ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ স্পটলাইট ]

বিধির তোয়াক্কা নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক ইউসুফের

বায়েজীদ মুন্সী
প্রকাশিত: ১৭:৪৪, ১৮ আগস্ট ২০২৬
বিধির তোয়াক্কা নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক ইউসুফের
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

সরকারি চাকরিতে বিধি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এসব নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করছেন না স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক মো. ইউসুফ। চাকরি জীবনে অসংখ্য বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি বিধি লঙ্ঘণের দায়ে ইতিপূর্বে হয়েছেন বরখাস্ত, ছিলেন কারাগারেও। কিন্তু শোধরানো তো দূরের কথা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন তৃতীয় শ্রেণির এ কর্মচারি। সরকারি চাকরির পাশাপাশি পরিচালনা করছেন ব্যবসা, রয়েছে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততাও। এছাড়া রাজনৈতিকভাবে প্রভাব খাটিয়ে বদলি বাণিজ্য, আউটসোর্সিং ঠিকাদারকে ভয়ভীতি দেখিয়ে চাকরি আদায় করাসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। 

জানা গেছে, ইউসুফের গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার প্রত্যন্ত চর মোহনা গ্রামে। কৃষক পিতা মো. আমিনের বড় ছেলে তিনি। লেখাপড়ার সুযোগ না পেয়ে এবং অভাবের তাড়নায় ঢাকায় এসে আসাদগেট এলাকায় ‌‘পান’ বিক্রি শুরু করেন। এরই ফাঁকে শিখে নেন গাড়ি চালানো। ১৯৯৮ সালের ৪ জুন ১৮ জেলা হাসপাতাল প্রকল্প চালু হলে সেখানে চাকরির সুযোগ পেয়ে যান ইউসুফ। চাকরিজীবনের প্রথম পোস্টিং ছিল নাটোর সদর হাসপাতালে। সেখানে তিন বছর চাকরি করার পর বদলি হয়ে প্রকল্পের প্রধান কার্যালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ঢাকায় আসেন। পরে চাকরি রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত হলে তার পোস্টিং হয় সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে অ্যাম্বুলেন্স চালাতেন ইউসুফ। সরকারি অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করতেন ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সহায়তায়ও।

আরো পড়ুন: চাকরি ছোট, সম্পদের সাম্রাজ্য বিশাল

Advertisement

২০১৩ সালের ২০ অক্টোবর প্রশিক্ষণের জন্য কয়েকজন নার্সকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছে দেন ইউসুফ। নার্সদের সেখানে নামিয়ে দেওয়ার পর তিনি চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে একটি অনুষ্ঠানের বিলবোর্ড, ব্যানার, গেঞ্জি ও লিফলেট অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যান। বিষয়টি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হলে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এরপর ইউসুফকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। একই সময়ে তার বিরুদ্ধে একটি সন্ত্রাসবিরোধী মামলাও হয়। সে মামলায় তিনি প্রায় দুই মাস কারাভোগ করেন।

বর্তমানে ইউসুফ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জালাল উদ্দিন রুমির গাড়ি চালক হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন। নির্বাচিত না হয়েও বাংলাদেশ স্বাস্থ্য বিভাগীয় সরকারি গাড়িচালক কল্যাণ সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির বর্তমান সভাপতি হিসেবে পরিচয় দেন। পাশাপাশি সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচী (ইপিআই), জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (আইপিএইচ), রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর), জাতীয় পুষ্টি প্রতিষ্ঠানসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারিদের বদলি বাণিজ্য, আউটসোর্সিং ঠিকাদারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে চাকরির আদায় করাসহ রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন গাড়ি চালক ইউসুফ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির একাধিক কর্মচারি অভিযোগ করে বলেন, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর গাড়ি চালক ইউসুফ কোন কিছুরই তোয়াক্কা করছেন না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে তিনি ‘রাম-রাজত্ব’ চালাচ্ছেন। পরিচালক (প্রশাসন) এর গাড়ি চালানোর পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে বদলি বাণিজ্য, নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আউটসোর্সিং-এ জনবল নিয়োগের টেন্ডার পায় ‘পিমা এসোসিয়েটস লিমিটেড’। সেখানে দু’জনকে চাকরি দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে ইউসুফ। তবুও তালিকায় তার পছন্দের লোকগুলোর নাম না থাকায় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন দুলালের ছোট ভাই নেসারকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আটকে হেনস্থা করেন ইউসুফ। এক পর্যায়ে তার পছন্দের দু’জনকে (পরিচ্ছন্নতা কর্মী নাছিমা এবং নিরাপত্তা প্রহরী আজিজুল হক ভূঁইয়া তৌসিফ) চাকরি দিতে বাধ্য করা হয় ওই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে। এর মধ্যে নাছিমা হচ্ছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আরেক গাড়ি চালক রশিদের বোন এবং আজিজুল হক ভূঁইয়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক পরিচালকের ভাগ্নে।

