আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
পর্যটন এখন আর শুধু বিনোদন, ভ্রমণ কিংবা অবকাশযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গতিশীল ও সম্ভাবনাময় শিল্প। পর্যটনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে বিমান পরিবহন, হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, সড়ক ও নৌযোগাযোগ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি, হস্তশিল্প, সংস্কৃতি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান।
একজন পর্যটক কোনো একটি গন্তব্যে এসে শুধু হোটেল ভাড়া দেন না। তিনি পরিবহন ব্যবহার করেন, খাবার কেনেন, স্থানীয় পণ্য ও স্মারক সংগ্রহ করেন, গাইডের সেবা নেন এবং বিনোদনসহ বিভিন্ন খাতে অর্থ ব্যয় করেন।
ফলে পর্যটকের ব্যয় সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ে এবং একটি অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতিকে গতিশীল করে। বিশ্বব্যাপী পর্যটন খাত বিপুল পরিমাণ আয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ এখনো আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে প্রত্যাশিত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি।
.png)
- বিশ্ব পর্যটন দিবসে তাই শুধু উৎসব ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনা, সমস্যা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ তাদের নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যকে পরিকল্পিতভাবে আন্তর্জাতিক পর্যটনপণ্যে রূপান্তর করেছে। নেপালের প্রধান আকর্ষণ হিমালয়, এভারেস্ট, অন্নপূর্ণা, পোখারা, নাগরকোট এবং পাহাড়কেন্দ্রিক ট্রেকিং ও অ্যাডভেঞ্চার পর্যটন।
দেশটি তার পাহাড়কে শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে ফেলে রাখেনি; আন্তর্জাতিক প্রচারণা, প্রশিক্ষিত গাইড, নিরাপদ ট্রেকিং রুট, মানসম্মত আবাসন ও পর্যটকবান্ধব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পাহাড়কে জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত করেছে।
- অন্যদিকে, মালদ্বীপ তার নীল সমুদ্র, প্রবালদ্বীপ, সাদা বালুর সৈকত ও জলকেন্দ্রিক বিলাসবহুল রিসোর্টকে বিশ্ববাজারে একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। দেশটির ভূখন্ড ছোট এবং সম্পদের বৈচিত্র্য সীমিত হলেও পরিকল্পিত বিনিয়োগ, উন্নত বিমান যোগাযোগ, নিরাপদ পরিবেশ, বিশ্বমানের সেবা ও শক্তিশালী প্রচারণার কারণে মালদ্বীপ এখন বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় সমুদ্রপর্যটন গন্তব্য।
মালয়েশিয়ার গেন্টিং হাইল্যান্ডস পর্যটন পরিকল্পনার আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। পাহাড়ি একটি এলাকাকে আধুনিক সড়ক, ক্যাবল কার, হোটেল, রিসোর্ট, সম্মেলনকেন্দ্র, শপিং, বিনোদন ও পরিবারকেন্দ্রিক নানা সুবিধার সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন নগরীতে রূপ দেওয়া হয়েছে।
গেন্টিং হাইল্যান্ডসের সাফল্যের মূল বিষয় শুধু পাহাড়ের সৌন্দর্য নয়; বরং একই স্থানে পর্যটকের থাকা, খাওয়া, চলাচল, বিনোদন, কেনাকাটা ও নিরাপত্তার সমন্বিত ব্যবস্থা। বাংলাদেশের বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি কিংবা সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলেও স্থানীয় প্রকৃতি ও সংস্কৃতির ক্ষতি না করে পরিবেশবান্ধব ক্যাবল কার, ভিউপয়েন্ট, পর্যটক বিশ্রামকেন্দ্র, কনভেনশন সুবিধা, হস্তশিল্প বিপণনকেন্দ্র ও নিয়ন্ত্রিত বিনোদনব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।
তবে উন্নয়নের নামে পাহাড় কাটা, বন ধ্বংস কিংবা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করা যাবে না। পর্যটন উন্নয়ন অবশ্যই পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।
নেপালের আছে অনন্য পাহাড়, মালদ্বীপের আছে স্বচ্ছ নীল সমুদ্র এবং মালয়েশিয়ার আছে পরিকল্পিত আধুনিক পর্যটন অবকাঠামো; কিন্তু বাংলাদেশের আছে সমুদ্র, পাহাড়, বন, নদী, হাওর, দ্বীপ, প্রতœতাত্তি¡ক নিদর্শন, ধর্মীয় ঐতিহ্য, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনের অপূর্ব সমন্বয়।
এ বৈচিত্র্য আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। কক্সবাজারের বিস্তৃত বালুকাবেলা, বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ, হিমছড়ি, ইনানী, দরিয়ানগর, মহেশখালী, সোনাদিয়া ও টেকনাফকে নিয়ে একটি সমন্বিত আন্তর্জাতিক পর্যটন অঞ্চল গড়ে তোলা সম্ভব। কক্সবাজারকে শুধু সৈকতে হাঁটা ও হোটেলে রাতযাপনের গন্তব্য হিসেবে রাখলে চলবে না।
