ঢাকা,  রোববার   ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩

[ জাতীয় ]

হামের প্রাদুর্ভাবে বিপর্যস্ত দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২০:০৩, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
হামের প্রাদুর্ভাবে বিপর্যস্ত দেশ
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। টিকাদানের হার কমে যাওয়া, লাখ লাখ শিশুর টিকাদানের তথ্যের ঘাটতি এবং প্রত্যন্ত এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীদের পৌঁছাতে না পারার কারণে সংক্রামক এ রোগ নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে দেশের স্বাস্থ্য খাত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে দুই লাখ দুই হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ২২ হাজার। এ সময়ে হামের কারণে বা সন্দেহভাজন হামে ১ হাজার ১৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। মৃতদের ৯৪ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের কম।

রয়টার্সের ১৭ অক্টোবর প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আক্রান্তের সংখ্যা বিবেচনায় বাংলাদেশ চলতি বছর বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাবের মুখে পড়েছে। বাংলাদেশের এ অভিজ্ঞতা অন্য দেশগুলোর জন্যও সতর্কবার্তা—নিয়মিত টিকাদানে সামান্য ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে বড় স্বাস্থ্যসংকটে রূপ নিতে পারে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে জনসংখ্যার অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে প্রয়োজনীয় দুই ডোজ টিকার আওতায় আনতে হয়। বাংলাদেশ কয়েক বছর আগে এ লক্ষ্যের কাছাকাছি থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে টিকাদানের হার কমেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে হামের প্রথম ডোজের টিকাদানের হার ছিল ৯৬ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের হার ৯৩ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫ সালে তা নেমে যথাক্রমে ৯০ ও ৮৬ শতাংশে দাঁড়ায়। ফলে রোগটির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা বেড়েছে। 

২০২৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মবিরতি, টিকা সংগ্রহে বিলম্ব এবং নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্নের বিষয়গুলোও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পাশাপাশি ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টিকাদানের সরকারি তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ। কিছু প্রাথমিক হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়, যা হিসাব বা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ত্রুটির ইঙ্গিত দেয়।

প্রাদুর্ভাব বাড়ার পর সরকার এপ্রিল ও মে মাসে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার কথা জানানো হলেও পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, অনেক শিশু এ কর্মসূচির বাইরে থেকে গেছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই বয়সী শিশুদের নিয়ে পরিচালিত আরেকটি স্বাস্থ্য কর্মসূচির তালিকায় আগের হাম প্রতিরোধী কর্মসূচির তুলনায় প্রায় ৪০ লাখ বেশি শিশুর তথ্য পাওয়া যায়। এতে আগের কর্মসূচিতে কত শিশু বাদ পড়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। জরুরি কর্মসূচি শুরুর আগে প্রস্তুতি যাচাইয়ের জন্য সাধারণত চার দফা পরীক্ষা করা হলেও সময়ের অভাবে এবার মাত্র এক দফা যাচাই করা হয়েছিল বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এসব পরীক্ষায় টিকা সংরক্ষণের ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং প্রকৃত উপকারভোগীর সংখ্যা যাচাই করা হয়।

ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে প্রায় ৪০ শতাংশ শিশুর জন্মনিবন্ধন নেই। ফলে টিকার বাইরে থাকা শিশুদের শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীর পদ শূন্য থাকার সমস্যা যুক্ত হয়েছে। প্রতিবেদনে সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পদ খালি রয়েছে। 

আগের কর্মসূচিতে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনতে গত ২৬ সেপ্টেম্বর দেশজুড়ে নতুন হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। ৩৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আগে বাদ পড়া ২৪ লাখ শিশু এবং নতুন করে ছয় মাস বয়স পূর্ণ করা প্রায় ১০ লাখ শিশু রয়েছে। কর্মসূচিটি ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলার কথা। 

এদিকে, পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদেরও টিকাদানের আওতায় আনার বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এ বয়সী শিশুরাও মোট আক্রান্তের উল্লেখযোগ্য অংশ। ছয় মাসের কম বয়সী কিছু শিশুর ক্ষেত্রে প্রত্যাশার তুলনায় রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দ্রুত কমে যাওয়ার কারণ নিয়েও গবেষণা চলছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!