ঢাকা,  বুধবার   ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ জাতীয় ]

আবারও মন্ত্রিসভায় রদবদলের গুঞ্জন

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৮:৩২, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আবারও মন্ত্রিসভায় রদবদলের গুঞ্জন
ছবি: সংগৃহীত

প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি বাড়ানো, মন্ত্রীদের কাজের মূল্যায়ন এবং বিভিন্ন দপ্তরে দক্ষতা বাড়াতে মন্ত্রিসভায় আবারও বড় ধরনের রদবদল ও সম্প্রসারণের আলোচনা চলছে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, সেপ্টেম্বরেই বা আগামী মাসের শুরুতে এ পরিবর্তন আসতে পারে।

বিএনপি ও সরকারের জনপ্রশাসন-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সরকারের কাজের পরিধি ও বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় মন্ত্রিসভার আকার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। তবে কবে এবং কীভাবে এ পরিবর্তন হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘পরিবর্তনের আলোচনা সত্যি। তবে চূড়ান্ত তারিখ বা সময় একমাত্র প্রধানমন্ত্রী বলতে পারবেন।’

Advertisement

সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় এর আগে মন্ত্রিসভায় প্রাথমিকভাবে রদবদল করা হয়েছিল। ওই পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। সরকারের কেউ কেউ এটিকে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ছয় মাসের কর্মমূল্যায়নের প্রাথমিক ফল হিসেবে দেখেছিলেন। আবার অনেকে এটিকে শূন্য পদ পূরণ, দপ্তর পুনর্বণ্টন ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের অংশ হিসেবে দেখেন।

সেই রদবদলের পরও মন্ত্রিসভার কাঠামো ও কাজের দক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে পূর্ণ মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পাশাপাশি একই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাও দায়িত্বে আছেন। আবার তুলনামূলক ছোট কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী রাখার যৌক্তিকতা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২১২টি আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। নির্বাচনের পাঁচ দিন পর ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়। শুরুতে ৪৭ সদস্যের মন্ত্রিসভায় ২৪ জন মন্ত্রী ও ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। গত ১৬ আগস্ট সরকার ছয় মাস পূর্ণ করেছে।

বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা ৫১ জন। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া পূর্ণ মন্ত্রী ২৬ জন এবং প্রতিমন্ত্রী ২৪ জন। এর বাইরে মন্ত্রিসভার বাইরে প্রধানমন্ত্রীর ১১ জন উপদেষ্টা আছেন। তাদের মধ্যে ছয়জন মন্ত্রী এবং পাঁচজন প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করছেন।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টাদের মধ্যে আছেন মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ও ইসমাইল জবিউল্লাহ। প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টাদের মধ্যে হুমায়ুন কবির এতদিন পররাষ্ট্র, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন।

গত ২১ আগস্ট হুমায়ুন কবির প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ায় তার দায়িত্বে পরিবর্তন এসেছে। তবে অন্য দুটি মন্ত্রণালয়ে তিনি উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ঘোষণা আসেনি। এ ছাড়া মন্ত্রী পদমর্যাদায় নতুন করে রাজনৈতিক উপদেষ্টা হয়েছেন জহির উদ্দিন স্বপন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি সূত্র বলছে, রাজপথের ত্যাগী এবং দীর্ঘদিন ধরে মূল্যায়ন-বঞ্চিত সিনিয়র নেতাদের মন্ত্রিসভায় এনে সরকারের কার্যকারিতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ নেতাদের পূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এবং অপেক্ষাকৃত নবীনদের প্রতিমন্ত্রী করার চিন্তা রয়েছে।

বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র, কৃষি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে কাজের চাপ বেশি থাকায় নতুন প্রতিমন্ত্রী যুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

সম্ভাব্য তালিকায় আঞ্চলিক ভারসাম্য ও বিভিন্ন কোটা বিবেচনার পাশাপাশি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মধ্য থেকে সংসদ সদস্য কিংবা টেকনোক্র্যাট হিসেবে নতুন মুখ যুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে আগের সরকারগুলোর সময়ে রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার এবং দলের দুঃসময়ে সক্রিয় থাকা নেতাদের কয়েকজনের নাম আলোচনায় রয়েছে।

এ তালিকায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সাবেক বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলের নাম বেশি আলোচিত হচ্ছে। এ ছাড়া দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী এবং নবনিযুক্ত স্থায়ী কমিটির সদস্য আমান উল্লাহ আমানের নামও আছে।

