ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ ধর্ম ]

যে কারণে আদায় করবেন সাদাকাতুল ফিতর, জেনে নিন পদ্ধতি

আব্দুল গণী
প্রকাশিত: ১৪:১৫, ২১ এপ্রিল ২০২৩
যে কারণে আদায় করবেন সাদাকাতুল ফিতর, জেনে নিন পদ্ধতি
ছবি: প্রতীকী

পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন ধনীদের পাশাপাশি সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষেরাও যেনো খুশি থেকে বিরত না থাকে, তাই ইসলাম সাদাকাতুল ফিতরের সুযোগ করে দিয়েছে।

ফিতরা বা ফেতরা(فطرة) আররি শব্দ, যা ইসলামে জাকাতুল ফিতর (ফিতরের জাকাত) বা সাদাকাতুল ফিতর (ফিতরের সদকা) নামে পরিচিত।

সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা মুমিনের জন্য আল্লাহ কর্তৃক অত্যাবশ্যকীয় বিধান। আল্লাহ তাআলা বলেন-

Advertisement

قَدۡ اَفۡلَحَ مَنۡ تَزَکّٰی

অর্থ: ‘নিশ্চয়ই সাফল্য লাভ করবে সে, যে পরিশুদ্ধ হয়’ ৷ (সূরা: আলা, আয়াত: ১৪)

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন-

قَالَ فَرَضَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ مَنْ أَدَّاهَا قَبْلَ الصَّلَاةِ فَهِيَ زَكَاةٌ مَقْبُولَةٌ وَمَنْ أَدَّاهَا بَعْدَ الصَّلَاةِ فَهِيَ صَدَقَةٌ مِنَ الصَّدَقَاتِ

অর্থ: ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাদাকাতুল ফিতরকে অপরিহার্য করেছেন, অনর্থক অশালীন কথা ও কাজে রোজার যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণের জন্য এবং নিঃস্ব লোকের আহার যোগানোর জন্য।’ (আবু দাউদ ১৬০৯) 

হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী সাদাকাতুল ফিতর হচ্ছে- وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ ‘তুমাতুল্লিলমাসাকিন’ অর্থাৎ সমাজের অসহায়, দুস্থ-দরিদ্র, রিক্তহস্ত জনগোষ্ঠি যাতে বছরান্তে একটি দিন অন্তত খেয়ে-পরে আনন্দ উদযাপন করতে পারে।
 
ফিতরা আদায় করা ইসলামি বিধান মতে ওয়াজিব। হাদিস শরিফে সদকাতুল ফিতরকে কাফফারাতুন লিসসাওম, অর্থাৎ রোজা অবস্থায় অবচেতনভাবে যে ত্রুটিবিচ্যুতি হয়ে যায়, তার কাফফারা বা ক্ষতিপূরণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিটি সামর্থবান মানুষের ওপর ফিতরা ওয়াজিব। যে ব্যক্তির নিকট ঈদের দিন তার ও তার পরিবারের খাদ্য-খোরাক বিদ্যমান রয়েছে এবং সেই সঙ্গে ফিতরা দেওয়ার সামর্থ্য আছে তার জন্য আল্লাহ তাআলা ফিতরা ওয়াজিব করেছেন। অর্থাৎ কারোর কাছে একদিন ও এক রাতের খাদ্যের অতিরিক্ত পরিমাণ সম্পদ বিদ্যমান থাকলে তার নিজের ও পরিবারের সমস্ত সদস্যদের পক্ষ থেকে তাকে ফিতরা আদায় করে নিতে হবে। এমনকি ঈদের দিন সকালে যে শিশু ভূমিষ্ঠ হবে তারও সদাকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে।

বাড়ির কাজের লোক বা চাকর-চাকরানীদের জন্য ফিতরা দেওয়া বাড়ির মালিকের জন্য আবশ্যক নয়। তবে গরীব মানুষ হিসেবে ফিতরা দিলে সওয়াব পাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে মালিক নিজের ও নিজ পরিবারের যেভাবে ফিতরা দেবে সেভাবেই বাড়ির কর্মচারীদের ফিতরা দেবে।

ফিতরা আদায় করার উত্তম সময় হচ্ছে ঈদের নামাজ বের হওয়ার পূর্বক্ষণে। অর্থাৎ ফিতরা দিয়ে নামাজ পড়তে যাওয়া।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদের নামাজ আদায়ের পূর্বে ফিতরা আদায় করার আদেশ দিতেন। (সহি বুখারি : ১৫০৩)

