জুমার দিনে গুরুত্বপূর্ণ ১০ আমল
ইসলামে জুমার দিন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। সপ্তাহের অন্য দিনের তুলনায় শুক্রবারের কিছু বিশেষ আমল রয়েছে, যেগুলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও সহিহ হাদিসে গুরুত্বের সঙ্গে বর্ণিত হয়েছে। এদিন গোসল করা, উত্তম পোশাক পরা, সুগন্ধি ব্যবহার, দ্রুত মসজিদে যাওয়া, মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা, বেশি বেশি দরুদ পড়া, সূরা কাহফ তিলাওয়াত এবং দোয়া কবুলের বিশেষ সময় খুঁজে নেওয়া অন্যতম আমল।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আজান দেওয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে দ্রুত অগ্রসর হও এবং বেচাকেনা ছেড়ে দাও। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা জানতে।’ (সূরা আল-জুমুআহ, আয়াত ৯)
শুক্রবারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু আমল হলো:
.png)
১. জুমার দিন গোসল করা
শুক্রবারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ হলো গোসল করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন জুমার নামাজে আসে, সে যেন গোসল করে।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
জুমার দিনের গোসল শুধু পরিচ্ছন্নতার বিষয় নয়, বরং এটি ইবাদতের প্রস্তুতিরও অংশ। তাই জুমার নামাজের আগে শরীর পরিষ্কার করে গোসল করা, দাঁত পরিষ্কার করা এবং পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা উত্তম।
২. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর পোশাক পরা
জুমার দিন মুসল্লিরা যেন পরিপাটি হয়ে মসজিদে যান, ইসলাম সে বিষয়ে উৎসাহ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে সাহাবিরা জুমার দিন নিজেদের সর্বোত্তম পোশাক পরার চেষ্টা করতেন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘প্রত্যেক মসজিদে তোমরা তোমাদের সৌন্দর্য গ্রহণ করো।’ (সূরা আল-আরাফ, আয়াত ৩১)
তাই জুমার দিন পরিষ্কার পোশাক পরা, শরীর ও পোশাকে দুর্গন্ধ না থাকা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সুগন্ধি ব্যবহার করা উত্তম।
৩. আগে মসজিদে যাওয়া
জুমার দিনের গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলোর একটি হলো সময়ের আগে মসজিদে পৌঁছানো। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন প্রথম সময়ে মসজিদে যায়, সে যেন একটি উট কোরবানি করার সমপরিমাণ সওয়াব পায়। এরপর যে যায়, তার জন্য গরু, তারপর মেষ, তারপর মুরগি এবং সবশেষে ডিম সদকা করার মতো সওয়াবের কথা হাদিসে এসেছে। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, জুমার নামাজের জন্য যত আগে মসজিদে যাওয়া যায়, তত বেশি ফজিলত অর্জনের সুযোগ রয়েছে।
৪. জুমার খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা
খুতবা জুমার নামাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খুতবার সময় কথা বলা, অন্যের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ইশারা করা কিংবা মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকা থেকে বিরত থাকা উচিত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তুমি যদি তোমার সঙ্গীকে বলো, চুপ করো, অথচ ইমাম খুতবা দিচ্ছেন, তাহলে তুমি অনর্থক কথা বলেছ।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
তাই খুতবা শুরু হলে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে তা শোনা উচিত। খুতবার মাধ্যমে ঈমান, তাকওয়া, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়।
৫. জুমার নামাজ আদায় করা
জুমার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো জুমার নামাজ। প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ ও শরিয়তসম্মতভাবে জুমা আদায়ে সক্ষম মুসলিম পুরুষের জন্য জুমার নামাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আজান দেওয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে দ্রুত অগ্রসর হও এবং বেচাকেনা ছেড়ে দাও।’ (সূরা আল-জুমুআহ, আয়াত ৯)
এ আয়াত জুমার সময় দুনিয়াবি ব্যস্ততা ছেড়ে আল্লাহর ইবাদতে মনোনিবেশ করার নির্দেশ দেয়।
৬. বেশি বেশি দরুদ শরিফ পড়া
