ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ স্বাস্থ্যকথা ]
ফ্যাট লস নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা

ঘাম ঝরলেই কি চর্বি ঝরে? 

রাইসা মেহজাবীন
প্রকাশিত: ১০:৩৩, ২২ আগস্ট ২০২৬
ঘাম ঝরলেই কি চর্বি ঝরে? 
রাইসা মেহজাবীন, ফিটনেস পুষ্টিবিদ, ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ও ফিটনেস কোচ, ইন্সপিরন ফিটনেস এন্ড ডায়েট কনসালটেন্সি সেন্টার, ধানমন্ডি ব্রাঞ্চ  প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), নিউট্রিশন ফর চেঞ্জ

“আজ অনেক ঘাম হয়েছে, তাই অনেক ফ্যাট বার্ন হয়েছে।” জিমে বা ব্যায়ামের জায়গায় এমন কথা প্রায়ই শোনা যায়। অনেকে মনে করেন, শরীর থেকে যত বেশি ঘাম বের হবে, তত বেশি চর্বি কমবে। তাই কেউ কেউ অতিরিক্ত গরম পোশাক পরে ব্যায়াম করেন, আবার কেউ ঘামকে ব্যায়ামের সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি মনে করেন।

কিন্তু বেশি ঘাম হওয়া মানেই বেশি চর্বি কমে যাওয়া নয়। ঘামের প্রধান কাজ হলো শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা। ব্যায়ামের সময় শরীরের তাপমাত্রা বাড়লে ঘাম তৈরি হয়। সেই ঘাম ত্বকের ওপর থেকে বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ার সময় শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, ঘাম মূলত শরীরের cooling system। এটি সরাসরি চর্বি পোড়ানোর কোনো প্রক্রিয়া নয়।

শরীরচর্চায় ঘাম ঝরছে মানেই কি মেদ কমছে? যা বলছে বিশেষজ্ঞরাঘামের সঙ্গে ওজন কমার সম্পর্ক কোথায়?

ব্যায়ামের পর অনেকের ওজন সাময়িকভাবে কিছুটা কমে যায়। বিশেষ করে প্রচুর ঘাম হলে এই পরিবর্তন আরও বেশি দেখা যেতে পারে। এখান থেকেই তৈরি হয় ভুল ধারণা যে - “এত ওজন কমেছে মানে এত চর্বি কমেছে।”

Advertisement

আসলে ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে মূলত পানি বের হয়ে যায়। এর সঙ্গে কিছু ইলেকট্রোলাইটও বের হয়। ফলে শরীরের পানির পরিমাণ কমে গেলে ওজনও সাময়িকভাবে কমতে পারে।

ধরা যাক, কেউ এক ঘণ্টা ব্যায়াম করলেন এবং প্রচুর ঘামলেন। ব্যায়ামের পর ওজন মেপে দেখা গেল ৫০০ গ্রাম কম। এর অর্থ এই নয় যে তার শরীর থেকে ৫০০ গ্রাম চর্বি কমে গেছে। এই ওজন কমার বড় অংশই শরীরের পানি কমে যাওয়ার কারণে হতে পারে। পরে পানি পান করলে শরীরের তরল ভারসাম্য কিছুটা স্বাভাবিক হয় এবং ওজনও আবার বাড়তে পারে। তাই ওজন কমা আর শরীরের চর্বি কমা এক বিষয় নয়।

তাহলে চর্বি কমে কীভাবে?

চর্বি কমানোর ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো দীর্ঘমেয়াদে শরীর কতটা শক্তি গ্রহণ করছে এবং কতটা ব্যবহার করছে।

আমরা খাবার থেকে শক্তি বা ক্যালরি পাই। শরীর সেই শক্তি ব্যবহার করে দৈনন্দিন কাজ, শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং শারীরিক পরিশ্রমের জন্য। ব্যায়াম করলে শক্তি ব্যয় বাড়ে। খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক কার্যক্রমের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজনের তুলনায় কম শক্তি গ্রহণ হলে শরীর সঞ্চিত শক্তি ব্যবহার করতে শুরু করে। এর ফলে ধীরে ধীরে শরীরের চর্বি কমতে পারে। তবে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে ঘামের পরিমাণের সরাসরি সম্পর্ক নেই।

একজন মানুষ গরম ও আর্দ্র পরিবেশে অল্প সময় ব্যায়াম করেই অনেক ঘামতে পারেন। আবার অন্য একজন ঠান্ডা পরিবেশে একই ধরনের ব্যায়াম করেও খুব কম ঘামতে পারেন। এর মানে এই নয় যে প্রথম ব্যক্তির শরীর বেশি চর্বি পোড়াচ্ছে। ব্যায়ামের ধরন, সময়, তীব্রতা, শরীরের গঠন, পরিবেশ এবং ব্যক্তিগত শারীরিক বৈশিষ্ট্যের কারণে ঘামের পরিমাণে পার্থক্য হয়।

অতিরিক্ত ঘামের সমস্যা দূর করবে যে ৬ খাবার

ঘামানোর জন্য গরম পোশাক পরা কি কাজে দেয়?

