বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাব অনুযায়ী, তামাকজনিত রোগে বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৭০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। বাংলাদেশেও বছরে প্রায় দুই লাখ মানুষ তামাকজনিত কারণে প্রাণ হারান। দেশে প্রাপ্তবয়স্ক তামাক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় তিন কোটি ৭৮ লাখ। ২০২৪ সালের এক হিসাবে, তামাকজনিত স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যা তামাক খাত থেকে পাওয়া রাজস্বের প্রায় দ্বিগুণ। আরও উদ্বেগের বিষয়, ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যেও তামাক ব্যবহারের হার ২ দশমিক ৪৮ শতাংশ। নতুন প্রজন্মের নিকোটিন পণ্যের বিস্তার এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
তামাক কোম্পানিগুলো এখন আর শুধু প্রথাগত সিগারেটের বাজারে সীমাবদ্ধ নেই। ই-সিগারেট, ভেপিং, হিটেড টোব্যাকো ও নিকোটিন পাউচের মতো নতুন পণ্য বাজারে এনে তারা বিশেষ করে তরুণ ও নতুন প্রজন্মের ভোক্তাদের লক্ষ্য করছে। বিশ্ববাজারে এ ধরনের সুগন্ধিযুক্ত তামাক ও নিকোটিন পণ্যের সংখ্যা ১৬ হাজারেরও বেশি। বাবলগাম, চকোলেট, চেরি ও মিন্টের মতো ফ্লেভার শিশু-কিশোরদের আকৃষ্ট করার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
.png)
অনেক ই-সিগারেট দেখতে অবিকল ইউএসবি ড্রাইভ, কলম বা ছোট কোনো স্মার্ট ডিভাইসের মতো। ফলে এগুলো সহজে বহন ও লুকিয়ে রাখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ইনফ্লুয়েন্সারদের ব্যবহার করে এসব পণ্যের প্রচারণা চালানো হচ্ছে। টিকটক, ইউটিউব, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে আকর্ষণীয় উপস্থাপনার মাধ্যমে ভেপিংকে অনেক সময় ফ্যাশন, স্বাধীনতা কিংবা আধুনিক জীবনযাপনের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে অন্তত দেড় কোটি কিশোর-কিশোরী নিয়মিত ই-সিগারেট ব্যবহার করছে, যাদের একটি বড় অংশের বয়স ১৩ থেকে ১৫ বছর। গবেষণায় দেখা গেছে, ই-সিগারেট ব্যবহারকারী শিশু-কিশোরদের পরবর্তীতে প্রথাগত ধূমপানে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তিন গুণ বেশি।
ই-সিগারেট ও ভেপিংকে অনেক সময় প্রথাগত সিগারেটের তুলনায় নিরাপদ বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধারণা বিভ্রান্তিকর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) এবং আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটির গবেষণায় এসব পণ্যের বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পণ্যের ব্যবহারে ফুসফুসের জটিলতা, হৃদরোগ, রক্তনালির ক্ষতি, দাঁত ও মাড়ির সমস্যা এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। নিকোটিন বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে এবং শেখার সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাফি আহমেদ বলেন, ‘বন্ধুরা ভেপ ব্যবহার করত। মনে হয়েছিল মজার ব্যাপার। ফ্লেভার মিষ্টি, গন্ধও নেই। টিকটকে দেখে স্টাইলিশ লাগত। এখন ছাড়তে চাইলেও অস্থির লাগে। মোবাইলের মতোই অভ্যাস হয়ে গেছে।’উত্তরার এক কলেজছাত্রী সাদিয়া ইসলাম বলেন, ‘কলেজে অনেকেই চুপিচুপি ব্যবহার করে। দেখতে কলমের মতো, সহজে লুকানো যায়। প্রথমে ভেবেছিলাম সিগারেটের চেয়ে নিরাপদ। পরে বুঝেছি এটাও নিকোটিনের ফাঁদ।’ মিরপুরের তরুণ তানভীর হোসেন বলেন, ‘কাজের চাপে শুরু করেছিলাম। এখন ছাড়তে গেলে অস্থিরতা বাড়ে। অ্যাপে অর্ডার দিলেই পাওয়া যায়। নিয়ন্ত্রণ নেই বলে সহজলভ্য।’
বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণে আইনি অগ্রগতি হলেও নতুন নিকোটিন পণ্য নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। চলতি বছর জাতীয় সংসদে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ পাস হয়েছে। আইনে নির্ধারিত ধূমপান এলাকা (ডিএসএ) বাতিল, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তামাকের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাক বিক্রি নিষিদ্ধ করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে সংশোধনী প্রক্রিয়া থেকে ই-সিগারেট ও ভেপিং নিষিদ্ধের বিধান বাদ পড়ায় দেশে এসব পণ্যের বাজার আরও সহজলভ্য হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, ‘নিকোটিনযুক্ত নতুন পণ্যগুলো তরুণদের মধ্যে আসক্তি সৃষ্টি করছে। এগুলো মাদকের মতোই ক্ষতিকর। আমরা নজরদারি বাড়াচ্ছি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নিচ্ছি। তরুণদের সুরক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ জরুরি।’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘তামাক কোম্পানিগুলোর প্রভাবের কারণে আইনে ফাঁক থেকে যাচ্ছে। ই-সিগারেট ও ভেপিং তরুণদের লক্ষ্য করে বাজারজাত হচ্ছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি বাড়বে। সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।’
