ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ ভ্রমণ ]
মস্কো থেকে বিশ্বপথে: 

রাশিয়ার পতিত লাল স্বপ্ন

মোহাম্মদ কামরুল হাসান
প্রকাশিত: ১৫:২৯, ৯ জুন ২০২৬
রাশিয়ার পতিত লাল স্বপ্ন
ছবি: সংগৃহীত

পর্ব এক
ছোটবেলায় আমি পড়তাম বিশ্বজিৎ দত্ত, সবার প্রিয় টুটুল ভাইয়ের কাছে। তিনি শুধু শিক্ষকই ছিলেন না, ছিলেন জ্ঞানের আলোয় ভরপুর এক মানুষ।  একসময় আমাদের সময় ও আমাদের অর্থনীতি পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।  তাঁর কাছ থেকেই প্রথম শিখেছিলাম বিশ্বরাজনীতির বুনন, মতাদর্শের পার্থক্য আর মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস।

আমার বাবা আমির উদ্দিন আহমেদের পরে তিনিই ছিলেন আমার বিশ্ব রাজনীতি শেখার ও জানার প্রথম গুরু।  ছোটবেলায় উদয়ন ম্যাগাজিনে রাশিয়া ও সমাজতন্ত্র নিয়ে লেখা পড়ে আমার মনে এক কোমল কৌতূহল জন্মেছিল।  পরে টুটুল ভাইয়ের কাছ থেকে কমিউনিজম সম্পর্কে জানতে জানতে সেই কৌতূহল পরিণত হয় এক বিশেষ আগ্রহে।  

Advertisement

কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, রাশিয়ায় পড়তে গিয়ে আমি দেখলাম এক ভিন্ন বাস্তবতা।  ২০০০ সালের দিকে লেনিন স্কয়ারে দাঁড়িয়ে দেখি—লেনিনের বিশাল ভাস্কর্যের নিচে মাত্র কয়েকজন প্রবীণ কমরেড সভা করছে।  আশপাশের তরুণরা কেউ তাকাচ্ছে না, বরং কেউ কেউ মুখ টিপে হাসছে।  একসময় যে পতাকা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, সেই পতাকা তখন বাতাসে ওড়ে কেবল স্মৃতির ভারে। 

২০০৩-০৪ সালের দিকে এসব দৃশ্য আরও বিরল হয়ে যায়। শুধু ৭ই নভেম্বর, রাশিয়ান রেভলিউশন ডে-এর দিন শহরের কেন্দ্রে হাঁটলে দেখা যেত কিছু প্রবীণ মানুষকে—পুরোনো কোট পরে, গায়ে অসংখ্য পদক ঝুলিয়ে, মুখে গর্বের রেখা ও হৃদয়ে ম্লান স্মৃতি নিয়ে হাঁটছেন। তাঁদের দেখে মনে হতো, তাঁরা ইতিহাসের শেষ সাক্ষী। 

হোস্টেলের কোলাহল ছেড়ে কিছুদিন ছিলাম এক রাশিয়ান ভদ্রলোকের বাসায়—ভালোদি নাম তাঁর, পেশায় ছিলেন মেটাল স্ট্রাকচার ইঞ্জিনিয়ার। অবসরের পর প্রাইভেট চাকরি করতেন। তাঁর বিশাল লাইব্রেরিতেই আমি থাকতাম , ব্যবহারের জন্য দিয়েছিলো একটা দিওয়ান , চার চেয়ার ওয়ালা একটা বড় পড়ার টেবিল , এক কোণে একটা রাশিয়ান পুরাতন আমলের টেলিভিশন আর চারদিকে অসংখ্য বই ।  সে চাকুরী করতো আর আমি সারা দিন ইউনিভার্সিটিতেই থাকতাম তাই আমাদের মধ্যে দেখা সাক্ষাৎ খুব কম হতো , তবে সময় পেলে মাঝে মাঝে চা খেতে খেতে আমাদের কথা হতো নানা বিষয়ে।  

একদিন তিনি বলেছিলেন, যা অনেকটা এই রকম- “পার্টিটা শেষ হয়ে গিয়েছিল, কারণ কমিউনিস্টরা তরুণদের বিশ্বাস করাতে ব্যর্থ হয়েছিল।  সেই সময়ে ভালোদি-র মতো অধিকাংশ তরুণের মনে হতো—এই রাষ্ট্র তাদের নয়, রাষ্ট্র তাদের কোনো উদ্দেশ্য পূরণ করে না।  রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিও নাগরিক স্বার্থের পরিপন্থী ছিল।” ভালোদির কথার মধ্যে ছিল এক গভীর সত্য। 

রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির পতন কোনো একদিনে হয়নি—এটা ছিল এক দীর্ঘ ক্ষয়প্রক্রিয়া। অর্থনৈতিক সংকট, বিশ্বরাজনীতিতে পুঁজিবাদের উত্থান, রাজনৈতিক দমন, সামাজিক অসন্তোষ, ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ, সংস্কারের ব্যর্থতা, আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি—সব মিলেই ধীরে ধীরে নিভে গেছে লাল আগুনের আলো। 

একসময় যে আদর্শ লক্ষ কোটি মানুষকে আন্দোলিত করেছিল, সেটি আজ ইতিহাসের পাতায় স্থান পেয়েছে, বাস্তব জীবনে নয়।  রাশিয়ার কমিউনিজমের লাল পতাকা তাই আজও উড়ে—কিন্তু শুধুই স্মৃতির বাতাসে।  (চলবে)
 

 

লেখক : মোহাম্মদ কামরুল হাসান পেশায় একজন আইটি ইঞ্জিনিয়ার এবং নেশায় ভ্রমণ ও বিশ্ব রাজনীতি বিষয়ক লেখক। বর্তমানে তিনি একটি যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে তথ্য-প্রযুক্তি প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত আছেন এবং একই সাথে যুক্ত আছেন বেশ কিছু বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সাথে। প্রযুক্তির পরিমণ্ডলে কাজ করলেও বিশ্ব রাজনীতি ও দূরান্তের ভ্রমণের প্রতি তাঁর রয়েছে গভীর অনুরাগ, যা প্রতিনিয়ত প্রতিফলিত হয় তাঁর তথ্যসমৃদ্ধ ও আকর্ষণীয় লেখনীতে। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস এম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!