শুক্রবার বেশি বেশি দরুদ পড়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো জুমার দিন। তাই এদিন তোমরা আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো।’ (সুনান আবু দাউদ)
তাই জুমার দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সুযোগ পেলেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করা যেতে পারে।
দরুদের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলো দরুদে ইবরাহিম, যা আমরা নামাজের শেষ বৈঠকে পড়ি। এছাড়া সংক্ষিপ্তভাবে ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ বলা যায়।
৭. সূরা কাহফ তিলাওয়াত
জুমার দিনের আরেকটি প্রসিদ্ধ আমল হলো সূরা কাহফ তিলাওয়াত। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি জুমার দিন সূরা কাহফ পাঠ করবে, তার জন্য এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত নূর বা আলো থাকবে। (বায়হাকি, আল-মুস্তাদরাক)
সূরা কাহফে ঈমানের পরীক্ষা, সম্পদ ও ক্ষমতার পরীক্ষা, জ্ঞান এবং আল্লাহর ওপর নির্ভরতার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। তাই শুধু ফজিলতের আশায় নয়, অর্থ বুঝে সূরাটি পড়া এবং এর শিক্ষা জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
৮. বেশি বেশি দোয়া করা
শুক্রবারে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন বান্দা আল্লাহর কাছে দোয়া করলে তা কবুল হওয়ার বিশেষ আশা করা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জুমার দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, কোনো মুসলিম বান্দা সে সময়ে আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে আল্লাহ তাকে তা দেন। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
আলেমদের মধ্যে ওই সময়ের নির্দিষ্টতা নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। অনেক আলেম মনে করেন, আসরের পর সূর্যাস্তের আগের সময়টি বিশেষভাবে দোয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুক্রবার এ সময়ে বেশি বেশি ইস্তিগফার, দরুদ ও দোয়া করা যেতে পারে।
নিজের জন্য, পরিবার, দেশ ও সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য কল্যাণ কামনা করা উচিত।
৯. আল্লাহর জিকির ও ইস্তিগফার করা
শুক্রবারকে শুধু জুমার নামাজের দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো দিনটিকে আল্লাহর স্মরণে কাটানোর চেষ্টা করা উচিত।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অতঃপর নামাজ শেষ হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো। আর আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সূরা আল-জুমুআহ, আয়াত ১০)
সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং ইস্তিগফার পাঠের মাধ্যমে দিনটিকে জিকিরময় করা যায়।
১০. জুমার দিনের বিশেষ শিক্ষা জীবনে বাস্তবায়ন
জুমার দিন শুধু কিছু নির্দিষ্ট আমল করার দিন নয়। এটি আত্মশুদ্ধি ও নিজের জীবন পর্যালোচনারও সুযোগ। গত সপ্তাহে কী ভুল হয়েছে, কারও হক নষ্ট হয়েছে কি না, কোনো গুনাহ হয়েছে কি না, আল্লাহর ফরজ ইবাদতে ঘাটতি হয়েছে কি না, এসব নিয়ে আত্মসমালোচনা করা যেতে পারে।
জুমার দিন মুসলমানদের একত্রিত হওয়ার মাধ্যমে ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক বন্ধনও শক্তিশালী হয়। তাই প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, অসুস্থ ব্যক্তি ও অসহায় মানুষের খোঁজ নেওয়া এবং সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের সহযোগিতা করা উত্তম কাজ।
শুক্রবার একজন মুমিনের জন্য সাপ্তাহিক আত্মশুদ্ধির বিশেষ সুযোগ। গোসল থেকে শুরু করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, মসজিদে আগে যাওয়া, খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা, জুমার নামাজ আদায়, দরুদ পাঠ, সূরা কাহফ তিলাওয়াত, জিকির, ইস্তিগফার ও দোয়ার মাধ্যমে দিনটি অর্থবহ করা যায়।
তবে কোনো আমলের ফজিলত বর্ণনার ক্ষেত্রে সহিহ ও গ্রহণযোগ্য হাদিসের ওপর নির্ভর করা জরুরি। শুক্রবারের মূল উদ্দেশ্য শুধু বেশি বেশি আমল করা নয়, বরং আল্লাহর প্রতি আনুগত্য বাড়ানো এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবনকে সুন্দর করার চেষ্টা করা।