অথচ সরকারি চাকরিজীবীদের আচরণ বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি ২৭ ধারায় বলা হয়েছে, স্বজনপ্রীতি, প্রিয়তোষণ ও নিপীড়ন এবং স্বেচ্ছাচারপূর্বক ক্ষমতার অপব্যবহার করবেন না। এছাড়া মাহিলা সহকর্মীদের সঙ্গে আচরণে বিষয়ে ধারা ২৭ এর ‘এ’ তে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারি তার মহিলা সহকর্মীর প্রতি এমন ভাষা ব্যবহার করবেন না যা কোন উপায়ে অশোভন ও দাপ্তরিক শালীনতা এবং মহিলা সহকর্মীর মর্যাদা হানিকর হয়। অথচ কর্ম জীবনে নারী কর্মচারিদের হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে ইউসুফের বিরুদ্ধে।

জানা গেছে, ‘ম’ অদ্যাক্ষরের এক নারী সহকর্মীকে অবৈধ সম্পর্কের জন্য চাপ সৃষ্টি করেন ইউসুফ। এ নিয়ে কর্মচারিদের মধ্যে বেশ আলোড়নও সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে ওই নারী সহকর্মী তার উৎপীড়নে টিকতে না পেরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যান। ওই নারীকে নিজের মতো করে না পাওয়ার ক্ষোভে নিজের প্রভাব খাটিয়ে সেখান থেকেও আরো দূরে বদলি করান ইউসুফ। 

সরকারি চাকরিজীবীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের বিষয়ে সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি ২৫-এ সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞার কথা স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারি কোনো রাজনৈতিক দল বা এর অঙ্গসংগঠনের সদস্য হতে কিংবা অন্য কোনোভাবে যুক্ত হতে পারবেন না। পাশাপাশি বাংলাদেশ বা বিদেশে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা কিংবা সেগুলোতে কোনো প্রকার সহায়তা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া কোনো সরকারি কর্মচারি জাতীয় বা স্থানীয় নির্বাচনে প্রচারণায় অংশ নিতে, প্রভাব খাটাতে বা হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। তবে ভোটার হিসেবে তারা কেবল ভোট দিতে পারেন, কিন্তু কাকে ভোট দিচ্ছেন তা প্রকাশ করা বা প্রদর্শন করা নিষেধ। চাকরিতে বহাল থেকে রাজনীতিতে জাড়ানো বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া গুরুতর অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হয়, যার জন্য চাকরি হারানোর মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হতে পারে।