অন্যদের মধ্যে সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, এ বি এম আশরাফ উদ্দীন নিজান, বিএনপির প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক এ বি এম মোশাররফ হোসেন, সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদা হাবিবা, সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ এবং মো. আবুল কালাম (চৈতি কালাম) প্রমুখের নামও আলোচনায় রয়েছে।

সম্ভাব্য রদবদলের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ঘিরে আলোচনা বেশি। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষামন্ত্রী তার নিজ এলাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা দলীয় নেতা-কর্মী এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। তার আগের ব্যবহৃত ফোন নম্বরেও এখন ব্যক্তিগত সহকারী কল ধরছেন বলে নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।

এ ছাড়া দুর্যোগের সময় পরীক্ষা নেওয়া, বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে বলে সূত্রের দাবি। এসব কারণে প্রধানমন্ত্রীও বিব্রত বলে জানা গেছে। এ অবস্থায় বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলনকে অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। তার জায়গায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহাদী আমিন অথবা শিক্ষক নেতা ও সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়াকে দায়িত্ব দেওয়ার আলোচনা রয়েছে। শিক্ষা খাতের সংস্কারে তরুণ ও শিক্ষিত নেতৃত্বকে সামনে আনার লক্ষ্যেই এমন চিন্তা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়েও পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। বিভিন্ন সেমিনারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের বক্তব্য ও মন্তব্য নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে সূত্রের দাবি। ঢাকা মেডিকেল কলেজের একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী তাকে মূল বিষয়ের বাইরে কথা না বলার জন্য সতর্ক করেছিলেন বলেও জানা গেছে। এ ছাড়া নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় ‘আদ-দীন’ হাসপাতালের লাইসেন্স স্থগিত এবং পরে সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়।

স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়েও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। বিগত সরকারের সময়ে আলোচিত দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের ‘মিঠু’ জামিনে বেরিয়ে আবার সক্রিয় হয়েছেন এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কিডনি হাসপাতালের ডায়ালাইসিস মেশিন কেনার ক্ষেত্রেও একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পরিচালক ডা. রাশেদ আনোয়ারকে চাপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

এ ছাড়া ইডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম আশরাফুজ্জামানকে মন্ত্রী তার বাসায় ডেকে ছোট ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে ‘মিঠু চক্রের’ সঙ্গে কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে ওই কর্মকর্তা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এসব পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ে সরিয়ে দিয়ে বর্তমান স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিতকে পূর্ণ মন্ত্রী করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও পরিমিত বক্তব্যের কারণে তাকে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে কাজের গতি বাড়াতে এক মন্ত্রীর অধীনে থাকা একাধিক দপ্তরের দায়িত্ব কমানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে। বর্তমানে তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা একজন পূর্ণ মন্ত্রীর কাছ থেকে একটি দপ্তর সরিয়ে সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসকে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সামগ্রিকভাবে তিনজন মন্ত্রীর দায়িত্ব কমানো এবং একজন প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর পরিবর্তনের গুঞ্জনও রয়েছে।

এর মধ্যে রাজধানীর সার্কিট হাউস সড়কে উল্টোপথে গাড়ি চালানোর অভিযোগে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের গাড়ির বিরুদ্ধে ট্রাফিক পুলিশ মামলা করেছে। দুই দিন আগে ঘটে যাওয়া ওই ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষুব্ধ হয়েছেন বলে জানা গেছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাজেও আশানুরূপ অগ্রগতি না থাকায় সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ফলে বর্তমান কৃষিমন্ত্রী হাজি আমিনুর রশীদ ইয়াসিনের দপ্তর পরিবর্তন বা রদবদল হতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।

বিএনপি ও সরকারের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কারা মন্ত্রিসভায় আসবেন বা বাদ পড়বেন, এটি সম্পূর্ণ প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার। তিনি সবার কাজ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন, পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট না হলে পরিবর্তন স্বাভাবিক।’

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘পরিবর্তন হতে পারে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী ভালো বলতে পারবেন। যদি পরিবর্তন হয়, তবে দেশ ও জনগণের স্বার্থে কাকে যুক্ত করা যায়, তা তিনিই ভালো বোঝেন।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই।’

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘পুনর্গঠন বা রদবদল দল ও সরকারের একটি রুটিন কাজ। প্রয়োজনের তাগিদেই এটি করা হয়। সরকারপ্রধান প্রয়োজন অনুভব করলে দায়িত্বপ্রাপ্তদের কার্যসম্পাদন মূল্যায়ন করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।’

সূত্র: এশিয়া পোস্ট

ডেইলি-বাংলাদেশ/কে কে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!