গুমকে সুনির্দিষ্ট অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান এবং মানবাধিকার সুরক্ষা জোরদারের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হয়েছে।
এর মধ্যে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত দুটি বিল রয়েছে। পাশাপাশি সম্পত্তি হস্তান্তরের পর দাতার আজীবন ভোগের অধিকার সংরক্ষণের বিধান রেখে আরেকটি বিল পাস করা হয়েছে।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে কণ্ঠভোটে বিল তিনটি পাস হয়।
পাস হওয়া আইনগুলো হলো—জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল-২০২৬, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল-২০২৬ এবং সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধনী) বিল-২০২৬।
নতুন কাঠামোয় মানবাধিকার কমিশন
২০০৯ সালের আইন রহিত করে নতুন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল-২০২৬ পাস করা হয়েছে। এর মাধ্যমে স্বাধীন ও কার্যকর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নতুন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন কমিশনে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার থাকবেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত একজন নারী এবং একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি রাখার বিধান রয়েছে।
কমিশনকে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়ার পাশাপাশি জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী সনদের আলোকে জাতীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ইউনিট গঠনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
তবে বিলটি পাসের আগে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এর কিছু বিধানের সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, বিলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় দ্বিমুখী নীতি রাখা হয়েছে। সাধারণ নাগরিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করলে কমিশন সরাসরি তদন্ত করতে পারলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য জড়িত থাকলে আগে সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে নোটিশ দিয়ে জবাব চাওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমানও বিলটির সমালোচনা করেন। পরে বিরোধী দলের সদস্যরা ওয়াকআউট করেন।
গুমে সর্বোচ্চ শাস্তি
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল-২০২৬-এ গুমকে আমলযোগ্য, অজামিনযোগ্য ও আপস-অযোগ্য অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
বিলে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের মাধ্যমে কাউকে গ্রেপ্তার, আটক বা অপহরণের পর তার অবস্থান অস্বীকার বা গোপন করা হলে তা গুম হিসেবে বিবেচিত হবে।
গুমের সাধারণ শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তবে ভুক্তভোগী মারা গেলে কিংবা পাঁচ বছরের বেশি সময় নিখোঁজ থাকলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানা করা যাবে।
এ ছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তির পুনর্বাসন, আইনি সহায়তা, ক্ষতিপূরণ তহবিল এবং ডিজিটাল সাক্ষ্য গ্রহণের বিধান রাখা হয়েছে। তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার কথা বলা হয়েছে।
সম্পত্তি হস্তান্তরে আজীবন ভোগের অধিকার
সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধনী) বিল-২০২৬-এর মাধ্যমে ১৮৮২ সালের আইনে ‘আজীবন ভোগস্বত্ব সংরক্ষিত দান’ ধারণা যুক্ত করা হয়েছে।
এর ফলে মা-বাবা, দাদা-দাদি, রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয় বা জীবনসঙ্গীর নামে সম্পত্তি হস্তান্তর করলেও দাতা আমৃত্যু ওই সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। বিধানটি সব ধর্মের নাগরিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
বিলটি পাসের সময় বিরোধী দলের সদস্যরা এর কয়েকটি বিধান কোরআন-সুন্নাহর পরিপন্থী দাবি করে জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবটি নাকচ হলে তারা সাময়িক ওয়াকআউট করেন।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই সংশোধনী সাধারণ দান বা মুসলিম আইনের হেবা ব্যবস্থায় কোনো প্রভাব ফেলবে না।
.png)