জানা গেছে, সাদিক অ্যাগ্রো বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ব্রাহমা জাতের ১৮টি গরু আমদানি করেছিল। বিমানবন্দরে সেই গরু জব্দ করে কাস্টমস বিভাগ। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের যোগসাজশে কৌশলে সেই গরু বাগিয়ে নেন সাদিক অ্যাগ্রো।
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২০২১ সালের ৫ জুলাই ১৮টি ব্রাহমা জাতের গরু জব্দ করে ঢাকা কাস্টম হাউস। পরে সেগুলো প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হেফাজতে সাভারের কেন্দ্রীয় গো প্রজনন ও দুগ্ধ খামারে রাখা হয়। পরে ঢাকা কাস্টম সাদিক অ্যাগ্রোর ১৮টি গরু জব্দ করার পর তারা উচ্চ আদালতে রিট করেছিল। তবে উচ্চ আদালতের রায় তাদের বিপক্ষে যায়। তার পর থেকে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে সাভারেই গরুগুলো ছিল।
এর সূত্র ধরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাস্টমসে মঙ্গলবার (২ জুলাই) অভিযান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
.png)
প্রাণিসম্পদ অধিদফতর সূত্র বলছে, গত পবিত্র রমজানে অধিদফতরের উদ্যোগে ঢাকায় কিছুটা কম দামে দুধ, ডিম ও মাংস বিক্রি করা হয়। সেখানে এবার মাংস সরবরাহ করেছে ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশন। মোট চাহিদার অর্ধেক মাংসবাবদ কম দামে (জীবন্ত অবস্থায় ভ্যাটসহ কেজিপ্রতি ২৯৩ টাকা) ৪৮৮টি গরু সরবরাহ করা হয়েছিল প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের বিভিন্ন খামার থেকে। এর মধ্যে ১৫টি ব্রাহমা গরু ছিল। বাকি তিনটি মারা গেছে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ রেয়াজুল হক গণমাধ্যমে বলেন, গরুগুলো বিক্রির সব প্রক্রিয়া আগের মহাপরিচালক করে গেছেন।
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরে এর আগে মহাপরিচালক ছিলেন মো. এমদাদুল হক তালুকদার। তিনি গত ২৭ ফেব্রুয়ারি অবসরে যান। বর্তমান মহাপরিচালকের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভালো বলতে পারবেন। তার কাছে নথিপত্র নেই। নথিপত্র না দেখে তিনি কিছু বলতে পারবেন না।
সাদিক অ্যাগ্রোর মালিক ইমরান রমজান মাসে মাংস বিক্রির নামে গরুগুলো কিনলেও তিনি তা করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, ব্রাহমা গরু রেখে দিয়ে তার বদলে অন্য গরুর মাংস সরবরাহ করেন ইমরান। পরে পবিত্র ঈদুল আজহার বাজারে বিপুল দামে ব্রাহমা গরুগুলো বিক্রি করেন।
ইমরান হোসেন বলেন, প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের কাছ থেকে কিনলেও শর্তে এমন কিছু উল্লেখ ছিল না যে ব্রাহমা গরুগুলো মাংস হিসেবেই বিক্রি করতে হবে।
ঢাকা কাস্টম সাদিক অ্যাগ্রোর ১৮টি গরু জব্দ করার পর তারা উচ্চ আদালতে রিট করেছিল। তবে উচ্চ আদালতের রায় তাদের বিপক্ষে যায়। তার পর থেকে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে সাভারেই গরুগুলো ছিল।
রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের পুরাতন বাণিজ্য মেলা মাঠে গত রমজানের পরপরই (১৮ ও ১৯ এপ্রিল) গবাদিপশুর মেলার আয়োজন করা হয়। সেখানে সাদিক অ্যাগ্রো ১ হাজার ৩০০ কেজি ওজনের ব্রাহমা জাতের একটি গরু এক কোটি টাকা দাম হাঁকিয়ে আলোচনায় আসে। ঈদুল আজহার আগে ব্রাহমা গরু বিপুল দামে বিক্রির কথা বিভিন্ন গণমাধ্যম ও ইউটিউবারের কাছে বলেছেন ইমরান।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, উচ্চবংশীয় বলে দাবি করে তিনটি ব্রাহমা জাতের গরু ২ কোটি ৬০ লাখ টাকায় বিক্রির কথা জানান ইমরান। একটির ওজন বলেন ১ হাজার ৪০০ কেজি। আরেকটির ওজন ১ হাজার ৩০০ কেজি। তৃতীয়টির ওজন জানা যায়নি। তিনটির মোট ওজন সাড়ে তিন হাজার কেজি ধরে হিসাব করে দেখা যায় যে জীবন্ত অবস্থায় কেজিপ্রতি দাম হয় ৭ হাজার ৪২৯ টাকা। অথচ ইমরান কিনেছেন কেজিপ্রতি ২৯৩ টাকায়।
সাদিক অ্যাগ্রোর ব্রাহমা গরু রেখে দেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ রেয়াজুল হক বলেন, তার (ইমরান হোসেন) কাছে মাংস চেয়েছি যে এত মণ দেবেন। আমরা তা বুঝে নিয়েছি। কোন গরুর মাংস তিনি দিয়েছেন, তা মেলানো সম্ভব হয়নি।
অবশ্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গতকাল সোমবার প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের কেন্দ্রীয় গো প্রজনন ও দুগ্ধ খামারে অভিযান পরিচালনা করেছে। সেখান থেকে দুদকের দলটি সাভারের বিরুলিয়ায় সাদিক অ্যাগ্রোর খামারেও যায়।
এর সূত্র ধরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাস্টমসে অভিযান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
ব্রাহমা জাতের গরুর মাংস বেশি হয়। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, জাতটির উৎপত্তি ভারতে। পরে যুক্তরাষ্ট্রে আরো দুই থেকে তিনটি জাতের সংমিশ্রণে এটিকে উন্নত করা হয়। দুই থেকে আড়াই বছরের দেশি গরুর ওজন যেখানে ২৫০ থেকে ৩৫০ কেজি হয়, সেখানে ব্রাহমা জাতের গরুর ওজন হয় ৮০০ থেকে ১ হাজার কেজি।
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলেন, এই গরু বাংলাদেশে পালনের অনুমতি দেওয়া হলে দুধ বেশি দেওয়া গরুর পালন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই ব্রাহমা নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছে।
সাদিক অ্যাগ্রোর মালিক মোহাম্মদ ইমরান হোসেন গবাদিপশুর খামার মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএফএ) সভাপতি। অনুমতি না থাকা ও খালের জায়গা দখল করায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) গত বৃহস্পতি ও শনিবার অভিযান চালিয়ে মোহাম্মদপুরে সাদিক অ্যাগ্রোর খামার ভেঙে দেয়।
প্রাণিসম্পদ খাতে সাদিক অ্যাগ্রো খুবই প্রভাবশালী। শুধু ব্রাহমা গরু নয়, এ খাতের প্রকল্প, অনুদানসহ নানা বিষয়ে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। দুদকের উচিত পুরো বিষয়টি তদন্ত করা।