এখানে নিরাপদ সমুদ্রস্নান, সার্ফিং, ক্রুজ, কায়াকিং, স্কুবা ডাইভিং, সামুদ্রিক জাদুঘর, আন্তর্জাতিক কনভেনশন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং রাতের নিরাপদ বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে।
পরিচ্ছন্ন সৈকত, নির্ধারিত মূল্য, উন্নত গণশৌচাগার, প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড ও পর্যটন তথ্যকেন্দ্র নিশ্চিত করা গেলে কক্সবাজার মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড কিংবা ইন্দোনেশিয়ার সমুদ্র গন্তব্যগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবে।
পটুয়াখালীর কুয়াকাটা একই স্থান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার বিরল সুযোগ, বিস্তৃত সৈকত, রাখাইন জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, বৌদ্ধমন্দির, শুঁটকিপল্লি, ঝাউবন, লেবুর চর ও ফাতরার বন নিয়ে একটি বহুমাত্রিক পর্যটন গন্তব্য।
পদ্মা সেতু নির্মাণের পর দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে; এখন কুয়াকাটাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মানের আবাসন, পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিনোদন, নিরাপত্তা ও পর্যটকসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

একইভাবে সুন্দরবন শুধু রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল নয়; এটি নদী, খাল, বন, বন্য প্রাণী ও মানুষের জীবনসংগ্রামের এক জীবন্ত প্রাকৃতিক জাদুঘর। সুন্দরবনে পর্যটন সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে পরিবেশের ধারণক্ষমতা নির্ধারণ, পরিবেশবান্ধব নৌযান, প্রশিক্ষিত প্রকৃতি-গাইড, প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
অপরিকল্পিত ভ্রমণ সুন্দরবনের জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু নিয়ন্ত্রিত ইকো-ট্যুরিজম জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের আয়ও বাড়াতে পারে।
বান্দরবানের নীলগিরি, নীলাচল, বগালেক, কেওক্রাডং, নাফাখুম ও থানচি। রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ, শুভলং ঝরনা ও পাহাড়ঘেরা জলপথ। খাগড়াছড়ির আলুটিলা, রিছাং ঝরনা ও সাজেক সব মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক অ্যাডভেঞ্চার ও সাংস্কৃতিক পর্যটনের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।
নেপালের পাহাড়ের উচ্চতা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি হলেও আমাদের পাহাড়ের সবুজ প্রকৃতি, ঝর্ণা, হ্রদ, জীববৈচিত্র্য এবং বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি নিজস্ব আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে। এ অঞ্চলে নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত ট্রেকিং রুট, প্রশিক্ষিত গাইড, উদ্ধারকারী দল, জরুরি চিকিৎসা, পর্যটক নিবন্ধন এবং পরিবেশবান্ধব হোমস্টে চালু করা দরকার।
একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্মতি ও অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে, যাতে পর্যটনের আয় সরাসরি তাদের কাছে পৌঁছায় এবং তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারা কোনোভাবেই বাণিজ্যিক আগ্রাসনের শিকার না হয়।
সিলেটের চা-বাগান, জাফলং, বিছনাকান্দি, রাতারগুল জলাবন, লালাখাল, টাঙ্গুয়ার হাওর এবং আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য বাংলাদেশের পর্যটন বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
বর্ষায় হাওরের বিশাল জলরাশি এবং শীতে অতিথি পাখির সমাবেশ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা তৈরি করে। সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে চা-বাগান, হাওর, মাজার ও প্রাকৃতিক দর্শনীয় স্থান নিয়ে বিশেষ আন্তর্জাতিক প্যাকেজ চালু করা যেতে পারে।
পাশাপাশি ঢাকার লালবাগ কেল্লা ও আহসান মঞ্জিল, সোনারগাঁয়ের পানাম নগর, বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, নওগাঁর পাহাড়পুর, বগুড়ার মহাস্থানগড়, কুমিল্লার ময়নামতি, রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চল এবং দেশের অসংখ্য জমিদারবাড়ি, নদী ও গ্রামীণ জনপদকে পৃথক পর্যটন সার্কিটে যুক্ত করা সম্ভব।
- মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, লোকসংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং ধর্মীয় সম্প্রীতিকে কেন্দ্র করেও আন্তর্জাতিক পর্যটনপণ্য তৈরি করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের পর্যটন থেকে আয়ের সম্ভাবনা বিপুল হলেও আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা ও জনপ্রতি ব্যয় এখনো প্রত্যাশার তুলনায় কম। পর্যটনের আয় শুধু সরকারি রাজস্ব কিংবা বড় হোটেলের মুনাফা দিয়ে বিচার করা ঠিক নয়। একজন পর্যটকের ব্যয় স্থানীয় পরিবহন, হোটেল, খাবার, দোকান, হস্তশিল্প, কৃষিপণ্য, বিনোদন, গাইড ও অন্যান্য সেবার মাধ্যমে বহু মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে পর্যটন গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করতে, নারী ও তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা গড়ে তুলতে পারে।
এ খাতের প্রকৃত অবদান নির্ধারণে নিয়মিত ‘ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট’ প্রস্তুত, পর্যটকের সংখ্যা ও ব্যয়ের তথ্য সংরক্ষণ এবং দেশি-বিদেশি পর্যটকের আলাদা পরিসংখ্যান প্রকাশ করা জরুরি। নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া বিনিয়োগ, বাজেট, অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক বিপণনের কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব নয়।

পর্যটন উন্নয়নে সভা, সেমিনার ও পর্যটন মেলার গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রয়েছে; তবে এগুলো শুধু আনুষ্ঠানিক আলোচনা, উদ্বোধনী বক্তব্য, ক্রেস্ট প্রদান এবং ছবি তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে কাক্সিক্ষত সুফল আসবে না।
রাজধানী ঢাকা ছাড়াও বিভাগীয় শহর ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রে নিয়মিত আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা, গন্তব্যভিত্তিক উৎসব, ট্যুর অপারেটরদের ব্যবসায়িক সভা, গবেষণা সম্মেলন এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে পর্যটন সম্মেলন আয়োজন করা প্রয়োজন। এসব আয়োজনে সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিমান সংস্থা, হোটেল-রিসোর্ট, ট্যুর অপারেটর, পর্যটন সাংবাদিক, গবেষক, স্থানীয় উদ্যোক্তা ও বিদেশি প্রতিনিধিদের এক প্ল্যাটফর্মে আনতে হবে। প্রতিটি সভা-সেমিনারের সুপারিশ বাস্তবায়নে সময়সীমা, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ও অগ্রগতি মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা দরকার।
- বিশ্ব পর্যটন দিবসের কর্মসূচিও এক দিনের শোভাযাত্রা কিংবা আলোচনা সভায় সীমাবদ্ধ না রেখে বছরব্যাপী জনসচেতনতা, প্রশিক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, নতুন গন্তব্য পরিচিতি এবং আন্তর্জাতিক প্রচারণার সূচনা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট জনবলকে যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া ছাড়া আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। হোটেল-রিসোর্টকর্মী, রেস্তোরাঁকর্মী, ট্যুর অপারেটর, গাইড, চালক, নৌযানকর্মী, দোকানি, পর্যটন পুলিশ, ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা এবং বিমানবন্দরের কর্মীদের আচরণ, ভাষা, নিরাপত্তা, প্রাথমিক চিকিৎসা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে ইংরেজি, আরবি, হিন্দি, চীনা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ভাষায় দক্ষ গাইড তৈরি করা যেতে পারে। পর্যটকের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে, কীভাবে অভিযোগ গ্রহণ করতে হবে এবং কীভাবে কোনো দেশের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে এসব বিষয় প্রশিক্ষণের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।
পর্যটন ও আতিথেয়তা শিক্ষাকে কারিগরি ও উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে সম্প্রসারণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের সনদ চালু করা গেলে দক্ষ কর্মীরা দেশে সেবা দেওয়ার পাশাপাশি বিদেশেও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন।
আন্তর্জাতিক পর্যটন বিকাশে বিমান পরিবহন ও বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন বিদেশি পর্যটকের বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রথম প্রত্যক্ষ ধারণা তৈরি হয় বিমানবন্দরে এবং বিদায়ের সময় শেষ ধারণাটিও তিনি বিমানবন্দর থেকেই নিয়ে যান।
তাই বিমানবন্দরে দীর্ঘ অপেক্ষা, লাগেজ পেতে বিলম্ব, অপ্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ, দালালের উৎপাত, পরিবহন বিশৃঙ্খলা বা হয়রানি দেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসসহ দেশীয় বিমান সংস্থাগুলোকে পর্যটনকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুট, সময়ানুবর্তী ফ্লাইট, সহজ ট্রানজিট, প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া এবং হোটেলসহ বিশেষ পর্যটন প্যাকেজ চালু করতে হবে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেট বিমানবন্দরের মধ্যে দ্রæত সংযোগ এবং আন্তর্জাতিক পর্যটকের সুবিধাজনক সময়সূচি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোর সঙ্গে সরাসরি বিমান যোগাযোগ বাড়ানো গেলে বিদেশি পর্যটকের সময়, ব্যয় ও ভোগান্তি কমবে।
