‘রামাদান’ শব্দটি আরবি ‘রাম্দ’ ধাতু থেকে উদ্ভূত। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে দহন, প্রজ্বলন, জ্বালানো বা পুড়িয়ে ভস্ম করে ফেলা। রমজান মাসে সিয়াম সাধনা তথা রোজা পালনের মাধ্যমে ধর্মপ্রাণ মানুষ নিজের সমুদয় জাগতিক কামনা-বাসনা পরিহার করে আত্মসংযম ও কৃচ্ছ্রপূর্ণ শান্তিময় জীবনযাপন করে এবং ষড়রিপুকে দমন করে আল্লাহর একনিষ্ঠ অনুগত বান্দা হওয়ার সামর্থ্য অর্জন করে।
মাহে রমজান মানুষের অভ্যন্তরীণ যাবতীয় অহংকার, কুপ্রবৃত্তি, নফসের দাসত্ব জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় বলে এ মহিমান্বিত মাসের আরবি নাম ‘রামাদান’।
.png)
আজ আরবি হিজরি সন ১৪৪৫ এর পয়লা রমজান। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের অমিয় বারতা নিয়ে আগমন করল মাহে রমজানুল মুবারক। পবিত্র কোরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে,
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا کُتِبَ عَلَیۡکُمُ الصِّیَامُ کَمَا کُتِبَ عَلَی الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِکُمۡ لَعَلَّکُمۡ تَتَّقُوۡنَ
উচ্চারণ: ‘ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূ কুতিবা ‘আলাইকুমসসিয়া-মু কামা-কুতিবা ‘আলাল্লাযীনা মিন কাবলিকুম লা‘আল্লাকুম তাত্তাকূন’।
অর্থ: ‘হে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ! তোমাদের পূর্ববতী লোকদের ন্যায় তোমাদের উপরও সিয়ামকে অপরিহার্য কর্তব্য রূপে নির্ধারণ করা হলো যেন তোমরা সংযমশীল হতে পারো’। (সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৩)
اَیَّامًا مَّعۡدُوۡدٰتٍ ؕ فَمَنۡ کَانَ مِنۡکُمۡ مَّرِیۡضًا اَوۡ عَلٰی سَفَرٍ فَعِدَّۃٌ مِّنۡ اَیَّامٍ اُخَرَ ؕ وَ عَلَی الَّذِیۡنَ یُطِیۡقُوۡنَہٗ فِدۡیَۃٌ طَعَامُ مِسۡکِیۡنٍ ؕ فَمَنۡ تَطَوَّعَ خَیۡرًا فَہُوَ خَیۡرٌ لَّہٗ ؕ وَ اَنۡ تَصُوۡمُوۡا خَیۡرٌ لَّکُمۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ
উচ্চারণ: ‘আইয়া-মাম্মা‘দূদা-তিন ফামান কা-না মিনকুম মারীদান আও ‘আলা-সাফারিন ফা‘ইদ্দাতুম মিন আইয়া-মিন উখারা ওয়া ‘আলাল্লাযীনা ইউতীকূনাহূ ফিদইয়াতুন তা‘আ-মু মিসকীনিন ফামান তাতাওওয়া‘আ খাইরান ফাহুওয়া খাইরুল্লাহূ ওয়া আন তাসূমূ খাইরুল্লাকুম ইন কুনতুম তা‘লামূন।
অর্থ: ‘ওটা নির্দিষ্ট কয়েক দিন। কিন্তু তোমাদের মধ্যে যে কেহ পীড়িত কিংবা প্রবাসী হয় তার জন্য অপর কোনো দিন হতে গণনা করবে, আর যারা ওতে অক্ষম তারা তৎপরিবর্তে একজন দরিদ্রকে আহার্য দান করবে। অতএব, যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় সৎ কাজ করে তার জন্য কল্যাণ এবং তোমরা যদি বুঝে থাক তাহলে সিয়াম পালনই তোমাদের জন্য কল্যাণকর’। (সূরা বাকারা, আয়াত: ১৮৪)
বিশ্বনবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় যাওয়ার পর দ্বিতীয় বছরে এ আয়াত নাজিল হয়। এর আগে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম আশুরা এবং আইয়ামে বিজ বা প্রতি চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখতেন।
রমজান মাসের ফজিলত সম্পর্কে বেশ কয়েকটি হাদিস রয়েছে। যেমন- তিরমিজি শরিফে আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহুর বরাতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, রমজান মাসের প্রথম রাতেই শয়তান ও দুষ্ট জিনদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করা হয় এবং এর একটি দরজাও তখন আর খোলা হয় না, খুলে দেওয়া হয় জান্নাতের দরজাগুলো এবং এর একটি দরজাও তখন আর বন্ধ করা হয় না। একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দিতে থাকেন, ‘হে কল্যাণ অন্বেষণকারী! অগ্রসর হও। হে পাপাসক্ত! বিরত হও। আর বহু মানুষকে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে এ মাসে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং প্রত্যেক রাতেই এরূপ হতে থাকে। হাদিসটি ইবনে মাজাহ শরিফেও বর্ণিত আছে। হজরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, হজরত সালমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর বরাতেও এ প্রসঙ্গে হাদিস বর্ণিত আছে।
তিরমিজি শরিফে আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহুর বরাতে আরো বর্ণিত আছে- তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ঈমানের সঙ্গে ও সাওয়াবের আশায় যে ব্যক্তি রমজান মাসের রোজা পালন করবে এবং (ইবাদাতের উদ্দেশ্যে) রাতে জেগে থাকবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেওয়া হয়। আর ঈমানের সঙ্গে ও সাওয়াবের আশায় যে ব্যক্তি লাইলাতুল কাদেরের (ইবাদাতের জন্য) রাতে জেগে থাকে, তার পূর্ববর্তী গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেওয়া হয়। হাদিসটি বুখারি, মুসলিম ও ইবনে মাজাহ শরিফেও বর্ণিত আছে।
রমজানের নামকরণের কারণ সম্পর্কে বিভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। অনেকে বলেছেন, এটি ‘রময’ শব্দ থেকে নিষ্পন্ন, যার অর্থ, ভীষণ তাপ ও প্রচণ্ড গরম। যে বছর এই মাসের রোজা শুরু হয়েছিল, হয়তো সে বছর এই মাসটি এসেছিল প্রচণ্ড গরমের সময়, তাই এর নাম রাখা হয়েছে রমজান। অনেকের বক্তব্য, এর নামকরণের কারণ, এটি গুনাহকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভষ্ম করে দেয়। আবার অনেকে বলেন, রমজান আল্লাহ তাআলার সুমহান নামগুলোর একটি।