ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ স্বাস্থ্যকথা ]

ক্যান্সারে আক্রান্ত অজগরের শরীরে বিশ্বে প্রথম চিকিৎসা

২৩ বছর বয়সী অজগর ‘জোডি ফস্টার’ এখন সুস্থ, স্বাভাবিকভাবে খাচ্ছে
ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৮:৫১, ২১ আগস্ট ২০২৬
ক্যান্সারে আক্রান্ত অজগরের শরীরে বিশ্বে প্রথম চিকিৎসা
জোডি ফস্টারের শরীরে এমন একটি ম্যালিগন্যান্ট (ক্যানসারযুক্ত) টিউমারের চিকিৎসা করা হয়েছে, যা তার চোয়ালের হাড়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল।

মানুষের ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি আধুনিক পদ্ধতি এবার প্রথমবারের মতো প্রয়োগ করা হলো একটি সাপের শরীরে। যুক্তরাজ্যের চেস্টার চিড়িয়াখানার ২৩ বছর বয়সী একটি অজগরকে প্রাণঘাতী ক্যান্সারের চিকিৎসায় ইলেকট্রোকেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, সাপের শরীরে এ ধরনের চিকিৎসা প্রয়োগের ঘটনা বিশ্বে প্রথম।

‘জোডি ফস্টার’ নামের ১৫ ফুট (প্রায় ৪ দশমিক ৫ মিটার) লম্বা এবং ৫০ কেজি ওজনের এই রেটিকুলেটেড অজগরটি যুক্তরাজ্যের চেস্টার চিড়িয়াখানায় থাকে। হলিউড অভিনেত্রী জোডি ফস্টারের নামেই তার নাম রাখা হয়েছে।

Advertisement

সম্প্রতি জোডি কম খেতে শুরু করে এবং নিজের আবাসস্থলে আগের তুলনায় বেশি সময় নিষ্ক্রিয় ছিল। বিষয়টি নজরে আসার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তার চোয়ালে ফাইব্রোসারকোমা নামের একটি ম্যালিগন্যান্ট টিউমার শনাক্ত হয়।

প্রাথমিকভাবে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমারটি অপসারণ করা হয়। কিন্তু কিছুদিন পর সেটি আবার ফিরে আসে এবং অজগরটির চোয়ালের হাড়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এতে তার জীবন হুমকির মুখে পড়ে এবং খাবার গ্রহণও ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছিল।

জোডির আকার এত বড় যে তাকে চিকিৎসার জন্য একটি অপারেশন টেবিলে রাখা ছিল কষ্টকর। তাই দুটি অপারেশন টেবিল পাশাপাশি জুড়ে একটি বড় প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়, যার আকার প্রায় একটি ডাবল বেডের সমান।

বড় আকারের এই রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য দুটি অপারেশন টেবিল পাশাপাশি জোড়া দিতে হয়েছিল।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিজের আবাসস্থলেই সাপটিকে অচেতন করা হয়। এরপর সতর্কতার সঙ্গে চিড়িয়াখানার ভেটেরিনারি সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখানে প্রায় ৯০ মিনিট ধরে তার অস্ত্রোপচার করা হয়।

চিড়িয়াখানার ভেটেরিনারি কর্মকর্তা ইয়ান অ্যাশপোল প্রথমে টিউমারটি এবং আক্রান্ত চোয়ালের হাড়ের একটি অংশ অপসারণ করেন। এরপর অবশিষ্ট ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে প্রয়োগ করা হয় ইলেকট্রোকেমোথেরাপি।

ইলেকট্রোকেমোথেরাপিতে ব্লিওমাইসিন নামের একটি ক্যান্সার প্রতিরোধী ওষুধের সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত বৈদ্যুতিক পালস ব্যবহার করা হয়।

চিকিৎসার সময় টিউমারের নির্দিষ্ট স্থানে বৈদ্যুতিক পালস দেওয়া হয়। এতে ক্যান্সার কোষের আবরণ সাময়িকভাবে বেশি ভেদ্য হয়ে যায় এবং ওষুধটি কোষের ভেতরে আরও কার্যকরভাবে প্রবেশ করতে পারে। ফলে অবশিষ্ট ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করার ক্ষমতা বাড়ে।

চিকিৎসার কয়েক মাস পর জোডির অবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে। সে এখন স্বাভাবিকভাবে খাবার খাচ্ছে এবং আগের মতোই সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

চিড়িয়াখানার কর্মীরা জানিয়েছেন, জোডি এখনও স্বাভাবিকভাবে খাবারের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে, শিকার আঁকড়ে ধরে এবং কোনো ধরনের সমস্যা ছাড়াই খাবার গিলে ফেলছে।

ইয়ান অ্যাশপোল বলেন, টিউমারটি ফিরে এসে চোয়ালের হাড় ক্ষতিগ্রস্ত করতে শুরু করার পর শুধু অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাকে সুস্থ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে টিউমারের কারণে খাবার খাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়লে জোডিকে হারানোর আশঙ্কাও ছিল।

তিনি বলেন, তখন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করে সাপের শরীরে ইলেকট্রোকেমোথেরাপি কীভাবে প্রয়োগ করা যায়, তা নিয়ে পরিকল্পনা করা হয়। তাদের জানা মতে, কোনো সাপের শরীরে এর আগে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়নি।

লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট প্রাণীর ক্লিনিক্যাল সায়েন্স বিভাগের হোসে আলভারেজ পিকর্নেল বলেন, ইলেকট্রোকেমোথেরাপি একটি উদীয়মান চিকিৎসা পদ্ধতি এবং সাপের ক্ষেত্রে এটিই প্রথম প্রয়োগ।

তার মতে, এই চিকিৎসার সাফল্য বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের পারস্পরিক সহযোগিতার ফল। জোডি ফস্টারের চিকিৎসা শুধু একটি প্রাণীকে বাঁচাতে সহায়তা করেনি, বরং ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যান্য ভেটেরিনারি চিকিৎসকদের জন্যও নতুন পথ তৈরি করতে পারে।

সম্প্রতি করা সর্বশেষ পরীক্ষাতেও জোডির শরীরে ক্যান্সার ফিরে আসার কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি।

পিকর্নেল জানিয়েছেন, এই চিকিৎসা পদ্ধতির বিস্তারিত শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে। এর মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভেটেরিনারি বিশেষজ্ঞরা পদ্ধতিটি সম্পর্কে জানতে এবং ভবিষ্যতে আরও উন্নত করতে পারবেন।

চেস্টার চিড়িয়াখানায় আসার সময় জোডির কাগজপত্রে ‘জেএফ’ লেখা ছিল। সেটি ছিল ‘জুভেনাইল ফিমেল’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। কর্মীরা সেই আদ্যক্ষর থেকেই মজা করে তার নাম রাখেন ‘জোডি ফস্টার’।

২৩ বছর বয়সী এই বিশাল অজগরের চিকিৎসা শুধু একটি প্রাণীকে ক্যান্সার থেকে বাঁচানোর ঘটনা নয়; বরং বন্যপ্রাণী ও ভেটেরিনারি চিকিৎসায় মানুষের চিকিৎসা প্রযুক্তি কীভাবে নতুন প্রজাতির জন্যও অভিযোজিত করা যায়, তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস আর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!