ঢাকা,  রোববার   ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩

[ ফিচার ]

কাক কখন পিঁপড়ার কামড় খেতে যায় জানেন

মাহি আছহাব স্বপ্নীল
প্রকাশিত: ১০:৩৪, ১ নভেম্বর ২০২৬
কাক কখন পিঁপড়ার কামড় খেতে যায় জানেন
রাগান্বিত পিঁপড়ারা আত্মরক্ষার খাতিরে তাদের শরীর থেকে বিশেষ এক ধরণের প্রাকৃতিক অ্যাসিড নিঃসরণ করে।

প্রকৃতি বরাবরই আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দেয় তার অদ্ভুত সব নিয়ম দিয়ে। মানুষ আধুনিক ল্যাবরেটরিতে ওষুধ আবিষ্কার করার বহু বছর আগে থেকেই বন্য প্রাণীরা নিজেদের মতো করে প্রাকৃতিক চিকিৎসা খুঁজে নিয়েছে। 

এর মধ্যে অন্যতম একটি চমকপ্রদ আচরণ হলো পাখিদের 'অ্যান্টিং' বা পিঁপড়া দিয়ে শরীর ডলানোর ঘটনা। গবেষকদের ক্যামেরায় প্রায়ই ধরা পড়ে যে, কাক কিংবা অন্য কোনো পাখি হুট করেই কোনো পিঁপড়ার চাকে গিয়ে হাজির হয়। 

অ্যান্টিং নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহের অন্যতম কারণ হলো এর সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত উপকারিতা। দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হচ্ছে, পিঁপড়ার নিঃসৃত রাসায়নিক পাখির পালকে থাকা উকুন, মাইট ও অন্যান্য ক্ষতিকর পরজীবী নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। এ কারণে অ্যান্টিংকে অনেক সময় পাখিদের স্বাভাবিক আত্মপরিচর্যা কিংবা সম্ভাব্য স্ব-চিকিৎসার কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

কাকজাতীয় পাখিসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির মধ্যে এই আচরণ দেখা গেছে। পাখিরা কখনো ঠোঁট দিয়ে পিঁপড়া ধরে পালকের মধ্যে ঘষে, আবার কখনো পিঁপড়ার বাসায় গিয়ে তাদের নিজের শরীরে উঠে আসার সুযোগ দেয়।

এতে বিরক্ত ও উত্তেজিত পিঁপড়ারা আত্মরক্ষার জন্য কামড়ায় এবং কোনো কোনো প্রজাতির ক্ষেত্রে শরীর থেকে ফরমিক অ্যাসিড বা ফর্মিক অ্যাসিড ছুড়ে দেয়। পাখির পালকে এই রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়াই অ্যান্টিংয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

ফরমিক অ্যাসিড একটি জৈব অ্যাসিড। এর নাম এসেছে লাতিন শব্দ ‘ফর্মিকা’ থেকে, যার অর্থ পিঁপড়া। কিছু প্রজাতির পিঁপড়া এই অ্যাসিডকে আত্মরক্ষার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। তবে সব পিঁপড়া একইভাবে অ্যাসিড নিঃসরণ করে না। আবার পাখির শরীরে পিঁপড়ার কামড় মানেই যে অ্যাসিড প্রবেশ করছে, বিষয়টি এমনও নয়। অনেক ক্ষেত্রে পিঁপড়ারা পালকের ওপর রাসায়নিক ছড়িয়ে দেয়।

অসুস্থ কাক কেন নিজেই পিঁপড়ার কামড় খেতে যায়?
কখনো কখনো কাকেরা নিজ ইচ্ছায় পিঁপড়ার বাসায় যায় ও পিঁপড়ার কামড় খায়। কাকেরা এমন কেন করে জানেন? কাকেরা সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণীদের মধ্যে একটি, যার বুদ্ধির তুলনা সাত বছরের বাচ্চার সাথে করা হয়ে থাকে। 