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, ‘তামাক কোম্পানিগুলো আধুনিকতা ও স্টাইলের নামে ই-সিগারেট ও ভেপিং ছড়িয়ে দিচ্ছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এসব পণ্যকে দ্রুত কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনা বা নিষিদ্ধ করা এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা বন্ধ করা দরকার।’
গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বলেন, ‘তরুণদের সুরক্ষায় সব নতুন তামাকপণ্যের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। আসন্ন বাজেটে সব ধরনের তামাকপণ্যের দাম বাড়িয়ে ক্রয়ক্ষমতার বাইরে নিয়ে যাওয়া উচিত।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘স্মার্ট ডিভাইসের মাধ্যমে নিকোটিন সরবরাহ মস্তিষ্কের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বাড়ানো ও অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করা জরুরি।’
মনোবিজ্ঞানী ড. নাজমা আক্তার বলেন, ‘তরুণরা স্ট্রেস, বন্ধুদের চাপ ও সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবে আসক্ত হচ্ছে। কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণদের নিকোটিন আসক্তির পেছনে প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আকর্ষণীয় প্রচারণা, বিভিন্ন ফ্লেভারের ব্যবহার, সহজলভ্যতা এবং এসব পণ্যকে ‘নিরাপদ’ বলে প্রচার করা। অনেক তরুণ ই-সিগারেট বা ভেপিংকে ধূমপানের বিকল্প হিসেবে মনে করেন। কিন্তু এতে নিকোটিন আসক্তির নতুন দরজা খুলে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রায় তিন কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করেন। ২০২৪ সালের হিসাবে তামাকজনিত স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা—যা তামাক খাত থেকে পাওয়া রাজস্বের প্রায় দ্বিগুণ। টোব্যাকো অ্যাটলাসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যেও তামাক ব্যবহারের হার ২ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এমন বাস্তবতায় নতুন নিকোটিন পণ্যের বিস্তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তরুণদের সুরক্ষায় ই-সিগারেট ও ভেপিংসহ সব নতুন নিকোটিন পণ্যে কঠোর নিয়ন্ত্রণ বা নিষেধাজ্ঞা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা বন্ধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক সচেতনতা কার্যক্রম এবং কর বাড়িয়ে এসব পণ্যকে তরুণদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে নিয়ে যাওয়া জরুরি।
স্মার্ট ডিভাইসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নিকোটিনের এই আসক্তি এখন আর কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি জাতীয় জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি। আকর্ষণীয় ডিজাইন, মিষ্টি ফ্লেভার, সহজলভ্যতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে নিকোটিনের দিকে টেনে নেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করা না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
তরুণ প্রজন্মকে এই নতুন ফাঁদ থেকে রক্ষা করতে সরকার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, স্বাস্থ্য খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে তামাক কোম্পানিগুলোর বিপণন কৌশল ও প্রভাব মোকাবিলা করে কার্যকর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। সময়মতো কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপই পারে স্মার্ট ডিভাইসের আড়ালে ছড়িয়ে পড়া নিকোটিন আসক্তির এই নতুন প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করতে।