ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ সাক্ষাৎকার ]

অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে: রামপ্রসাদ বর্মণ

ফারহান সাদিক সাজু, বেরোবি
প্রকাশিত: ১৬:৩৬, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৪
অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে: রামপ্রসাদ বর্মণ
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

যখন শুনতে পাই, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিসহ পাবলিক লাইব্রেরিগুলোতে এখন আর সাধারণ মানুষ বসার জায়গা পায় না। ভোর থেকেই ছেলে-মেয়েরা লাইন দিয়ে লাইব্রেরিতে আগে প্রবেশ করার প্রতিযোগিতায় নামে। তবুও কেন শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা করার প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলেছে?

একজন শিক্ষার্থী কেন আত্মহত্যা করে? কোনো বিষয়গুলো আত্মহত্যার সঙ্গে জড়িত? আত্মহত্যা কমানোর কোনো উপায় আছে কি না? এসব জানতে ডেইলি বাংলাদেশকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রামপ্রসাদ বর্মণ। 

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বেরোবি প্রতিনিধি ফারহান সাদিক সাজু। 

Advertisement

ডেইলি বাংলাদেশ: শুরু থেকে যদি বলি, একজন শিক্ষার্থীর মাথায় আত্মহত্যা করার প্রবণতা কখন থেকে অনুপ্রবেশ করে বলে আপনি মনে করেন?

রামপ্রসাদ বর্মণ: একটা মানুষ যখন বিভিন্ন জায়গা থেকে হয় বঞ্চনার শিকার হন। বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে নিজেকে আলাদাভাবে ভাবা শুরু করেন, সামাজিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, তখন একজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। 

ডেইলি বাংলাদেশ: বিভিন্ন পেশার মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যা করে। কারণ কী? ক্যারিয়ার নিয়ে হতাশা...

রামপ্রসাদ বর্মণ: আত্মহত্যার করার পিছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। শুধু ক্যারিয়ার নিয়ে হতাশ হলেই একজন মানুষ আত্মহত্যা করে এমনটা নয়। আত্মহত্যা করার কয়েকটা স্টেজ আছে। যেমন, সামাজিকভাবে তাকে সবাই ঘৃণার চোখে দেখছে, সমাজে ন্যায়বিচার পাওয়া না গেলে তার মাথায় কুচিন্তার উদয় ঘটে। এভাবে আস্তে আস্তে মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়। তখন আত্মহত্যা করতে পারে।

ডেইলি বাংলাদেশ: সরকারি চাকরি না পাওয়া, সামাজিক অবক্ষয়, নাকি পারিবারিক দায়বদ্ধতার মধ্যে আত্মহত্যা লুকিয়ে আছে?

রামপ্রসাদ বর্মণ: সমাজের চারদিকে ঘুষ-দুর্নীতি সয়লাব হয়ে গেছে। ফলে মেধাবীরা-যোগ্যরা চাকরি পায় না। গরীব-মেধাবী শিক্ষার্থীতো টাকা দিয়ে চাকরি নেয়ার সম্ভাবনা নেই। একদিকে চাকরি না পাওয়ার ব্যথা, অন্যদিকে পরিবার থেকে চাপ, সবমিলিয়ে এসব থেকে বের হতে পারে না বলে সে আত্মহত্যা করে।

ডেইলি বাংলাদেশ: কোন লক্ষণগুলো প্রকাশ পেলে আমরা বুঝব একজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেচে নিতে পারে?

রামপ্রসাদ বর্মণ: সামাজিকবিজ্ঞানে নির্দিষ্ট কারণের বিষয়টি উল্লেখ নেই। তবে একজন মানুষকে যখন মানসিক টর্চারের রাখবেন। এছাড়াও কোনো শিক্ষার্থী যখন মাদক/অনৈতিক কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকারি গ্যাংদের সঙ্গে যুক্ত থেকে মারাত্মক অপরাধ করে। যার দরুন বিষয়টি আইন-আদালতে নজরে আসে, তখন সে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। কারণ সে বিষয়টিকে মেনে নিতে পারে না।

ডেইলি বাংলাদেশ: কোনো বয়সী শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি? কারণ হিসেবে কোনোটি কে দায়ী মনে করেন?

