ইমরান খানের শক্ত ঘাঁটিতে সরকারের জরুরি অবস্থা জারি
স্কুল বন্ধ, ইন্টারনেট আংশিকভাবে বন্ধ। শিপিং কন্টেইনার দিয়ে রাস্তা অবরুদ্ধ। আর শহরে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
এই চিত্র পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দলের শক্ত ঘাঁটি খাইবার পাখতুনখোয়ায়, যেখানে এখন জরুরি অবস্থা জারি রয়েছে। একইসঙ্গে তার দলের প্রাদেশিক সরকারও স্থগিত করা হয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সমর্থক এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের মধ্যে চলমান এই দ্বন্দ্বে এটি আরেক দফা নাটকীয় উত্তেজনা বৃদ্ধি। যেটি নিয়ে কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, এর ফলে অস্থিতিশীলতা কমার পরিবর্তে বরং আরো বেড়ে যেতে পারে।
কেন্দ্রীয় সরকারের মতে, সংবিধানসম্মত এই পদক্ষেপটি নেওয়ার প্রয়োজন হয়েছিল প্রদেশের জনগণকে সন্ত্রাসবাদের হুমকি থেকে রক্ষা করতে।
কেন্দ্রীয় তথ্যমন্ত্রী আতাহ তারার গত রোববার সাংবাদিকদের বলেন, "খাইবার পাখতুনখোয়ায় (কেপিকে) পিটিআই এর সরকার সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আঁতাত করে চলছিল।"
তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি বা কোনো প্রমাণও দেননি। যদিও শিগগিরই তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
এর দুই দিন পরেও তার কাছ থেকে নতুন কোনো খবর পাওয়া যায়নি, কিন্তু পেশোয়ার এবং এই প্রদেশের বেশিরভাগ অংশে স্কুলগুলো আবার খুলে দেওয়া হয়েছে।
একইসঙ্গে, ইন্টারনেট পরিষেবাও সচল করা হয়েছে।
পুলিশ কাউকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত না করলেও বিক্ষোভ রোধে যে একটি দমন অভিযান চলছে সেটি স্পষ্ট। এই প্রদেশের অধিকাংশ পিটিআই নেতা আত্মগোপন করেছেন।
মঙ্গলবার প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদির নিজ শহর খাইবার জেলার বারা শহরে কয়েক ডজন পিটিআই সমর্থক রাস্তায় নেমে আসে।
রোববার জরুরি অবস্থা জারির এই ঘোষণার সময়টি অনেক পর্যবেক্ষকের কাছেই কাকতালীয় নয়।
গত এক সপ্তাহ ধরে, ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে তার হাজার হাজার সমর্থক খাইবার পাখতুনখোয়ায় মিছিল, সমাবেশ ও পদযাত্রা করেছে। এই প্রদেশে পিটিআই ১৩ বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো ফারজানা শেখ বলেন, "এর প্রতিক্রিয়ায় যা বলা হচ্ছে, তা বেশ কপটতাপূর্ণ শোনাচ্ছিল।”
সাংবাদিক ও ধারা ভাষ্যকার আরিফা নূর বলেন, "সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র আমি দেখতে পাচ্ছি না।"
"এমনকি আমি এ ব্যাপারেও নিশ্চিত নই যে, এই লং মার্চটিই এর কারণ (জরুরি অবস্থা জারি) ছিল কি না। হয়তো এটাই ছিল শেষ আঘাত অথবা হয়তো তারা বলতে চেয়েছে যে, সরকার কোনো বিরোধী দলের হাতে থাকুক, তা আমরা মেনে নিতে রাজি নই।"
এই বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেন মুখ্যমন্ত্রী আফ্রিদি, যার অবস্থান কোথায় তা নিয়ে এখনো রহস্য আছে। তার দল বলছে, তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদিকে, সরকার বলছে সুরক্ষা হেফাজতে রয়েছেন তিনি।
এই পদযাত্রা শুরু হওয়ার আগেই দমন-পীড়ন চালানো হয়েছিল। গত সেপ্টেম্বর মাসে ইমরান খানের তিন বোনকে সমর্থকদের সংগঠিত করাসহ অন্যান্য অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়।
ওই সময় থেকে এখনো আটক রয়েছেন তারা।
গত এক বছরে পরিবার বা আইনজীবীদের সঙ্গে মি. খানের খুব কমই দেখা হয়েছে। গত অগাস্ট মাসে তার দুই বোন তাকে দেখেতে গিয়েছিলেন।
