আমার সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচয় - আমি তোমার সন্তান
জানতাম না–
চিঠি দিবস বলেও একটা দিন আছে! ২০০৯-এ মাকে একটা চিঠি লিখেছিলাম।
অথচ মা তারও ১ বছর আগে পৃথিবী ছেড়েছিলো! চিঠি লেখার অভ্যেস হারিয়ে যাচ্ছে;, হারিয়ে যাচ্ছে চিঠির সেই নিবিড় আবেগও। প্রয়াত মায়ের উদ্দেশে লেখা সেই চিঠিটিই আবারো শেয়ার করতে ইচ্ছে হলো—
মা-মনে পড়ে?
বয়স তখন আমার কতোইবা -
যে অবধি শিশুরা মায়ের দুধ পান করে, তার কিছু বেশিইতো -
তবু, কিছুতেই এই ক্ষুদে রাক্ষস, মায়ের দুধ ছাড়ছে না।
করলার রস, বাটা মরিচের প্রলেপ - তোমার সব প্রচেষ্টাই সারা!
বিয়েবাড়ি কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠান - তুমি গেছো সপরিবারে-সানন্দে -
হঠাৎ, তোমার এই কনিষ্ঠ মিচকে’র রোখ- ‘দুধ দাও-’
ভরা মজলিশ এড়িয়ে তুমি তখন অন্ধকার কোণের খোঁজে, মিচকে’র খেয়াল মেটাতে -
আর আমার ব্যস্ততা - তোমার বুকে লুকিয়ে, আমার নিজের পৃথিবীর আনন্দ রস আস্বাদনে -
মা, কালের পরিক্রমায় কতো সুগন্ধি শিশি সুবাস ছুঁইয়েছে শরীরে -
মন ভরেনি।
.png)
আমি খুঁজে ফিরি তোমার বুকের মাঝে ওম জড়ানো প্রশান্তি মাখা সুবাসটুকু - যদি পারতেম শিশি হয়ে তাকে বন্দি করতে!
হারিয়ে ফেলেছি -
মা, আমি হারিয়ে ফেলেছি।
আমার, শৈশবের ডানপিটে স্বভাব আর বাড়াবাড়িরকম যন্ত্রণায়, সঙ্গীত রেওয়াজে ইতি টানলে তুমি।
পড়াশোনায় ইতি টানতে হয়েছে তারও আগে -
আক্ষেপ ছিলো না তোমার; সন্তানদের বেড়ে ওঠার মাঝেই যেন তোমার পূর্ণতাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলে তুমি -
মাঝেসাঝে বাবার গানে গলা মিলিয়ে তুমি যুগলবন্দি হতে -
তুমি চলে গেছো, তবু তোমার ফেলে যাওয়া সেই গান এখনো গুনগুনিয়ে কানে বেজে চলে
- ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে…’
তোমারও কি মনে পড়ে, মা?
মা, মনে পড়ে?
বড় দু’ভাই-বোন তখন কিন্ডারগার্টেনে; ছুটির পর টিফিন নিয়ে ফেরে।
দেখে ভারি ঈর্ষা হয় আমার।
বাবার ডিজাইনের মোটা বইগুলো বগলে ভরে ইস্কুলে যাওয়ার কী শখ!
বাধ্য হয়ে ইস্কুলের খাতায় নাম লেখালে আমার।
শুরু হলো হাতে খড়ি, তোমারই হাতে, গল্পোচ্ছলে, ছড়ার ছন্দে -
লেখাপড়ায় বরাবরই সাদামাটা আমি -
সব বিষয়ে ভালো নম্বর জুটে না।
পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া খাতাগুলোয় বাবার স্বাক্ষর নিই -
দুর্বল খাতায় বাবার অগোচরে তুমিই ভরসা -
জানো মা, তোমার নাতনি নুযহাতও এমনই -
বেশ উচুঁ নম্বর পায় ও ।
অকাস্মাৎ যদি কোন বিষয়ে আশি‘র নিচে পেয়ে বসে, রেজাল্ট শীট স্বাক্ষর করাতে আমার দ্বারস্থ হয় -
ওর মুখের মাঝে আমি তোমার অবয়ব দেখতে পাই -
তুমি যেন মিটমিটিয়ে হাসছো আর বলছো- ‘দেখে নিও ও ঠিকই ভালো করবে।’
এমনই আরো কতো হাজার মৃত্যুহীন স্মৃতির ভেতরে বেঁচে আছো মা তুমি, অপরূপ সাজে -
পাতার পর পাতা লিখে চললে কাগজ ফুরোবে, স্মৃতি ফুরোবে না।
মা -
নিশুতি রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ে।
কখনো ঘুম আমার দু’চোখের সাথে লুকোচুরি খেলে।
শোবার ঘরের জানালা দিয়ে আকাশ পানে তাকিয়ে থাকি-
আঁধার সাঁতরে ছুটে চলে তুলো মেঘের ভেলা!
ওরা চলতে চলতে নানান রূপ নেয়!
সত্যি বলছি মা, কখনো মনে হয় মেঘের আাড়ালে আবছাভাবে তোমাকেই যেন দেখতে পাই।
হ্যাঁ তোমাকেই -
তারার আলোয় সন্তর্পনে খুঁজে ফিরছো আমাদের -
দু’চোখ জুড়ে নামে বরষার ধারা -
কান্না চাপার কি তীব্র প্রচেষ্টা আমার; পাছে চোখের ভারী জলের আড়ালে তুমি আবছা হয়ে যাও আরও।
হার মানি আমি।
চোখের জল শুকিয়ে আসে; বুকের ভেতরে কান্না থামে না।
মা -
আজকের যে ‘আমি’ সামাজিক বলয়ে-দৈনন্দিন জীবন যাপনে একটা অবস্থান করে নেওয়ার চেষ্টায় অবিরাম সংগ্রামরত, সেতো আমার ‘আমি’ নই।
তোমার বুকের মাঝে ছোট্ট পৃথিবীতে তোমার গড়া সেই ‘আমি’।
মা -
আর কোন পরিচয় চাই না আমার।
আমার সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচয় - আমি তোমার সন্তান।
লেখক : যুলকারনাইন সবিহ সুমন, ছড়াকার