ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ স্বাস্থ্যকথা ]

বাবুর পেটে গ্যাস হলে গ্ৰাইপ ওয়াটার খাওয়ানো যাবে কি

ডাঃ অমৃত লাল হালদার 
প্রকাশিত: ১১:১৭, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাবুর পেটে গ্যাস হলে গ্ৰাইপ ওয়াটার খাওয়ানো যাবে কি
ডাঃ অমৃত লাল হালদার  নবজাতক ও শিশু বিশেষজ্ঞ, সহযোগী অধ্যাপক  বারডেম মহিলা ও শিশু হাসপাতাল, সেগুনবাগিচা, ঢাকা 

গ্রাইপ ওয়াটার নিয়ে এই কনফিউশনটা খুব কমন, বিশেষ করে বাংলাদেশে। ডাক্তাররা মানা করেন কারণ উপকারের প্রমাণ নেই, কিন্তু ঝুঁকি আছে।

"স্যার, বাচ্চা গ্যাসে কাঁদছে, পেট ব্যথা! একটু গ্রাইপ ওয়াটার দেয়া যাবে?" - এই প্রশ্নটা আমি রোজ শুনি। গ্রাইপ ওয়াটার নিয়ে কনফিউশন? খাওয়াবেন ? নাকি না?  অনেকে ভাবেন এটা গ্যাসের ওষুধ। আসলে এটা কোন ওষুধই না, একটা সাপ্লিমেন্ট।

গ্রাইপ ওয়াটার আসলে কী?

Advertisement

এটা কোনো ওষুধ না, এটা একটা সাপ্লিমেন্ট। কোম্পানি ভেদে উপাদান আলাদা। সাধারণত থাকে - সোডিয়াম বাইকার্বোনেট, ডিল অয়েল, মৌরি, আদা, চিনি, কখনো ক্যামোমাইল। আগের দিনের ফর্মুলায় অ্যালকোহল থাকতো ৯% পর্যন্ত, এখন বেশিরভাগ ব্র্যান্ড অ্যালকোহল-ফ্রি দাবি করে। সমস্যা হলো এটা ড্রাগ হিসেবে রেগুলেটেড না, তাই এক বোতলে কী পরিমাণে কী আছে, তার কোনো স্ট্যান্ডার্ড নেই।

১৮৫১ সালে প্রথম বানানো হয়, তখন ৯% পর্যন্ত অ্যালকোহল থাকতো। এখনকার বোতলে থাকে সোডিয়াম বাইকার্বোনেট, ডিল অয়েল, মৌরি, আদা, চিনি, কখনো ক্যামোমাইল। FDA, WHO, DGDA কেউই এটাকে ওষুধ হিসেবে অনুমোদন দেয় না।

ডাক্তাররা কেন মানা করেন? পাঁচটি বড় কারণ-

১. কোনো প্রমাণিত কাজ নেই: আমেরিকান একাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্স, WHO, ইন্ডিয়ান একাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্স - কেউই কলিক বা গ্যাসের জন্য গ্রাইপ ওয়াটার রেকমেন্ড করে না। কলিক এমনিতেই ৩-৪ মাসের মধ্যে নিজে থেকে কমে যায়, তাই গ্রাইপ ওয়াটার দেয়ার পর বাচ্চা চুপ করলে মনে হয় ওটার জন্যই কমেছে।

২. আসল কারণটা ঢাকা পড়ে যায়: অতিরিক্ত কান্নার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে - বুকের দুধ ঠিকমতো না পাওয়া, এয়ার গিলে ফেলা, গরুর দুধের প্রোটিনে অ্যালার্জি, গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স। গ্রাইপ ওয়াটার দিলে এই কারণগুলোর খোঁজ করা হয় না।

৩. WHO এর ৬ মাস এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং নিয়ম ভাঙে: ৬ মাস পর্যন্ত বাচ্চার পানি পর্যন্ত দরকার নেই। গ্রাইপ ওয়াটার দিলে পেট ভরে যায়, বুকের দুধ খাওয়া কমে যায়, মায়ের দুধ তৈরিও কমে যায়।

