পাইপলাইনে ক্রিকেটার সঙ্কট!
দেশে চলছে বন্যা। অনেক জেলায় নতুন রেকর্ড গড়া চলমান বন্যার মাঝে মন খারাপ হওয়ার মতো আরো একটি খবর সবার মনের মধ্যে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে। তাহলো ডেঙ্গু।
প্রায় ভয়াবহ আকারে রূপ নেয়া ডেঙ্গুতে মৃত্যুর খবর আসেছে প্রতিদিনই। তাই বাংলাদেশ এখন মন খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। এই মন খারাপ হওয়া খবরের মধ্যে আরও একটি মন খারাপের খবরের শিরোনাম জন্ম দিলো বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। বিশ্বকাপ শেষে প্রথম এসাইমেন্টে শ্রীলঙ্কায় গিয়ে চরম ব্যর্থ হয়েছে টাইগাররা। ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং তিন বিভাগে খুজে পাওয়া যায়নি টাইগারদের। যার চূড়ান্ত ফল তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ ৩-০ তে পরাজয়।
বন্যা ও ডেঙ্গুর খবরের মাঝে এই খবর হয়তো অনেকটা আড়ালে পড়ে গেছে। তবে এই খবর আড়ালে পড়ে গেলেও একটা সত্য আমাদের সামনে এসেছে নতুন করে। যা আশঙ্কা করা হচ্ছিল। অবশেষে সেই আশঙ্কাই সত্যি প্রামাণিত হলো। বাংলাদেশের প্রধান পাঁচজন ক্রিকেটার মাশরাফি, সাকিব, মুশফিক, তামিম ও মাহমুদুল্লাহ অবসর নিলে অনেকটা সঙ্কটে পড়বে দেশের ক্রিকেট। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। এক সাথে পাঁচ ক্রিকেটার নয়, মাত্র দুইজন ক্রিকেটার এবার শ্রীলঙ্কা সফরে যায়নি, এতেই ফুটে উঠেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের আসল চিত্র। ইনজুরি কারণে শ্রীলঙ্কা যাননি নিয়মিত অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। আর বিশ্বকাপে দুর্দান্ত খেলা সাকিব আল হাসান এই সিরিজে নিয়েছেন বিশ্রাম। শুধু এই দুজনের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশ যা খেলেছে তা এক কথায় করুণ। লজ্জাজনকভাবে সিরিজ হেরেছে টাইগাররা। তাদের বিকল্প হিসেবে যারা খেলেছেন তারাও নিজেদের প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের পাইপলাইন নিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই আর কিছুদিন পর এই পাঁচজন ক্রিকেটার বিদায় নেবেন। তাই প্রশ্ন হলো তাদের বিদায়ের পর কি হবে দেশের ক্রিকেটের। বিশেষ করে ভবিষ্যত।
.png)
বাস্তবতা হলো বাংলাদেশের ক্রিকেটে এখন পাইপলাইনে মানসম্পন্ন পর্যাপ্ত ক্রিকেটার নেই। যা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জন্য একটা হুমকি। এ বিষয় নিয়ে আলোচনা বর্তমান সময়ে একটি অতি কমন বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আলোচনাটা কতটুকু প্রাসঙ্গিক তা নিয়ে হয়তো কারো দ্বিমত থাকতে পারে তবে শ্রীলঙ্কা সফরের পর তা আর একেবারে অপ্রাসঙ্গিক নয় প্রসঙ্গটি। বরং বিষয়টি দেশের ভবিষ্যৎ ক্রিকেটের স্বার্থের সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। আর ভবিষ্যৎ বিবেচনায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এবার ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে এই বিষয়টির উপর একটু আলোকপাত করা যাক।
একটা দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সে দেশের উঠতি ক্রিকেটারদের পাইপলাইন কতটা শক্তিশালী বা সমৃদ্ধ তার উপর। পাইপলাইনের উপর নির্ভর করে তারা তাদের ভবিষ্যৎ ক্রিকেট নিয়ে কতটা ভাবছে। আগামীতে সে দেশ ক্রিকেট বিশ্বে কতটা রাজত্ব করবে তারও পূর্বাভাস পাওয়ার সঙ্কেতের নাম ‘পাইপলাইন’। এ কারণে দেখা যায় যেসব ক্রিকেট দল প্রভাবশালী তারা দীর্ঘদিন আগে থেকেই তাদের পাইপলাইন নিয়ে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। ক্রিকেটের পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ডের দিকে দৃষ্টিপাত করলে পরিস্কার বুঝা যায় তারা পাইপালাইন নিয়ে কতটা সচেতন। সচেতন বলেই দীর্ঘদিন ধরে ক্রিকেট বিশ্বে তাদের রাজত্ব চলমান। পাইপলাইনকে কাজে লাগিয়ে এর ফলাফলও তারা পেয়ে