এছাড়া কাকেরা বিভিন্ন রকম পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারে কখনো কখনো তাদের অন্য প্রাণীদের সাহায্য করতেও দেখা গেছে কিন্তু এই কাকই পিঁপড়ার বাসায় গিয়ে পিঁপড়ার কামড় কেন খায় আর সেটাও নিজের ইচ্ছাতে চলুন জেনে নেওয়া যাক।

কাকেরা প্রথমে পিঁপড়ের বাসায় গিয়ে তাদের বিরক্ত করতে থাকে যেন পিঁপড়েরা বাধ্য হয়ে তাকে কামড়াতে থাকে আর তারপর পিপড়ারা কাকের গায়ে ফরমিক অ্যাসিড স্প্রের মত করে ছাড়ে আর এটাই হলো কাকদের কাছে ঔষুধ কারণ কাকেদের শরীরে নানা রকম প্যারাসাইট হয় আর এই প্যারাসাইট থেকে মুক্তির জন্য পিঁপড়াদের ছাড়া এই ফরমিক এসিডের প্রয়োজন হয়। 

তাদের শরীরে এই ফরমিক এসিড কীটনাশকের মতো কাজ করে আর এজন্য কাক বাধ্য হয়ে পিঁপড়াদের বাসাতে যায় আর এক প্রকার ফ্রিতে চিকিৎসা নিয়ে সমস্ত রোগ সারিয়ে আসে অর্থাৎ প্রথমে আমাদের যেটাকে বোকামি মনে হচ্ছিল বাস্তবে এটাও কাকদের বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ।

অ্যান্টিংয়ের রয়েছে দুই ধরন

পাখিদের এই আচরণ সাধারণত দুইভাবে দেখা যায়। প্রথমটি ‘অ্যাকটিভ অ্যান্টিং’। এ ক্ষেত্রে পাখি নিজেই ঠোঁট দিয়ে একটি বা একাধিক পিঁপড়া ধরে নিজের পালকের মধ্যে ঘষতে থাকে। কখনো পিঁপড়াকে ডানা, লেজ কিংবা শরীরের বিভিন্ন অংশে চেপে ধরে। এতে পিঁপড়ার শরীর থেকে প্রতিরক্ষামূলক রাসায়নিক বেরিয়ে আসে এবং পালকে ছড়িয়ে পড়ে।

দ্বিতীয়টি ‘প্যাসিভ অ্যান্টিং’। এ পদ্ধতিতে পাখি পিঁপড়ার বাসা কিংবা চলাচলের পথের ওপর বসে পড়ে। এরপর ডানা মেলে, পালক ফুলিয়ে কিংবা শরীর নড়াচড়া করে পিঁপড়াদের নিজের গায়ে ওঠার সুযোগ দেয়। পিঁপড়ারা তখন পাখির শরীরে ঘুরে বেড়ায় এবং আত্মরক্ষার জন্য রাসায়নিক নিঃসরণ করে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, পাখিটি ইচ্ছা করেই পিঁপড়ার আক্রমণ সহ্য করছে।   

এখন পর্যন্ত দুই শতাধিক প্রজাতির পাখির মধ্যে অ্যান্টিং আচরণ নথিভুক্ত হয়েছে। তবে সব পাখি একই কারণে কিংবা একই পদ্ধতিতে এই আচরণ করে না। পিঁপড়ার পাশাপাশি কোনো কোনো পাখিকে মিলিপিড, কিছু পোকামাকড় এবং উদ্ভিজ্জ উপাদানও পালকে মাখতে দেখা গেছে। অর্থাৎ শরীর পরিচর্যার ক্ষেত্রে পাখিরা পরিবেশ থেকে পাওয়া বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করতে পারে।

কাক কেন স্বেচ্ছায় পিঁপড়ের কামড় খায়? জানলে চমকে উঠবেন! • #CrowAnting •  #NatureFacts • #AmazingFacts • #WildlifePhotography

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, অ্যান্টিংয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। পরজীবী নিয়ন্ত্রণ, পালকের পরিচর্যা, শরীরের অস্বস্তি কমানো কিংবা খাবার প্রস্তুত—একাধিক ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। কোনো একটি কারণ সব প্রজাতির পাখির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