৪. রেগুলেশন নেই, দূষণের ঝুঁকি: FDA আগে কয়েকটি ব্র্যান্ডে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক দূষণ পেয়ে বাজার থেকে তুলে নিয়েছিল। বাংলাদেশেও DGDA অনুমোদিত ওষুধের তালিকায় বেশিরভাগ গ্রাইপ ওয়াটার নেই।

৫. উপাদানগুলোই সমস্যা করতে পারে।

সাইড ইফেক্ট আছে কি? 
হ্যাঁ, আছে। সবার হয় না, কিন্তু হতে পারে:

• পেটের সমস্যা: সোডিয়াম বাইকার্বোনেট পাকস্থলীর স্বাভাবিক অ্যাসিড নষ্ট করে দেয়। এতে দুধ হজমে সমস্যা, বমি, পেট ফাঁপা বাড়তে পারে। বেশি হলে রক্তে pH বেড়ে গিয়ে alkalosis, ইলেক্ট্রোলাইট ইমব্যালেন্স হতে পারে। 

• অ্যালার্জি ও অস্বস্তি: ডিল, মৌরি, চ্যামোমাইলে অনেক বাচ্চার অ্যালার্জি, র‍্যাশ, ডায়রিয়া হয়। 

• চিনির সমস্যা: মিষ্টি স্বাদের জন্য প্রচুর চিনি দেয়া হয়। এতে ছোট বয়সে মুখে ফাংগাল ইনফেকশন, পরে দাঁতের ক্ষয়, আর ঘন ঘন ক্ষুধা নষ্ট হওয়া। 

• বুকের দুধে ব্যাঘাত ও পুষ্টি কমে যাওয়া: বিশেষ করে ১ মাসের কম বয়সী বা প্রিম্যাচিউর বাচ্চার জন্য ঝুঁকি বেশি। 

• ঘুম ঘুম ভাব: কিছু বাচ্চা মিষ্টি বা ভেষজ উপাদানে সাময়িক ঝিমিয়ে পড়ে, বাবা-মা ভাবেন শান্ত হয়েছে, আসলে এটা উপকার না।  

তাহলে অনেকেই উপকার পাচ্ছে কেন বলে?
তিনটি কারণে এমন মনে হয়:

১. মিষ্টি স্বাদ বাচ্চার sucking reflex কে সাময়িক শান্ত করে।

২. ওষুধ খাওয়ানোর সময় বাচ্চাকে কোলে নিয়ে ঢেকুর তোলানো হয়, পা ভাঁজ করে মালিশ করা হয় - এই কাজগুলোতেই আসলে আরাম হয়।

৩. কলিকের কান্না এমনিতেই দিনের একটা সময়ে হয় আর নিজে থেকে থামে। যে কোনো কিছু দিলেই মনে হবে ওটাই কাজ করেছে।

বদলে কী করবেন?

যদি বাচ্চা অতিরিক্ত মোচড়ায় বা কাঁদে:
• খাওয়ানোর পর ২০-৩০ মিনিট কাঁধে নিয়ে ভালো করে ঢেকুর তোলান 
• বাইসাইকেল লেগ এক্সারসাইজ, পেটে হালকা গরম সেঁক ও ক্লকওয়াইজ মালিশ 
• মা অতিরিক্ত গরুর দুধ, অতিরিক্ত চা-কফি খাচ্ছেন কি না দেখা 
• অতিরিক্ত কান্না, সাথে বমি, ওজন না বাড়া, রক্তমিশ্রিত পায়খানা, জ্বর থাকলে সেটা আর সাধারণ কলিক না - দ্রুত শিশু বিশেষজ্ঞকে দেখান।

আসলে গ্রাইপ ওয়াটার কোনো রোগ সারায় না, শুধু মিষ্টি দিয়ে কান্না ঢেকে রাখে, আর তাতে আসল কারণটা খুঁজতে দেরি হয়।

লেখক : ডাঃ অমৃত লাল হালদার 
নবজাতক ও শিশু বিশেষজ্ঞ, সহযোগী অধ্যাপক 
বারডেম মহিলা ও শিশু হাসপাতাল, সেগুনবাগিচা, ঢাকা 
সিরিয়াল : ০১৬৩৬৬৯২২৯৮

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস এম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!