ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ স্বাস্থ্যকথা ]

বিয়ের পরে ওজন কেন বাড়ে? 

নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই যা বলছে গবেষণা
রাইসা মেহজাবীন
প্রকাশিত: ১১:০১, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিয়ের পরে ওজন কেন বাড়ে? 
রাইসা মেহজাবীন বিএসসি. (অনার্স), ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার, নিউট্রিশন ফর চেঞ্জ

বিয়ের পর অনেকেরই শরীরের ওজন ধীরে ধীরে বাড়তে দেখা যায়। প্রচলিত কথায় বিষয়টি প্রায়ই রসিকতার ছলে বলা হয় ‘বিয়ের পর মোটা হয়ে গেছে।’ কিন্তু বিষয়টি শুধু রসিকতার নয়; গবেষণাতেও বিয়ে বা দাম্পত্য জীবনে প্রবেশের সঙ্গে ওজন ও বডি মাস ইনডেক্স (BMI) বাড়ার একটি সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে বিয়ে নিজেই মানুষকে মোটা করে। বরং বিয়ের পর জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা ও দৈনন্দিন রুটিনে যে পরিবর্তন আসে, সেগুলো ওজন বাড়ার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষণা কী বলছে?

২০১২ সালে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় ২০টি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিয়ে বা সহবাসে প্রবেশের সঙ্গে ওজন বাড়ার প্রবণতা ছিল। বিপরীতে বিবাহবিচ্ছেদ বা দাম্পত্য সম্পর্কের অবসানের সঙ্গে ওজন কমার প্রবণতাও দেখা গেছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই সম্পর্ক নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই দেখা গেছে এবং লিঙ্গভেদে খুব বড় পার্থক্য পাওয়া যায়নি।

Advertisement

আরও সাম্প্রতিক একটি systematic review-তেও দেখা গেছে, অবিবাহিত অবস্থায় থাকা ব্যক্তিদের তুলনায় বিয়ে বা একসঙ্গে বসবাস শুরু করা তরুণ-তরুণীদের BMI তুলনামূলক বেশি বাড়তে পারে। কিছু গবেষণায় বিয়ের পর শারীরিক সক্রিয়তা কমে যাওয়ার ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। তবে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন নিয়ে গবেষণার ফল এখনো সীমিত ও একরকম নয়।

অর্থাৎ, ‘বিয়ের পর মোটা হওয়া’কে কেবল একটি সামাজিক ধারণা হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই, আবার এটিকে বিয়ের সরাসরি জৈবিক ফল বলাও বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।

তাহলে ওজন বাড়ে কেন?

এর একটি সম্ভাব্য কারণ হলো জীবনযাপনের পরিবর্তন। বিয়ের আগে অনেকে নিজের শরীর ও ওজন নিয়ে তুলনামূলক বেশি সচেতন থাকেন। নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম, জিমে যাওয়া কিংবা খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা থাকতে পারে। বিয়ের পর কাজ, সংসার, সামাজিকতা ও পারিবারিক দায়িত্বের কারণে সেই সময় ও মনোযোগ কমে যেতে পারে।

দ্বিতীয় কারণ হতে পারে দুজনের খাবারের অভ্যাস একে অপরের ওপর প্রভাব ফেলা। সঙ্গী যদি নিয়মিত বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবার, মিষ্টি, ভাজাপোড়া বা রাতের খাবার পছন্দ করেন, তাহলে অন্যজনের খাদ্যাভ্যাসেও তার প্রভাব পড়তে পারে। একসঙ্গে খাওয়া, বাইরে খেতে যাওয়া কিংবা অবসরে খাবার গ্রহণের সুযোগও বাড়তে পারে।

তৃতীয় বিষয় হলো শারীরিক সক্রিয়তা কমে যাওয়া। গবেষণায় বিয়ে বা সহবাসের পর কিছু ক্ষেত্রে শারীরিক সক্রিয়তা কমার প্রবণতা দেখা গেছে, বিশেষ করে নারীদের মধ্যে এ ধরনের সম্পর্ক কিছু গবেষণায় বেশি পাওয়া গেছে।

নারীদের ক্ষেত্রে কি বিষয়টি আলাদা?

