ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ স্পটলাইট ]

নকশাবহির্ভূত ভবনে ঝুঁকিতে ঢাকা, রাজউকের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২০:০৪, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নকশাবহির্ভূত ভবনে ঝুঁকিতে ঢাকা, রাজউকের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন
ছবি: এআই জেনারেটেড

রাজধানীতে ইমারত নির্মাণে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নির্মাণসংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা কাগজে-কলমে থাকলেও এর যথাযথ প্রয়োগ বাস্তবে কতটা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এবং কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে নিয়মবহির্ভূতভাবে একের পর এক বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে রাজধানী।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজউকের জোন-৪-এর উত্তর বাড্ডা, শাহজাদপুর, মধ্যবাড্ডা, আফতাবনগর এবং জোন-৬-এর হাতিরঝিল, বনশ্রী, খিলগাঁও ও মালিবাগ এলাকায় অসংখ্য ভবনে নির্মাণকাজ চলছে। এসব ভবনের অনেক ক্ষেত্রেই অনুমোদিত নকশা, ভবন নির্মাণের তথ্য ও নিরাপত্তাবিধি যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

রাজধানীর শাহজাদপুরের হাজী কমর উদ্দিন রোডে রিজেন্ট গ্রুপের একটি প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ১৫ কাঠা জমির ওপর একটি বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। ভবনের চারপাশে প্রয়োজনীয় ফাঁকা জায়গা রাখা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্প এলাকায় ভবন নির্মাণসংক্রান্ত কোনো তথ্য-নির্দেশিকাও দেখা যায়নি।

Advertisement

বিষয়টি নিয়ে ওই এলাকার ইমারত পরিদর্শক রকিব উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন। এ বিষয়ে আরও জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তারা বড় কোম্পানি। আমরা কিছু বলতে গেলে তারা রাজউক চেয়ারম্যান বা পরিচালকের নাম বলেন এবং তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।’

এদিকে, আগের ড্যাপের (বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা) বিধান অনুযায়ী ভবনের উচ্চতা ও ইউনিটসংখ্যার যে হিসাব থাকার কথা, সেই হিসাবের সঙ্গে ভবনটির বাস্তব নির্মাণ এবং ফ্লোর এরিয়ার মিল নেই বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

আফতাবনগরেও নকশাবহির্ভূত নির্মাণ নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে গিয়ে ইমারত পরিদর্শকদের সময় কাটানোর প্রবণতা রয়েছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ডেভেলপার কোম্পানির নতুন প্রকল্পের নকশা অনুমোদনসংক্রান্ত কাজেও তাদের ব্যস্ত থাকতে দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে ওই এলাকার ইমারত পরিদর্শক মো. শাহজাহানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘রাজউক নকশা অনুমোদন করার পর ইস্টার্ন হাউজিংয়ের অনুমোদন নিয়ে তারা কাজ করেন। সেখানে আমাদের তেমন কিছু করার থাকে না।’

তিনি জানান, কোথাও অভিযানে গেলে অনেক সময় সংশ্লিষ্টরা ইস্টার্ন হাউজিংয়ের অনুমোদনের কথা বলেন। পরবর্তীতে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের লোকজনও তাদের পক্ষে সুপারিশ করতে আসেন বলে দাবি করেন তিনি।

এ বিষয়ে ওই এলাকার পরিচালক সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করি। তবে কোনো অভিযোগ এলে দ্রুত ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

তবে প্রশ্ন উঠেছে, নিয়মবহির্ভূত নির্মাণ বন্ধে রাজউকের কর্মকর্তাদের পদক্ষেপ নিতে কেন সবসময় অভিযোগের অপেক্ষায় থাকতে হবে? ইমারত পরিদর্শক, অথরাইজড অফিসার বা পরিচালকের দায়িত্ব কি শুধু অভিযোগ পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? কোনো অভিযোগ না এলে নকশাবহির্ভূত বা নকশাবিহীন নির্মাণের বিরুদ্ধে রাজউক কি নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা নেবে না?