যায় প্রত্যাশা অনুযায়ী। শুধু ক্রিকেট নয়, যেকোন খেলাধূলার ক্ষেত্রে পাইপলাইনে কি পরিমাণ খেলোয়াড় আছে তা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ প্রথম ওয়ানডে খেলে ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যাত্রা শুরু করে। এর প্রায় চৌদ্দ বছর পর ২০০০ সালে টেস্ট ময়দানে পর্দাপন টাইগারদের। ওয়ানডের হিসেবে সময়টা ৩৩ বছর। সময়ের হিসেবে কিন্তু কম নয়। তবে টেস্টের হিসেবে প্রায় ১৯ বছর। এখন প্রশ্ন হলো এই সময়ে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশ কি তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী নতুন ক্রিকেটার উপহার দিতে পেরেছে? পারলেও কতটা সফল বাংলাদেশ? এর উত্তর অবশ্য মোটা দাগে দেয়া কঠিন। তবে বাস্তবতা হলো ১৯৮৬ সালে ওয়ানডে খেলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যাত্রা শুরুর পর থেকে নিয়মিত ভাবেই নতুন নতুন ক্রিকেটার এসেছে। এবং এখনও আসছে নতুন নতুন ক্রিকেটার। তবে প্রসঙ্গটা অন্য জায়গায়। প্রসঙ্গটা মানসম্পন্ন ক্রিকেটারের বিষয়ে। ১৯৮৬ সালের পর ২০০০ সাল পর্যন্ত যে পরিমাণ ক্রিকেটার এসেছে তা ছিল সেই সময়ের বিবেচনায় প্রত্যাশিত। নবীন একটা দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে সে সময় প্রতিনিয়ত শিখেছে বাংলাদেশ। সে সময় ক্রিকেটার পাওয়া নিয়ে অথ্যাৎ জাতীয় দল গঠন নিয়ে কখনো সেভাবে ভাবতে হয়নি নির্বাচকদের। তবে ধীরে ধীরে সেই অবস্থা থেকে মনে হয় কিছুটা সরতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু টেস্ট ট্যাস্টাস পাওয়ার পর সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সেই অর্থে টেস্ট ক্রিকেটার উঠে আসেনি। এখন প্রত্যাশা অনুযায়ী ক্রিকেটার পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটে। ১৯ বছরের পথ চলায় যা পর্যাপ্ত নয়। আর বর্তমান সময়ে, বিশেষ করে গত দুই তিন বছর ধরে যা অপর্যাপ্ত। টেস্ট অঙ্গনে নতুন ক্রিকেটারদের ঘাটতির কারণ কি? দুই একটা সিরিজে নতুন ক্রিকেটারদের সুযোগ দিলেও তা কাজে লাগিয়ে দলে নিয়মিত হতে পারছেন না। এই সঙ্কট যে শুধু টেস্টে তা কিন্তু নয়, ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটেও প্রত্যাশা অনুযায়ী ক্রিকেটার নেই। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে, টি-টোয়েন্টি মানের ক্রিকেটারের বড় অভাব। মাঠের পরিংখ্যানই এর প্রমাণপত্র।
এখন একটু আলোচনা করা যাক, পাইপলাইন আসলে কি? পাইপলাইনের কাজটা কেমন? পাইপলাইন বলতে মূলত সে দেশের অনূর্ধ্ব-১৯ ও ‘এ’ দলকে বুঝায়। যারা সময়ের সাথে সাথে নিজেদের তৈরি করে হয়ে উঠেন জাতীয় দলের সম্ভাব্য প্রতিনিধি। যাদের উপর দায়িত্ব বর্তায় জাতীয় দলের। সে হিসেবে বাংলাদেশেও রয়েছে অনূর্ধ্ব-১৯ ও ‘এ’ দল। তবে বর্তমানে বাংলাদেশে সে অর্থে কোনো ‘এ’ নেই। কয়েক বছর আগে ‘এ’ দল থাকলেও এখন ‘এ’ দলের বিকল্প হিসেবে আছে হাই-পারফরম্যান্স দল। যাকে ‘এ’ দল হিসেবে গন্য করা হয়। অনূর্ধ্ব-১৯ আর ‘এ’ দল বিবেচনায় বাংলাদেশের পাইপলাইনে অনেক ক্রিকেটার আছেন। কিন্তু তা কোনভাবেই সমৃদ্ধ বলা যাবে না। সম্প্রতি দেশের মাটিতে আফগান ‘এ’ দলের সঙ্গে সিরিজ ড্র বড় উদাহরণ।
হাই-পারফরম্যান্স দলের আগে রয়েছে অনূর্ধ্ব-১৯ দল। যাদের ভাবা হয় আগামীর ‘এ’ দল বা জাতীয় দলের সম্ভাব্য ক্রিকেটার। এমনও একটি দল রয়েছে বাংলাদেশে। কিন্তু তাদের পারফরম্যান্সও আহামরি কিছু নয়। তাই যারা হবেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ কাণ্ডারি তাদের পারফরম্যান্স যদি ভাল না হয় তবে তা শঙ্কার কারণ। তাই সম্প্রতি আফগানদের বিপক্ষে ‘এ’ দলের এমন পারফরম্যান্সের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বোর্ডের উচিত এখনই হাই-পারফরম্যান্স ও অনূর্ধ্ব-১৯ দলকে নিয়ে বিশেষ ভাবে কাজ করা। কারণ তারাই দেশের ভবিষ্যৎ ক্রিকেটার।
ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর