বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবিলা এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধিতে আনা জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের ওপর দেওয়া বক্তব্যে এসব তথ্য জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। সংরক্ষিত আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খান দেশে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়িয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে নোটিশটি আনেন।
.png)
প্রতিমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ২৪ থেকে ২৫ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। এই বাড়তি চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, ২০৩০ সাল পর্যন্ত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ খাতে বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট, ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং বায়ু, বর্জ্য, পানি, ভাসমান সৌর ও এগ্রিভোলটাইকসহ অন্যান্য প্রযুক্তি থেকে ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও স্ট্রাকচারসহ প্রয়োজনীয় পণ্যে কর সুবিধা দিয়ে মাত্র ১ শতাংশ কর নির্ধারণ করা হয়েছে।
ক্ষুদ্র আমদানিকারকদের এ খাতে যুক্ত করতে আগামী ছয় মাসের জন্য বিশেষ কর সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলেও জানান তিনি। প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকে ১৮০ দিন পর্যন্ত আমদানি করা যন্ত্রপাতিতে ১ শতাংশের অতিরিক্ত কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর, আগাম কর ও প্রগ্রেসিভ আয়কর থেকে পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হবে।
আগামী ছয় মাসের মধ্যে যারা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ করবেন এবং নিজেদের চাহিদা পূরণের পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবেন, সরকার তাদের কাছ থেকে আকর্ষণীয় মূল্যে বিদ্যুৎ কিনবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। এ ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা ৫০ পয়সা।
তিনি আরও জানান, সরকারি সংস্থার মালিকানাধীন জমিতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নে ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প উন্নয়ন নির্দেশিকা-২০২৬’ এবং ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি অংশগ্রহণ বিধিমালা-২০২৫’ জারি করা হয়েছে।
এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা-২০২৫, নেট মিটারিং গাইডলাইন-২০২৫, জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি-২০২৫ এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবসায়িক মডেল চূড়ান্ত করা হয়েছে।
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় পর্যায়ে কয়লাভিত্তিক আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগের কথা জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও স্থানীয় মানুষের আবেগ বিবেচনায় সেখানে কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
এর অংশ হিসেবে রামপালে ৪৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একইভাবে মাতারবাড়ী কোল পাওয়ার প্রকল্পের অ্যাশ পয়েন্টের জন্য নির্ধারিত জায়গায় ৭০ মেগাওয়াটের আরেকটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর ফেনীতে বিভিন্ন সামাজিক সুবিধার কার্ড বিতরণ কর্মসূচি রয়েছে। এ উপলক্ষে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ২৩টি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণ করেছে। বিদ্যুৎ বিভাগও এতে যুক্ত হয়েছে। ওই দিন প্রকল্পগুলোর উদ্বোধন করা হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ গ্রহণ না করে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা বলেছেন। সেই লক্ষ্যেই সংসদ ভবনেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণের ফলে একদিকে জ্বালানি আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমবে, অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ বাড়বে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
তরুণ ও যুবকদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সৌরবিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সম্পূরক প্রশ্নে হেলেন জেরিন খান রুফটপ সোলারের জন্য আলাদা মানচিত্র প্রকাশ এবং বড় নদীর জলরাশির ওপর সৌর প্যানেল স্থাপনের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চান।
জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য পিপিপি পদ্ধতিতে সরকার জমি দেবে। বিনিয়োগকারীদের নিজস্ব জমি কিনতে হলে প্রকল্পের বিনিয়োগ ও উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম উভয়ই বাড়বে।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরকে তাদের পতিত জমি এবং আগামী ২০ থেকে ২৫ বছরেও ব্যবহারের সম্ভাবনা কম—এমন জমির তালিকা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। সব মন্ত্রণালয় মিলে প্রায় ৬০ হাজার একর জমির তথ্য দিয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ের পর এর মধ্যে প্রায় ৩০০ একর জমি চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব জমি ইনভেস্ট বাংলাদেশের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দ দেওয়া হবে।
সরকার জমি দেবে এবং বিনিয়োগকারীরা সেখানে প্রযুক্তি ও অর্থ বিনিয়োগ করে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবেন। জমি নির্বাচনের সময় বিদ্যুৎ বিতরণ ও সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
রুফটপ সোলারের জন্য আলাদা কোনো মানচিত্র প্রকাশের উদ্যোগ আপাতত নেই জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সব সরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে এবং আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া চলছে।