ওজন কমানোর জন্য কেউ কেউ ভারী বা গরম পোশাক পরে ব্যায়াম করেন। উদ্দেশ্য থাকে বেশি ঘামানো। কিন্তু এতে মূলত শরীর থেকে বেশি পানি বের হয়; অতিরিক্ত চর্বি দ্রুত কমে যায় না।

বরং অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীরে পানিশূন্যতা হতে পারে। এতে মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা, অতিরিক্ত ক্লান্তি এবং ব্যায়ামের সময় কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে।

বিশেষ করে গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় অতিরিক্ত ঘাম হলে শরীরের পানির ঘাটতি পূরণ করা গুরুত্বপূর্ণ। তাই “যত বেশি ঘাম, তত বেশি ফ্যাট বার্ন” এই ধারণার পেছনে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

কম ঘাম হলে কি ব্যায়াম কম কার্যকর?

এটিও একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। অনেকেই মনে করেন, ব্যায়ামের পর শরীর ভিজে না গেলে ব্যায়াম ঠিকমতো হয়নি। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়।

ব্যায়ামের সময় কতটা ঘাম হবে, তা অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। পরিবেশের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, পোশাক, ব্যায়ামের ধরন এবং ব্যক্তিভেদে ঘামের স্বাভাবিক পার্থক্য রয়েছে।

তাই একজনের শরীর থেকে অনেক ঘাম বের হলেও অন্যজনের কম ঘাম হতে পারে দুজনের ব্যায়ামই কার্যকর হতে পারে। ব্যায়ামের কার্যকারিতা বোঝার জন্য ঘামের পরিমাণের চেয়ে ব্যায়ামের নিয়মিততা, সময়, তীব্রতা এবং ব্যক্তির শারীরিক সক্ষমতার উন্নতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

fat | Fitness Tips: Sweat loss does not equate to fat loss dgtl -  Anandabazar

তাহলে ব্যায়ামের সময় কী লক্ষ্য করবেন?

ওজন কমানোর জন্য ব্যায়াম করলে শুধু ঘাম হচ্ছে কি না, সেটি দেখার প্রয়োজন নেই। বরং এমন ব্যায়াম বেছে নেওয়া উচিত যা নিয়মিত করা সম্ভব।

দ্রুত হাঁটা, দৌড়ানো, সাইক্লিং, সাঁতার, strength training শরীরের সক্ষমতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের ব্যায়াম করা যেতে পারে।

শুধু ব্যায়াম করলেই হবে না। খাবারের মান ও পরিমাণ, ঘুম এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ। ওজন কমানোর ক্ষেত্রে কোনো একটি বিষয়কে আলাদা করে দেখলে পুরো ছবিটি বোঝা যায় না।

বিশেষ করে খুব দ্রুত ওজন কমানোর চেষ্টা না করে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস তৈরি করা বেশি কার্যকর।ঘামকে ফ্যাট লসের মাপকাঠি বানাবেন না

ফিটনেস নিয়ে কাজ করতে গিয়ে একটি বিষয় প্রায়ই দেখা যায় মানুষ ফলাফল মাপতে গিয়ে ভুল সূচক বেছে নেন। ঘাম তার একটি উদাহরণ। ব্যায়ামের পর শরীর ভিজে গেছে কি না, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনি নিয়মিত ব্যায়াম করছেন কি না, আপনার শক্তি ও কর্মক্ষমতা বাড়ছে কি না এবং দীর্ঘমেয়াদে শরীরের গঠন ও স্বাস্থ্য কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে।

চর্বি কমানো একটি ধীর প্রক্রিয়া। একদিন বেশি ঘামা বা একদিন কম ওজন দেখানো দিয়ে এর সাফল্য বিচার করা যায় না। চর্বি কমানোর জন্য দরকার নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। নিয়মিত ভালো অভ্যাসই ফিটনেসের আসল মাপকাঠি।

লেখক : রাইসা মেহজাবীন, ফিটনেস পুষ্টিবিদ 
পিজিটি (Nutrition and Fitness Training), ইন্সপিরন ফিটনেস এন্ড ডায়েট কনসালটেন্সি সেন্টার
স্পেশালাইজড ইন ফিটনেস নিউট্রিশন ট্রেনিং, নিউট্রিশন সলিউশনস
ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ও ফিটনেস কোচ, ইন্সপিরন ফিটনেস এন্ড ডায়েট কনসালটেন্সি সেন্টার, ধানমন্ডি ব্রাঞ্চ 
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), নিউট্রিশন ফর চেঞ্জ

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস এম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!