কাতার থেকে এই কনটেইনারগুলো মূলত সমুদ্রপথে রপ্তানি হয়, যার অধিকাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। ফলে এই পথ বন্ধ বা সীমিত হলে সরবরাহে বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়।

এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, তাইওয়ান ও চীন—যারা কাতারের হিলিয়ামের প্রধান আমদানিকারক। সরবরাহ কমে গেলে এসব দেশের প্রযুক্তি ও চিকিৎসা খাতে চাপ বাড়বে এবং বাজারে দামও বৃদ্ধি পেতে পারে।

হিলিয়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্যাস। এটি খুব নিম্ন তাপমাত্রায় ঠান্ডা রাখা যায় এবং রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয় হওয়ায় অন্যান্য উপাদানকে দূষিত করে না। এ কারণে এমআরআই মেশিনের সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেট ঠান্ডা রাখতে এটি অপরিহার্য। এছাড়া সেমিকন্ডাক্টর চিপ উৎপাদন, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, বেলুন ও এয়ারশিপেও এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিলিয়ামের কার্যকর কোনো বিকল্প না থাকায় এর ঘাটতি প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ২০০৬ সালের পর এটিকে পঞ্চম বড় বৈশ্বিক হিলিয়াম সংকট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। যদিও হিলিয়ামবিহীন এমআরআই ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চলছে, তবুও এখনো অধিকাংশ যন্ত্রই এই গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় হিলিয়াম উৎপাদক, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের ৪০ শতাংশের বেশি। এক্সন মোবিল, নর্থ আমেরিকান হিলিয়ামসহ বিভিন্ন কোম্পানি উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। পাশাপাশি এয়ার লিকুইডের মতো প্রতিষ্ঠান বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাজ করছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা সম্ভব নয়। ফলে বৈশ্বিক হিলিয়াম বাজারে অস্থিরতা আরও কিছু সময় অব্যাহত থাকতে পারে।

সূত্র: আল-জাজিরা

ডেইলি-বাংলাদেশ/AS
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!