- বিদেশি পর্যটকদের জন্য বিমানবন্দর ও প্রধান পর্যটনকেন্দ্রে পৃথক ‘ফরেন ট্যুরিস্ট হেল্প জোন’ বা আন্তর্জাতিক পর্যটক সহায়তাকেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে। সেখানে ভিসা, ইমিগ্রেশন, হোটেল বুকিং, মুদ্রা বিনিময়, সিম কার্ড, পরিবহন, পর্যটন মানচিত্র, জরুরি যোগাযোগ এবং অভিযোগ গ্রহণের সমন্বিত ব্যবস্থা থাকবে।
পৃথক সহায়তা ডেস্কের উদ্দেশ্য বিদেশি পর্যটকদের বিচ্ছিন্ন করা নয়; বরং ভাষা ও তথ্যগত সমস্যা দ্রæত সমাধান করে তাদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় ভ্রমণ নিশ্চিত করা। ই-ভিসা, ভিসা অন অ্যারাইভাল এবং অনলাইন ভ্রমণ অনুমতির প্রক্রিয়া আরও সহজ, স্বচ্ছ ও দ্রæত করতে হবে। প্রত্যেক বিদেশি পর্যটক যেন অনুমোদিত পরিবহন, নির্ধারিত ভাড়া, বিশ্বস্ত গাইড ও জরুরি সহায়তা সম্পর্কে আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই তথ্য পান, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। পর্যটন পুলিশকে আরও শক্তিশালী, প্রশিক্ষিত, প্রযুক্তিনির্ভর ও বহুভাষিক করতে হবে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, সিসিটিভি, জরুরি কল নম্বর, অভিযোগকেন্দ্র, নারী ও শিশু পর্যটকের বিশেষ সুরক্ষা, উদ্ধারকারী দল এবং দ্রæত চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
হোটেল, ট্যুর অপারেটর, যানবাহন ও গাইডের নিবন্ধন এবং ডিজিটাল যাচাই নিশ্চিত করা গেলে প্রতারণা ও অপরাধ কমবে। পর্যটকের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, অশোভন আচরণ, হয়রানি কিংবা নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ দ্রæত নিষ্পত্তি করতে হবে।
একটি নেতিবাচক অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্বারা মুহূর্তেই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারে। আবার একটি ভালো অভিজ্ঞতা বিনা খরচে বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচারণায় পরিণত হতে পারে।
পর্যটন উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। সৈকত, পাহাড়, বন ও হাওরে প্লাস্টিক বর্জ্য, অপরিকল্পিত হোটেল নির্মাণ, শব্দদূষণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংসের প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। প্রতিটি গন্তব্যের ধারণক্ষমতা নির্ধারণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব নির্মাণনীতি এবং নিয়ন্ত্রিত পর্যটক প্রবেশ চালু করা জরুরি।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটনের অংশীদার করে হোমস্টে, স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প ও সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর সুযোগ সৃষ্টি করলে আয়ের সুষম বণ্টন হবে। স্থানীয় মানুষ পর্যটন থেকে আর্থিকভাবে উপকৃত হলে তারা নিজেরাই প্রকৃতি, ঐতিহ্য ও নিরাপত্তা রক্ষায় এগিয়ে আসবেন।
আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে বাংলাদেশের মূল সংকট সম্পদের অভাব নয়। সংকট হলো পরিকল্পনা, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, দক্ষ জনবল, নিরাপত্তা, প্রচারণা এবং সেবার মানে। নেপাল তার পাহাড়, মালদ্বীপ তার সমুদ্র এবং মালয়েশিয়া গেন্টিং হাইল্যান্ডসের মতো পরিকল্পিত গন্তব্যকে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করেছে।
বাংলাদেশ চাইলে সমুদ্র, পাহাড়, সুন্দরবন, নদী, হাওর, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের আতিথেয়তার সমন্বয়ে আরও বৈচিত্র্যময় পর্যটন অভিজ্ঞতা দিতে পারে। এ জন্য পর্যটনকে সাধারণ অবকাশযাপনের খাত হিসেবে না দেখে জাতীয় অর্থনীতির কৌশলগত শিল্প হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
বিশ্ব পর্যটন দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে পরিকল্পিত বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল, উন্নত বিমান ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ পরিবেশ, সহজ ভিসা, আন্তর্জাতিক পর্যটক সহায়তাকেন্দ্র, কার্যকর সভা-সেমিনার ও পর্যটন মেলা এবং শক্তিশালী বিশ্ব প্রচারণার মাধ্যমে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করা।
লেখক: মো. গোলাম ফারুক মজনু
গবেষক ও পর্যটন বিশ্লেষক, সম্পাদক ও প্রকাশক, ডেইলি ট্যুরিজম টাইমস, সভাপতি, সম্মিলিত সাংবাদিক পরিষদ (এসএসপি)