অথচ সরকারি চাকরি করেও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৭ নং ওয়ার্ডের ক্ষমতাসীন দলের দুর্যোগ ও ত্রাণ বিষয়ক সম্পাদক পদের দায়িত্বে রয়েছেন গাড়ি চালক ইউসুফ। যা সম্পূর্ণ সরকারি বিধির পরিপন্থি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফাহিম এন্টারপ্রাইজ নামে তার রেন্ট এ কারের ব্যবসা রয়েছে। এছাড়া তিনি নিজেও এ প্রতিবেদকের কাছে ব্যবসার কথা স্বীকার করেছেন। অথচ সরকারি চাকরিজীবীদের ব্যক্তিগত ব্যবসা বা চাকরিতে অংশগ্রহণের বিষয়ে সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি ১৭ ধারায় বলা হয়েছে, কোন সরকারি কর্মচারি সরকারের পূর্ব অনুমতি ব্যতীত কোন ব্যবসায় নিয়োজিত হতে কিংবা তার অফিসের দায়িত্ব ভিন্ন অন্য কোন চাকুরী বা কার্য গ্রহণ করতে পারবেন না। কিন্তু তিনি এসব নিয়ম নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজের খেয়াল খুশি মতো ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। 

সরকারি চাকরিজীবীদের ভবন নির্মানের বিষয়ে সরকারি কর্মচারি (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি ১২ ধারায় উল্লেখ রয়েছে, কোন সরকারি কর্মচারি লিখিত দরখাস্তের মাধ্যমে নির্মাণ ব্যয়ের অর্থ সংকুলানের উৎস প্রকাশপূর্বক সরকারের পূর্ব অনুমোদন ব্যতিরেকে আবাসিক বা বাণিজ্যিক লক্ষ্যে ব্যবহার্য কোন ভবন নির্মাণ করবেন না। অথচ ইউসুফের নিজের বসবাসের ফ্ল্যাট ছাড়াও ভবন তৈরি করে সেখানে নিয়মিত ভাড়া তুলছেন। 

এসব বিষয়ে ইউসুফের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, সরকারি চাকরির বিধিতে রাজনীতি করা নিষেধ সেটা জানি কিন্তু বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে জাড়িয়ে গেছি। এখান থেকে সরে আসতে পারিনি। আর আমি ব্যবসা শুরু করেছি চাকরি সরকারি হওয়ার আগে। 

বদলি বাণিজ্য, বদলির হুমকি দিয়ে টাকা পয়সা আদায়, আউটসোর্সিং ঠিকাদারদের ভয়ভীতি দেখানোর বিষয়ে জানতে চাইলে প্রথমে অস্বীকার করেন তিনি। পরবর্তীতে আউটসোর্সিং ঠিকাদারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে চাকরি আদায় করে নেওয়া এবং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের লোকজনকে হেনস্থার বিষয়ে প্রমাণাদি রয়েছে বলে অবগত করলে তিনি বলেন, সেদিন ঝামেলার সময়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে উপস্থিত ছিলাম। আমি চাকরি দেওয়ার জন্য বলেছি কিন্তু কাউকে হেনস্থা করিনি।

এ বিষয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন রুমির সাথে কথা হলে তিনি চালক ইউসুফের অসঙ্গতির বিষয়ে কোন কথা শুনতে চাননি। এ প্রতিবেদককে পাল্টা প্রশ্ন করেন তার গাড়ি চালক ইউসুফ সম্পর্কে পজেটিভ কিছু জানি কি না? তিনি বলেন, যদি পজেটিভ কিছু থাকে সেটা খোঁজ নেন। এর বাইরে আর কোন কথা নেই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসকে সাথে দুই দিনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে সহকারি পরিচালক কো-অর্ডিনেটর ডা. নুরুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিস্তারিত শোনেন এবং মহাপরিচালককে বিষয়টি অবহিত করবেন বলে জানান।

এদিকে সরকারি চাকরিতে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইন, বিধি ও দাপ্তরিক নির্দেশনা মেনে চলা বাধ্যতামূলক বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকতা। তিনি বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী সরকারি কর্মচারিদের আচরণ ও শৃঙ্খলা রক্ষায় নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। কোনো কর্মচারি ইচ্ছাকৃতভাবে এসব বিধি লঙ্ঘন করলে বিষয়টি ভুল হিসেবে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ধরণ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এক্ষেত্রে লঙ্ঘণের মাত্রা গুরুতর হলে চাকরি থেকে অপসারণ বা বরখাস্তের মতো ব্যবস্থাও হতে পারে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস আই এস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!