ইবনে ওমর থেকে বর্ণিত, ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাকাতুল ফিতর আদায় করার আদেশ দেন লোকদের নামাজে বের হওয়ার পূর্বে।’ (বুখারি: ১৫০৯) তবে ফিতরা দেওয়ার সময় শুরু হয় রমজানের শেষ দিনে সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে। (সউদি ফাতাওয়া কমিটি ৯/৩৭৩)

অবশ্য কোনো কোনো সাহাবি থেকে ঈদের কয়েকদিন পূর্বেও ফিতরা আদায়ের কথা প্রমাণিত আছে। যেমন নাফে (রাহ.) বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) ঈদের দু’ একদিন পূর্বেই তা (ফিতরা) আদায় করে দিতেন। ((বুখারি: ১৫১১, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৬০৬)

আর নাফে (রাহ.) থেকে অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) ঈদের দু’ তিনদিন পূর্বে ফিতরা উসূলকারীর নিকট সদকাতুল ফিতর পাঠিয়ে দিতেন। (মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হাদিস : ৩১৬)

এর ভিত্তিতে আলেমরা বলেন, সদকাতুল ফিতর রমজানের শেষ দিকেই আদায় করা উচিত। এতে করে গরীব লোকদের জন্য ঈদের সময়ের প্রয়োজন পূরণেও সহায়তা হয়। আর রমজানের শুরুতে বা পূর্বে ফিতরা আদায় করলেও অধিকাংশ ফকীহগণের মতে তা আদায় হয়ে যায়। (আলবাহরুর রায়েক ২/২৫৫; ফাতাওয়া খানিয়া ১/২৩২; বাদায়েউস সানায়ে ২/২০৭; রদ্দুল মুহতার ২/৩৬৭; আলমুহীতুল বুরহানী ৩/৩৮৪; তাবয়ীনুল হাকায়েক ২/১৪২)

টাকা-পয়সা দ্বারা ফিতরা না দেওয়ার চেয়ে খাদ্যদ্রব্য দ্বারা ফিতরা দেওয়া উত্তম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে মুদ্রা হিসেবে দিনার এবং দিরহামের প্রচলন ছিল এবং সে কালেও ফকির ও মিসকিনদের তা প্রয়োজন হত। তা দ্বারা তারা জিনিস-পত্র ক্রয়-বিক্রয় করত। তা সত্ত্বেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুদ্রা দ্বারা ফিতরা নির্ধারণ না করে খাদ্য দ্রব্য দ্বারা নির্ধারণ করেছেন। হাদিস মতে, খাদ্যবস্তু দ্বারাই ফিতরা আদায় করা সুন্নাত। আর এটাই অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মত।

ইবনে উমর (রা.) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বীয় উম্মতের ক্রীতদাস ও স্বাধীন, নারী ও পুরুষ, ছোট ও বড় সকলের উপর মাথা পিছু এক ‘সা’ পরিমাণ খেজুর বা যব জাকাতুল ফিতরা হিসাবে ফরজ করেছেন এবং তা ঈদগাহের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার পূর্বেই আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন’। (বুখারি-মুসলিম, মিশকাত হা/১৮১৫)

তাই ফিতরা আদায় করতে হবে প্রত্যেকের জন্য মাথাপিছু এক ‘সা’ খাদ্যশস্য দিয়ে। ‘সা’ হচ্ছে তৎকালীন সময়ের এক ধরনের ওজন করার পাত্র। নবী করিম (স.) এর যুগের ‘সা’ হিসাবে এক ‘সা’ তে সবচেয়ে ভালো গম দুই কেজি চল্লিশ গ্রাম হয়। বিভিন্ন দ্রব্যের নিজস্ব ওজনের ভিত্তিতে ‘সা’ এর ওজন বিভিন্ন হয়। এক সা চাউল প্রায় দুই কেজি পাঁচশ গ্রাম হয়। তবে ওজন হিসাবে এক ‘সা’ গম, যব, ভুট্টা, খেজুর ইত্যাদি দুই কেজি দুইশ পঁচিশ গ্রামের কিছু এদিক সেদিক হয়ে থাকে। তাই সতর্কতা হিসেবে তিন কেজি নির্ধারণ করা ভালো।

উল্লেখ্য, কেউ ঈদের পরে ফিতরা দিলে সেটা সাধারণ দান হিসাবে গণ্য হবে এবং সে ফিতরার বিশেষ ফজিলত ও মর্যাদা হতে বঞ্চিত থাকবে। (আবু দাউদ, অধ্যায়: যাকাত, অনুচ্ছেদ: ফিতরের জাকাত)

ডেইলি-বাংলাদেশ/জিআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!