রামপ্রসাদ বর্মণ: বয়সের ব্যাপারটা ওভাবে আসে না। নবীন, তরুণ-তরুণী ও প্রবীণদেরও আত্মহত্যা করতে দেখা গেছে। তবে কেউ সামাজিকভাবে নিগৃহীত হয়, কোনো একটা বিষয়ে অনেক দুঃখ কষ্ট পেয়েছে সেটা কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অনেকসময় সে নিজেই বলে, আমি হয়তো আর বাঁচবো না, কোনো কিছু ভালো লাগতেছে না, এসব মানুষকে আমাদের চোখে চোখে রাখা উচিত।

ডেইলি বাংলাদেশ: আত্মহত্যার জন্য দায়ী আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, ধর্মীয় মূল্যবোধ না পরিবারের নৈতিক শিক্ষার অভাব। আপনার মতামত কি?

রামপ্রসাদ বর্মণ: উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা তার রেজাল্ট খারাপ আসার কারণে আত্মহত্যা করে। বন্ধু এ প্লাস পেয়েছে কিন্তু সে এ প্লাস পায়নি। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় চান্স পায়নি। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা আছে সেখান থেকে আমাদের বের হতে হবে। শিশুকাল থেকে পারিবারিক ও ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ না করলে মানুষগুলো আর মানুষ থাকে না। 

ডেইলি বাংলাদেশ: আত্মহত্যার অন্যতম কারণ কি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া, পড়ালেখার চাপ, সেশনজট, অভিমান, প্রেমঘটিত বিষয় বলে আপনি মনে করেন

রামপ্রসাদ বর্মণ: প্রতিবছর পরীক্ষার রেজাল্ট বের হলে অকৃতকার্য হওয়ার কারণেই আত্মহত্যা খবর বিভিন্ন জায়গা থেকে আমাদের কানে খবর আসে। একইভাবে অনার্স চার বছরের জায়গায় পাঁচ-সাত বছর লাগলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা চিন্তার ভাজ পরিলক্ষিত হয়। এছাড়াও প্রিয়জন থেকে আঘাত পেলেও সে এটি করতে পারে।

ডেইলি বাংলাদেশ: আত্মহত্যাই কি একমাত্র সমাধান হতে পারে। 

রামপ্রসাদ বর্মণ: আত্মহত্যা একমাত্র সমাধান নয়। যে আত্মহত্যা করে দিনশেষে সে নিজেকেই মেরে ফেললো না, গোটা পরিবার তার সঙ্গে সম্পর্কিত। সে নিজের ক্ষতি করল, প্লাস পরিবারের বড় ক্ষতি হলো।

ডেইলি বাংলাদেশ: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে যৌন হয়রানির শিকার হয়ে বিচার না পেয়ে অনেকেই আত্মহত্যা করেছে বলে উদাহরণ রয়েছে। এ বিষয়ে আপনার মতামত…। 

রামপ্রসাদ বর্মণ: যৌন হয়রানির বিষয়টি কেউ প্রকাশ করে না। আর এ বিষয়ে প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি বন্ধে একটা যৌন হয়রানি সেল গঠন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ন্যায় বিচার পাইয়ে দেওয়ার জন্য আমরা তাদের সঙ্গে আছি।

ডেইলি বাংলাদেশ: আত্মহত্যার বিষয়টি সমাজবিজ্ঞানীদের আলোকে বলতেন… 

রামপ্রসাদ বর্মণ: সমাজবিজ্ঞানী দাভিদ এমিল ডুরখেইম আত্মহত্যার বিষয়ে বেশ কয়েকটি কারণ খুঁজে পেয়েছেন। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সমাজে যখন সংহতি বা সলিডারিটি কমে যাবে তখন আত্মহত্যা করে। এটা থেকে কেউ বের হয়ে নিজেকে স্বতন্ত্র হিসেবে জাহির করে। ছাত্র-ছাত্রী এই সলিডারিটি থেকে বের হয় বলেই তাদের মাথায় আত্মহত্যার বিষয়টি চলে আসে।

ডেইলি বাংলাদেশ: আত্মহত্যার প্রবণতা থেকে বাঁচাতে করণীয়…?

রামপ্রসাদ বর্মণ: পারিবারিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। মানসিক প্রশান্তির জন্য খেলাধুলা আমোদ প্রমোদের ব্যবস্থা করতে হবে। সামাজিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকার চেষ্টা করতে হবে। হরর মুভি ও ক্রাইম সম্পর্কিত মুভিগুলো পরিত্যাগ করতে হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/কেবি
ট্যাগ: বেরোবি
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!