নারী ও পুরুষ দুজনের ক্ষেত্রেই বিয়ের পর ওজন বাড়তে পারে। তবে নারীদের ক্ষেত্রে জীবনের অন্য কিছু পরিবর্তন বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

বিয়ের পর গর্ভধারণ, গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধি এবং সন্তান জন্মের পর ওজন কমাতে না পারা এসব আলাদা বিষয়। বিশেষ করে সন্তান জন্মের পর ঘুমের ঘাটতি, শিশুর যত্ন, সময়ের অভাব এবং শারীরিক সক্রিয়তা কমে যাওয়ার কারণে আগের ওজনে ফিরে আসা অনেকের জন্য কঠিন হতে পারে।

তবে গর্ভাবস্থার স্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধি এবং বিয়ের পর অতিরিক্ত চর্বি জমে ওজন বাড়া দুটিকে এক করে দেখা ঠিক নয়। একইভাবে, সব নারীর বিয়ের পর ওজন বাড়বে এমন কোনো বৈজ্ঞানিক নিয়মও নেই।

পুরুষের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা

‘বিয়ের পর শুধু নারীরাই মোটা হন’ এ ধারণারও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। গবেষণায় পুরুষদের ক্ষেত্রেও বিয়ের সঙ্গে ওজন বা BMI বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে সব গবেষণায় ফল একই নয়; কিছু গবেষণায় নারীদের ক্ষেত্রে সম্পর্কটি বেশি স্পষ্ট, আবার কিছু গবেষণায় পুরুষদের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে।

এখানে তাই নারী-পুরুষকে আলাদা করে দায়ী করার চেয়ে দাম্পত্য জীবনের পরিবর্তিত জীবনযাপনকে গুরুত্ব দেওয়া বেশি যৌক্তিক।

‘বিয়ের পর একটু মোটা হওয়া’ কি ক্ষতিকর?

কয়েক কেজি ওজন বাড়লেই কেউ অসুস্থ হয়ে পড়বেন এমন নয়। কিন্তু যদি ওজন ক্রমাগত বাড়তে থাকে এবং বিশেষ করে কোমর ও পেটের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি জমে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, স্থূলতা একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যার সঙ্গে খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যকলাপ, পরিবেশ, আচরণ এবং জেনেটিকসহ একাধিক বিষয় জড়িত।

সমাধানটা ‘ডায়েট’ নয়, দুজনের জীবনযাপনে

বিয়ের পর ওজন নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে দুজন মিলে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন তৈরি করা।

একসঙ্গে নিয়মিত হাঁটা, ঘরে পুষ্টিকর খাবার তৈরি করা, অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও চিনিযুক্ত খাবার সীমিত করা, পর্যাপ্ত শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণ শস্য ও উপযুক্ত প্রোটিন রাখা এবং খাবারের পরিমাণের দিকে নজর দেওয়া এসব দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০–৩০০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রম অথবা ৭৫–১৫০ মিনিট উচ্চমাত্রার শারীরিক কার্যক্রম করা উচিত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সঙ্গীর ওজন নিয়ে মন্তব্য না করে সঙ্গী হওয়া। 

বিয়ে জীবনের নতুন অধ্যায়। সেই অধ্যায়ে শুধু একসঙ্গে থাকা নয়, একসঙ্গে সুস্থ থাকাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিয়ের পর ওজন বাড়াকে নিয়তি হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার ওজন কমানোর নামে কঠোর, অপ্রয়োজনীয় ডায়েটেও যাওয়ার দরকার নেই। প্রয়োজন হলো দুজনের জন্য টেকসই, আনন্দদায়ক ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের অভ্যাস তৈরি করা।


লেখক : রাইসা মেহজাবীন
বিএসসি. (অনার্স), ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
এমপিএইচ (ইন প্রগ্রেস), নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
পিজিটি অন নিউট্রিশন অ্যান্ড ফিটনেস ট্রেনিং, ইনস্পিরন ফিটনেস অ্যান্ড ডায়েট কনসালটেন্সি সেন্টার
ব্রাঞ্চ ম্যানেজার, ফিটনেস ট্রেনিং, ইনস্পিরন ফিটনেস অ্যান্ড ডায়েট কনসালটেন্সি সেন্টার, ধানমন্ডি
চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার, নিউট্রিশন ফর চেঞ্জ

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস এম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!