ঢাকা,  রোববার   ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩

[ জাতীয় ]

মাতারবাড়ীতে ৭০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:২৮, ১ নভেম্বর ২০২৬
মাতারবাড়ীতে ৭০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ
সংগৃহীত ছবি

কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে অব্যবহৃত জমিতে ৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রকল্পটি ২০২৮ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০৪ কোটি ৯৭ লাখ ৬২ হাজার টাকা।

কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিপিজিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নজমুল হক জানান, প্রস্তাবিত প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) বিবেচনার জন্য ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

তিনি বলেন, মাতারবাড়ীর ২ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন আল্ট্রা সুপারক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সীমানার মধ্যে থাকা অব্যবহৃত ১৭১ একর জমিতে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপন করা হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভার জন্য প্রস্তুত করা খসড়া ডিপিপি অনুযায়ী, প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৪২ কোটি ৮৭ লাখ ৬ হাজার টাকা, প্রকল্প ঋণ ৫৩২ কোটি ৩৯ লাখ ১২ হাজার টাকা এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ২৯ কোটি ৭১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা।

পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে প্রকল্পটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি) বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সুবিধা কাঠামোর আওতায় প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করবে। এ কাঠামোর অধীনে ৩৫ কোটি ইউরো ঋণ এবং ৪ কোটি ৫০ লাখ ইউরো অনুদান সহায়তা রয়েছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ও কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়তা করবে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা ও টেকসই বিদ্যুৎব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।

প্রকল্পের বিবরণ অনুযায়ী, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছাই সংরক্ষণের জন্য শুরুতে প্রায় ৬৩০ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে মাত্র ১০৫ একর জমিতে ছাইয়ের পুকুর নির্মাণ করা হয়েছে। বাকি ৫২৫ একর জমি অব্যবহৃত রয়েছে। এ জমির একটি অংশে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপন করা হবে। ফলে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না।

এ ছাড়া ছাইয়ের পুকুরের চারপাশে বিদ্যমান ১৪ মিটার উঁচু বাঁধ থাকায় নতুন করে সুরক্ষা বাঁধ নির্মাণেরও প্রয়োজন হবে না বলে প্রকল্পের বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় সৌর ফটোভোলটাইক (পিভি) মডিউল, ইনভার্টার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম স্থাপন করা হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নিকটবর্তী মাতারবাড়ী ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত করতে এক কিলোমিটার দীর্ঘ ১৩২ কেভি ওভারহেড সঞ্চালন লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

পাশাপাশি মাতারবাড়ী ও চকরিয়া ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্রের মধ্যে ১৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দ্বিতীয় সার্কিটের ওভারহেড কন্ডাক্টর স্থাপন করা হবে। মাতারবাড়ীতে তিনটি ও চকরিয়ায় একটি—মোট চারটি ১৩২ কেভি এয়ার ইনসুলেটেড সুইচগিয়ার (এআইএস) বে নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

প্রকল্প কর্তৃপক্ষের আশা, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে আমদানি করা সরঞ্জাম দ্রুত খালাস ও পরিবহন করা সম্ভব হবে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সম্পন্ন সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রাথমিকভাবে ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছিল। পরে প্রকল্পটির উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে ৭০ মেগাওয়াট করার সুপারিশ করা হয়।

পরিকল্পনা কমিশনের বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম প্রধান মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম জানান, প্রকল্পের খসড়া প্রস্তাব নিয়ে শিগগিরই প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হবে। তাঁর ভাষ্য, প্রকল্পটি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে।

প্রকল্পটি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৭ নম্বর লক্ষ্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ লক্ষ্যের উদ্দেশ্য সবার জন্য সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও আধুনিক জ্বালানির সুযোগ নিশ্চিত করা।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩২ হাজার ৬৮৮ মেগাওয়াট। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৯৩৪ দশমিক ৫৪ মেগাওয়াট, যা মোট সক্ষমতার ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ।

তবে প্রকল্পটি চূড়ান্ত করার আগে কয়েকটি বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। এর মধ্যে রয়েছে একই ধরনের চলমান ও সম্পন্ন প্রকল্পের সঙ্গে তুলনা করে প্রধান সরঞ্জামের প্রস্তাবিত মূল্য বিশ্লেষণ, অর্থায়ন কাঠামোর বিষয়ে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন নেওয়া এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন বাড়ানো।

কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি আর্থিকভাবে বাস্তবসম্মত মনে হলেও সিপিজিসিবিএল মোট ব্যয়ের মাত্র ৪ দশমিক ৯১ শতাংশ বা প্রায় ২৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা নিজস্ব অর্থায়নের প্রস্তাব করেছে।

এ ছাড়া পিইসি সভায় সৌর পিভি মডিউল ও ইনভার্টারের গুণগত মান এবং বাজারদর পর্যালোচনা করা হবে। যানবাহন, অফিস সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র কেনার জন্য ৩৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দের যৌক্তিকতা এবং মোটরসাইকেলের সংখ্যা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখের বিষয়টিও পরীক্ষা করা হবে।

পরিকল্পনা কমিশন বাস্তবায়নকারী সংস্থার কাছে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা এবং বিদ্যমান সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংস্থা ও অবস্থানভিত্তিক তথ্য দেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে।

বিদেশি অর্থায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) নতুন ও অননুমোদিত প্রকল্পের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!