তাই পিঁপড়ার বাসায় গিয়ে কাকের কামড় খাওয়ার দৃশ্যকে নিছক বোকামি ভাবার সুযোগ নেই। এটি প্রাণিজগতের দীর্ঘ অভিযোজনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এক বিস্ময়কর আচরণ। 

যে পিঁপড়াকে আমরা সাধারণত বিরক্তিকর পোকা হিসেবে দেখি, সেই পিঁপড়ার আত্মরক্ষার কৌশলই কোনো কোনো পাখির কাছে হয়ে উঠতে পারে শরীর পরিচর্যা কিংবা খাবার প্রস্তুতির উপায়। প্রকৃতির এই ছোট্ট ঘটনাই মনে করিয়ে দেয়, প্রাণীদের প্রতিটি আচরণের পেছনে থাকতে পারে এমন কোনো রহস্য, যার উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীদেরও বছরের পর বছর গবেষণা করতে হয়। 

তারা তখন কোনো কারণ ছাড়াই পিঁপড়াগুলোকে উত্যক্ত ও রাগিয়ে তোলে। রাগন্বিত হয়ে সেই পিঁপড়াগুলো তখন আত্মরক্ষার জন্য ঝাঁকে ঝাঁকে পাখির গায়ে চড়ে বসে এবং হুল ফোটাতে শুরু করে। 

বাইরে থেকে এই দৃশ্য দেখলে মনে হতে পারে পাখিটি হয়তো কোনো বিপদে পড়েছে বা আক্রমণের শিকার হয়েছে, কিন্তু আদতে এটি তাদেরই এক সুপরিকল্পিত পদ্ধতি।

রাগান্বিত পিঁপড়ারা আত্মরক্ষার খাতিরে তাদের শরীর থেকে বিশেষ এক ধরণের প্রাকৃতিক অ্যাসিড নিঃসরণ করে। 

পাখি যখন ডানা ফুলিয়ে ও ঝাপটে এই পিঁপড়াগুলোকে নিজের গায়ে মাখে, তখন পিঁপড়ার দেহ থেকে বের হওয়া সেই অ্যাসিড তাদের পালক ও ত্বকে থাকা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক এবং নানা ধরণের পরজীবী ধ্বংস করতে অ্যান্টিবায়োটিক বা অ্যান্টিসেপটিকের মতো কাজ করে। 

জানেন কি কাক যখন অসুস্থ হয়, তখন সে পিঁপড়ের খোঁজে বের হয়। কেন ? অসুস্থ  অনুভব করলে কাকরা পিঁপড়ের বাসার কাছে গিয়ে বসে, ডানা মেলে স্থির ...

এই কড়া অ্যাসিডের ঝাঁঝালো গন্ধে পাখির পালকে লুকিয়ে থাকা উকুন বা অন্যান্য ক্ষতিকর পোকা-মাকড় পালিয়ে যায় বা মারা পড়ে। ফলে পুরো শরীরে এই জৈব অ্যাসিড সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং তাদের পালক পরিষ্কার ও সুস্থ রাখতে দারুণ সাহায্য করে। 

বিজ্ঞানীদের মতে, এই অ্যান্টিং মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে একটি হলো অ্যাক্টিভ অ্যান্টিং, যেখানে পাখি নিজে ঠোঁটে করে পিঁপড়া ধরে গায়ে ঘষে; আর অন্যটি হলো প্যাসিভ অ্যান্টিং, যেখানে পাখি সরাসরি পিঁপড়ার চাকের ওপর চুপ করে বসে পড়ে এবং পিঁপড়াদের নিজেই গায়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়। 

মানুষ ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম ওষুধ আবিষ্কার করার হাজার বছর আগেই যে প্রকৃতি নিজের মতো করে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও হাইজিনের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিল, কাকের এই 'অ্যান্টিং' তারই এক জীবন্ত প্রমাণ।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!