সরেজমিনে আরও দেখা গেছে, এসব এলাকার অধিকাংশ নির্মাণাধীন ভবনে রাজউক অনুমোদিত ভবন নির্মাণসংক্রান্ত তথ্যের বোর্ড নেই। কিছু ভবনে বোর্ড থাকলেও সেখানে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেওয়া হয়নি। কোথাও শুধু নকশার রেফারেন্স নম্বর ও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য রয়েছে। কিন্তু কতটুকু জমির ওপর ভবন নির্মাণ হচ্ছে, কত তলা নির্মাণের অনুমোদন রয়েছে, অনুমোদিত ফ্লোর এরিয়া কত এবং বাস্তবে কতটুকু নির্মাণ করা হচ্ছে—এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই উল্লেখ নেই।

আফতাবনগরের ডি ব্লকের ৮ নম্বর সড়কে সাইয়ন অ্যাসেট ডেভেলপারসের একটি চলমান প্রকল্পেও এমন তথ্য-সহায়িকা দেখা যায়নি। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে আফতাবনগরের কোঠাবাড়ি বিল্ডার্স, হিল টাউন বিল্ডার্স, এসডিডিএল, বেসিক বিল্ডার্সসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্মাণাধীন প্রকল্পের বিরুদ্ধে।

কিছু ভবনে তথ্য বোর্ড থাকলেও অনুমোদিত নকশায় যতটুকু নির্মাণের অনুমতি রয়েছে, তার চেয়ে বেশি অংশ নির্মাণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া অনেক নির্মাণাধীন ভবনে শ্রমিক ও পথচারীদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা বা নিরাপত্তাবেষ্টনীও নেই। আবার কোনো কোনো ভবন রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণ করা হচ্ছে বলেও জানা গেছে।

বনশ্রীর হাজীপাড়া ও রামপুরা এলাকাতেও নকশাবহির্ভূত নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অনেকেই ভবন নির্মাণসংক্রান্ত তথ্য এবং অনুমোদিত নকশার শর্ত সম্পর্কে জানেন না।

রামপুরার কুঞ্জবন এলাকার মিজান রোডের বাসিন্দা মো. সারোয়ার আলম বলেন, ‘নকশার অনুমোদন পেয়েছি। এত টাকা দিয়ে জমি কিনেছি, আমার জায়গায় আমি বাড়ি বানাচ্ছি। সামনে রাস্তার জন্য জায়গা ফাঁকা রাখছি। পাশে আবার খোলা জায়গা রাখতে হবে কেন? পাশের বাড়ির সঙ্গে লাগিয়ে তো করছি না, ফাঁকা জায়গা তো আছেই।’

তার বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, ভবন নির্মাণে অনুমোদিত নকশার পাশাপাশি সেটব্যাক ও অন্যান্য বিধিবিধান মানার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অনেক ভবন মালিকের মধ্যেই যথেষ্ট সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে।

এ বিষয়ে ওই এলাকার অথরাইজড অফিসার আব্দুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে জানা যায়, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি ছুটিতে আছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নকশা অনুমোদন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারকি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনুমোদনের পর নির্মাণকাজে পরিবর্তন এনে ভবন নির্মাণ করা হলে সেটি শুধু আইন লঙ্ঘনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলে।

এ বিষয়ে দেশের অন্যতম আর্কিটেক্ট ফার্মের প্রধান প্রকৌশলী এ আর শফিক রহমান বলেন, রাজউক অনুমোদিত নকশা পরিবর্তন করে—বিশেষ করে অনুমোদন ছাড়া অতিরিক্ত তলা নির্মাণ, বাড়তি অংশ তৈরি, সেটব্যাক কমানো, কলাম-বিমের অবস্থান পরিবর্তন কিংবা ভবনের ব্যবহার পরিবর্তন করে নির্মাণ করলে ভবিষ্যতে আইনি, কাঠামোগত, অগ্নিনিরাপত্তা ও ভূমিকম্পজনিত বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, অনুমোদিত নকশায় যে পরিমাণ লোড বিবেচনা করে কলাম, বিম, ফাউন্ডেশন ও অন্যান্য কাঠামো ডিজাইন করা হয়, নকশাবহির্ভূত নির্মাণের ফলে তার চেয়ে বেশি ভার পড়তে পারে। এতে কলাম ও বিমে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি, ফাটল, ভবন হেলে পড়া এবং দীর্ঘমেয়াদে কাঠামোগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। চরম পরিস্থিতিতে ভবন ধসেও পড়তে পারে।

ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে নকশাবহির্ভূত পরিবর্তন বিশেষভাবে বিপজ্জনক বলে উল্লেখ করেন প্রকৌশলী এ আর শফিক রহমান। তার ভাষ্য, কলাম সরিয়ে দেওয়া, নিচতলা অতিরিক্ত খোলা রাখা, অনুমোদনের বাইরে অতিরিক্ত তলা নির্মাণ কিংবা ভবনের ভারসাম্যে পরিবর্তন আনা হলে এর ভূমিকম্পকালীন আচরণ বা সিসমিক বিহেভিয়ার পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে ভূমিকম্পের সময় অনুমোদিত নকশার তুলনায় ভবনের ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এ ছাড়া অনুমোদিত নকশার বাইরে অতিরিক্ত তলা বা ভারী নির্মাণ করলে ফাউন্ডেশনের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। মাটির ধারণক্ষমতার তুলনায় ফাউন্ডেশন অপর্যাপ্ত হলে ভবনে সেটেলমেন্ট বা অসম বসে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর ফলে দেয়াল, কলাম ও বিমে ফাটল সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

নকশা পরিবর্তনের ফলে সিঁড়ি, জরুরি বহির্গমনপথ, ফায়ার-সেফটি ব্যবস্থা কিংবা প্রয়োজনীয় খোলা জায়গা কমে গেলে অগ্নিকাণ্ডের সময় ভবন থেকে দ্রুত বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এতে আগুন ও ধোঁয়ায় প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ে।

অন্যদিকে, সেটব্যাক বা খোলা জায়গা কমিয়ে নির্মাণ করলে ভবনে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো-বাতাস প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে ভবনের ভেতরে আর্দ্রতা ও বদ্ধ পরিবেশ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি বসবাসের অস্বস্তিও বাড়তে পারে।

নির্ধারিত দূরত্ব বা সেটব্যাক না মানলে পাশের ভবনের আলো-বাতাস, চলাচল ও নিরাপত্তাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নির্মাণকাজের সময় পাশের ভবনের ভিত্তি বা কাঠামোরও ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

নকশা পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুতর দিক হলো, একটি ভবন বাইরে থেকে স্বাভাবিক ও শক্তিশালী মনে হলেও তার প্রকৃত কাঠামোগত নিরাপত্তা অনুমোদিত নকশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। বিশেষ করে ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড, অতিরিক্ত ভার কিংবা দীর্ঘমেয়াদি মাটির বসে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে এসব দুর্বলতা প্রকাশ পেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নকশাবহির্ভূত নির্মাণ শুধু রাজউকের বিধিমালা লঙ্ঘন নয়; এটি ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা, ভূমিকম্প সহনশীলতা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতে সম্পত্তির বৈধতার ওপরও ঝুঁকি তৈরি করে।

রাজধানীতে প্রতিদিন নতুন নতুন বহুতল ভবন নির্মাণ হচ্ছে। কিন্তু এসব নির্মাণের অনুমোদন ও বাস্তবায়নের মধ্যে যদি সমন্বয় না থাকে, আর নির্মাণকাজের নিয়মিত তদারকি না হয়, তাহলে ‘আধুনিক ঢাকা’ গড়ার পরিবর্তে নগরবাসীকে আরও বড় ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়া হতে পারে।

নিরাপদ ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়তে তাই শুধু নকশা অনুমোদন নয়, অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মাণ হচ্ছে কি না—তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ও নিয়মিত তদারকি জরুরি। একই সঙ্গে ভবন মালিক, ডেভেলপার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নির্মাণবিধি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধ যাতে সংঘটিতই না হয়, সেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/কে কে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!