এর মধ্যে, এক বোন কারাগারেই মি. খানের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। যখন সুপ্রিম কোর্ট মি. খানের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করার পর হাসপাতালে পরীক্ষা করাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তখন আরেক বোন তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন।
এরপরই তাকে আবার কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়, যেখানে তিনি তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্দি আছেন।
এই পিটিআই নেতা পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর সঙ্গে মতবিরোধের কারণে ক্ষমতা হারিয়েছেন বলে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়। তিনি ২০২৩ সালের অগাস্ট থেকে কারাবন্দি আছেন।
বেশ কয়েকটি দুর্নীতি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন তিনি। এই মামলাগুলোকে তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।
দলটি ইতোমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়লেও কর্তৃপক্ষ কেন এমন প্রতিক্রিয়া দেখালো?
আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র সাউথ এশিয়া ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, "ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পিটিআই-এর তৃণমূল পর্যায়ের কর্মী ও সমর্থকরা ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছে।"
"এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, সম্ভবত এখনই দলটিকে একটি অত্যন্ত কঠোর বার্তা দেওয়ার এবং তারা যে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে সেই বিষয়টি তাদের জন্য আরও কঠিন করে তোলার সময় এসেছে।"
সরকার এর আগে যুক্তি দিয়েছিল, ইমরান খান কারাগারের নিয়ম লঙ্ঘন করে তার সাক্ষাৎগুলোকে রাজনৈতিক আলোচনার জন্য ব্যবহার করছিলেন।
জরুরি অবস্থা জারি প্রসঙ্গে তারার বলেছেন, "এর কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা বা উদ্দেশ্য ছিল না। তারা চাইলে তাদের পদযাত্রা বা মিছিল চালিয়ে যেত পারত।"
এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দুই পক্ষের মধ্যে যে আলোচনা হয়েছিল, সেটিকে তিনি আলোচনার চেষ্টার একটি সূচক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
কিন্তু অন্যরা এটিকে ইমরান খান এবং তার দলকে সীমিত করার আরেকটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
সাংবাদিক নূর বলেন, "সরকারের কাছে মতবিরোধ বা ভিন্নমতের জন্য সুযোগ দিন দিন কমে আসছে এবং তারা কোনো ধরনের সংঘাত থেকে আলোচনার মাধ্যমে বেরিয়ে আসতে চায় না।"
ইসলামাবাদভিত্তিক লেখক ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জাহিদ হুসেন, এই সিদ্ধান্তের পেছনে কারা রয়েছে সে বিষয়ে স্পষ্ট।
"ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি সামরিক প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকে গেছে," বলেন তিনি।
মি. শেখ মনে করেন, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী বেশ আত্মবিশ্বাস বোধ করছে, কারণ তাদের বিশ্বাস, হোয়াইট হাউসের সঙ্গে তাদের একটি ভালো সম্পর্ক রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান শান্তি আলোচনায় তাদের ভূমিকার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের গ্রহণযোগ্যতা আরো উজ্জ্বল হয়েছে।
তিনি বলেন, "মূলত মনোভাবটা হলো- এটাই সেই মুহূর্ত, চলো এটাকে কাজে লাগাই। এমন একটা ধারণা আছে যে, সব সুযোগ আমাদের হাতেই রয়েছে। আমরা আন্তর্জাতিকভাবে এই পরিস্থিতি সামলে নিতে পারব।"
