বাঙালির বসন্ত ও ভালোবাসা
বসন্ত এলেই কেটে যায় শীতের জীর্ণতা। প্রকৃতিতে বয়ে যায় ফাগুন হাওয়া। নানা সুরে গান গায় কোকিল-ময়না। ভ্রমরের খেলা আর গাছে গেছে দোল খায় পলাশ-শিমুলের রঙিন ভালোবাসা। এসব কারণেই ফাগুন বাঙালির কাছে প্রিয়। ভালোবাসার। এমন ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়েছিলেন প্রেম ও বিরহের কবি কাজী নজরুল ইসলামও। তিনি লিখেছিলেন- এলো বনান্তে পাগল বসন্ত। বনে বনে মনে মনে রং সে ছড়ায় রে, চঞ্চল তরুণ দুরন্ত...।
আজ পয়লা ফাল্গুন। দিনটির আবেদন বাড়িয়ে দিয়েছে ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ বা ‘ভালোবাসা দিবস’। এমনিতেই বসন্তের প্রথম দিনটি পরিচিত ‘বাঙালির ভালোবাসার দিন’ হিসেবে। কয়েক বছর আগেও পয়লা ফাল্গুন ও পশ্চিমা রীতির ভ্যালেন্টাইন ডে পর পর দুটি দিনে উদযাপন করা হতো। বাংলা বর্ষপঞ্জিতে সংশোধনের পর থেকে ফাল্গুন মাসের প্রথম দিন ও ভ্যালেন্টাইনস ডে বা ভালোবাসা দিবস একইদিনে পড়ছে। দুটি দিন এক হওয়ায় আনন্দ উদযাপনেও ব্যাপক উৎসাহ বেড়েছে।
রাষ্ট্রের সঙ্গে জড়িত ঐতিহাসিক দিবসগুলোকে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সঙ্গে সমন্বয় করার জন্য বাংলা বর্ষপঞ্জি পরিবর্তন করা হয়েছিল খ্রিষ্টীয় ২০১৯ সাল অর্থাৎ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ থেকে। তাতে ১৯৫২ সালের মতো ২১ ফেব্রুয়ারি ৮ ফাল্গুনে এবং ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পয়লা পৌষেই সমন্বয় করা গেলেও পয়লা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবস হয়ে যায় একদিনে।
দেশজুড়ে পহেলা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবস এখন একইসঙ্গে উদযাপিত হচ্ছে। এ সময়ের বিশেষ পোশাকের আয়োজন থাকে। দেখা যায় বাসন্তী, হলুদ, সবুজ, লাল, কালো ও ক্যালেন্ডার প্রাধান্যে তৈরি হয় কুর্তা, শাড়ি, সালোয়ার কামিজ, পাঞ্জাবি ও ফতুয়া। দেখা যায় যুগলবন্দি পোশাকও। শিশুদের শরীরে থাকে রঙিন সালোয়ার কামিজ ও ফতুয়া। এসবই বাঙালির বাঙালিয়ানা আর ভালোবাসা।
আজ উৎসবে মেতেছেন নগরবাসী। ফুলের মঞ্জরিতে আবহমানকাল ধরে এই দিনটিতে বাঙালি তরুণ-তরুণীরা রঙিন সাজে সেজে আসছেন। আজ পহেলা ফাল্গুনের সুরেলা এ দিনে তরুণীরা খোঁপায় গাঁদা-পলাশ ফুলের মালা গুঁজে বাসন্তী রঙের শাড়ি পরেছেন। ছেলেরা পাঞ্জাবি-পায়জামা কিংবা ফতুয়ায় খুঁজে নিয়েছেন শাশ্বত বাঙালিয়ানা। পহেলা ফাল্গুনে ভিনদেশি ভ্যালেনটাইন দিবসটি এখন বাঙালির বসন্ত উৎসব উদযাপনের নতুন অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু তরুণ-তরুণী নয়, নানা বয়সের মানুষই ভালোবাসার এই দিনে একসঙ্গে সময় কাটান। দিনটি পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুষঙ্গ হলেও ভ্যালেন্টাইনস ডে বা ভালোবাসা দিবসে বাঙালি মনের ভালোবাসাও যেন পায় নতুন রূপ। আজকের এ ভালোবাসা শুধুই প্রেমিক আর প্রেমিকার জন্য নয়। মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রী, ভাইবোন, প্রিয় সন্তান-এমনকি বন্ধুর জন্যও ভালোবাসায় মুখ থাক এ দিনটি।