অত্যাধুনিক অস্ত্রেও কেন অরক্ষিত সৌদি আরব?
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি সৌদি আরব। প্রতিরক্ষা খাতে প্রতিবছর বিপুল অর্থ বিনিয়োগ, অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান সংগ্রহ এবং শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার পরও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা পুরোপুরি ঠেকাতে পারছে না দেশটি। বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার, পাইপলাইনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এখনো হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এত বিপুল সামরিক ব্যয়ের পরও কেন সৌদি আরব তার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখতে পারছে না?
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এই পরিস্থিতির পেছনের কারণগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
স্টকহোমভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) হিসাব অনুযায়ী, গত বছর সৌদি আরব প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ৮ হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে। এই বিপুল ব্যয়ের কারণে সামরিক খাতে বিশ্বের সর্বোচ্চ ব্যয়কারী ১০টি দেশের তালিকায় রয়েছে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছে সৌদি আরব। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন প্যাট্রিয়ট ও থাড আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য থেকেও উন্নত অস্ত্র কিনেছে রিয়াদ।

কিন্তু অত্যাধুনিক অস্ত্রের উপস্থিতি থাকলেই যে প্রতিটি হামলা প্রতিহত করা সম্ভব, সৌদি আরবের অভিজ্ঞতা তার বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে। গত এক সপ্তাহে রাজধানী রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা দেশটির প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা আবারও সামনে এনেছে।

এর একটি বড় কারণ সৌদি আরবের বিশাল ভূখণ্ড এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার বিস্তৃতি। যুক্তরাষ্ট্রের আয়তনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকাজুড়ে বিস্তৃত দেশটিকে একসঙ্গে একাধিক দিক থেকে আসা হুমকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। পূর্ব দিকে ইরান, উত্তর দিকে ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং দক্ষিণে ইয়েমেনভিত্তিক হুথিরা সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। চলতি বছরের সবচেয়ে তীব্র আঞ্চলিক সংঘাতের সময় ইরান সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে প্রায় এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছিল।
ইরাকের ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনেও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে, ইয়েমেনের পাহাড়ি এলাকায় গোপন ঘাঁটি ও চলমান উৎক্ষেপণব্যবস্থা ব্যবহার করে হুথিরা দক্ষিণ দিক থেকে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তর নিয়ে কাজ করা ওয়েবসাইট ভিশন২০৩০ ডট এআইয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশটিকে সুরক্ষিত রাখার অর্থ কেবল রাজধানী রিয়াদ বা কোনো একটি তেল শোধনাগার রক্ষা করা নয়। বরং বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো, বিমানবন্দর ও অন্যান্য সম্পদকে একই সঙ্গে সুরক্ষা দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে আকাশপথে আসা হুমকি শনাক্ত করতে হয়, কোন লক্ষ্যবস্তুতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে তা নির্ধারণ করতে হয় এবং প্রয়োজনে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করতে হয়। এতগুলো কাজ একসঙ্গে সম্পন্ন করা অত্যন্ত জটিল।
সৌদি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ধ্বংস করতে সক্ষম হলেও সব হামলা প্রতিহত করা যাচ্ছে না। দেশটির এক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, বিপুলসংখ্যক স্থাপনা ঝুঁকিতে থাকায় কোথায় কতটা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম মোতায়েন করা হবে, তা নির্ধারণ করতে গিয়ে কর্তৃপক্ষকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
হুথিদের জটিল কৌশল ও বাইরের সহায়তা
হুথিদের হামলার কৌশল সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার ড্রোন একসঙ্গে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ভেদ করার চেষ্টা করছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ব্যবহৃত হামলাপদ্ধতির সঙ্গে এই কৌশলের মিল রয়েছে। ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সাধারণত তুলনামূলক নিচু দিয়ে উড়তে পারে, ফলে রাডারে এগুলো শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে হুথিরা নতুন ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের দাবি করছে, যেগুলো উড্ডয়নের সময় দিক পরিবর্তন করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হুথিদের ব্যবহৃত সর্বশেষ ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর নকশায় ইরানি অস্ত্রের সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে। এগুলো দ্রুতগতিসম্পন্ন এবং নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য তৈরি। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর দাবি, হুথিরা ইরানি আকাশ প্রতিরক্ষার প্রযুক্তিও পরিবর্তন ও উন্নত করেছে।
বেসামরিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ভাবমূর্তি নিয়ে উদ্বেগ
হুতিদের সঙ্গে সংঘাত বাড়লেও সৌদি আরব স্বাভাবিক পরিস্থিতির ভাবমূর্তি ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। তবে রিয়াদে বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার আগের সপ্তাহে দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষের মোবাইল ফোনে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সতর্কবার্তা পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছিল। রিয়াদে বসবাসকারী এক প্রবাসী জানান, চলতি সপ্তাহে তার সন্তানেরা বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করছে। বিমানবন্দরে হামলার আগের দিনগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা না পাওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ ছিলেন।
নিরাপত্তার পাশাপাশি সৌদি আরবের সামনে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিমানবন্দরে হামলায় এক ডজনের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার পর হুথিদের সঙ্গে সমঝোতা করা রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, পাল্টা বিমান হামলা আরও জোরদার করলে হুথিরা নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাতে পারে। এই পরিস্থিতি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরিকল্পনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তার লক্ষ্য সৌদি আরবকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও পর্যটনের অন্যতম প্রধান গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু ডেটা সেন্টার, পানি শোধনাগার, বিমানবন্দর এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হামলার ঝুঁকিতে থাকলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
স্থলযুদ্ধে হুথিদের পরাজিত করা কঠিন
শুধু বিমান হামলা চালিয়ে হুথিদের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা কঠিন বলে মনে করছেন বিশ্লেషকেরা। একইভাবে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি বাহিনীর স্থল অভিযানেও তাদের পরাজিত করার সম্ভাবনা সীমিত। হুথিরা দীর্ঘদিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, সংগঠিত এবং ইয়েমেনের দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে ভালোভাবে জানে। তিন লাখ ৫০ হাজার সশস্ত্র সদস্য নিয়ে হুথিরা এখনো শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তা ও অস্ত্রের সংকট
হুথিদের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা জোরদার করতে সৌদি আরব আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। আঞ্চলিক মিত্ররা প্রতিরক্ষামূলক সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। সৌদি আরবকে সহায়তা করতে পাকিস্তান হাজার হাজার সেনা পাঠিয়েছে এবং মিসরও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে আরও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সংগ্রহের উদ্যোগ নিতে পারে রিয়াদ। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান কৌশলগত অস্ত্রের মজুত কমিয়ে দিয়েছে এবং দ্রুত পুনরায় অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে শিল্প খাতের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে।
সব মিলিয়ে, হুথিদের মোকাবিলা এখন সৌদি আরবের জন্য শুধু সামরিক প্রতিরক্ষার লড়াই নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখারও পরীক্ষা। সামরিক শক্তির পাশাপাশি কার্যকর কূটনীতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তা নির্ধারণ করবে সংঘাতের পরবর্তী গতিপথ।