তবে, পাকিস্তানের সামনে মোকাবিলা করার মতো অনেক বড় বড় সমস্যা রয়েছে। দেশটিতে জঙ্গিবাদ বাড়ছে।
‘গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স ২০২৬’, এ সন্ত্রাসবাদের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে পাকিস্তান এক নম্বর স্থানে ছিল।
দেশটি তার দুই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বিরোধে লিপ্ত। আফগান তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ এনে দেশটি বারবার আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালিয়েছে, যদিও তালেবান সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের চাপা সংঘাতকে পুনরায় উসকে দিতে সামান্য স্ফুলিঙ্গই যথেষ্ট।
এদিকে, হুথিদের বিরুদ্ধে সংঘাত দিনকে দিন বিপজ্জনক হয়ে ওঠায়, সৌদি আরবকে হামলা থেকে আত্মরক্ষায় সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে পাকিস্তান।
একটি সমস্যার সমাধান না করে এই জরুরি অবস্থা জারি আরো নতুন চ্যালেঞ্জের জন্ম দিতে পারে বলে অনেকে সতর্ক করেছেন।
এর ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আরো বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে কারণ ইসলামাবাদকে এখন এমন একটি প্রদেশের দায়ভার নিতে হবে, যার ওপর দোষ চাপানোর মতো কোনো রক্ষাকবচ অর্থাৎ প্রাদেশিক সরকার নেই।
কুগেলম্যান বলেন, "আমি বলব যে এটি আসলে হিতে বিপরীত হতে পারে। আপনি আগুন নিয়ে খেলছেন, কারণ এই পদক্ষেপটি যদি সেখানকার অনেকের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ আরো বাড়িয়ে দেয় তাহলে আপনি একটি খুব বড় সমস্যায় পড়বেন।"
ইসলামাবাদভিত্তিক লেখক ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জাহিদ হুসেন বলেন, "দেশ যে বহুবিধ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে, তা বিবেচনায় এটি একটি বেপরোয়া পদক্ষেপ।"
তিনি আশঙ্কা করছেন, পাকিস্তানজুড়ে এই ধরনের আরো ক্ষমতা ব্যবহার করা হতে পারে।
আরো সক্রিয় সেনা অভিযানের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ দমনের প্রচেষ্টার নিজস্ব বিপদও থাকতে পারে বলে যুক্তি দেন চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো ফারজানা শেখ।
তিনি বলেন, “যদি তারা এই অভিযানগুলো শুরু করতে যায়, তাহলে তাদের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের হতাহতের ঘটনা মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।”
তিনি আরো বলেন, যদি সেই হতাহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হয়, তবে তা সামরিক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে প্রশ্ন তুলতে পারে।
সামরিক অভ্যুত্থানের ইতিহাস থাকায় পাকিস্তানের অতীতে এমন উদাহরণ রয়েছে যেখানে প্রাদেশিক বা জাতীয়, যে কোনো পর্যায়ের নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রচেষ্টা তিক্ত পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
"এমন নয় যে পিএমএল-এন-এর (কেন্দ্রীয় সরকারে থাকা দল) দলের শীর্ষ নেতারা উপলব্ধি করেন না যে এই বিষয়গুলোর কিছু ভবিষ্যতে তাদের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে," বলেন সাংবাদিক ও ধারা ভাষ্যকার আরিফা নূর।
"একইভাবে আমি মনে করি, পিটিআইও কিছুটা হলেও বুঝতে পারছে যে, তারা বিক্ষোভ করে ইমরান খানকে বের করে আনতে পারবে না। আমার মনে হয়, আমরা যে জগাখিচুড়ির মধ্যে পড়েছি, তার সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক দিকটি হলো, আমরা সবকিছু জেনেবুঝেই এর মধ্যে জড়িয়ে পড়ছি। সকলেই বুঝতে পারছে, এটা একটা ট্রেন দুর্ঘটনা, কিন্তু কোনোভাবে এটাকে থামানো যাচ্ছে না।"