ঢাকা,  শুক্রবার   ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

ছেলের অপেক্ষায় দরজায় মা, বাবার পথ চেয়ে দুই শিশু

বেলাল রিজভী, মাদারীপুর
প্রকাশিত: ১১:৫২, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছেলের অপেক্ষায় দরজায় মা, বাবার পথ চেয়ে দুই শিশু
লিবিয়ায় নিখোঁজ ছেলে সাইদুল বেপারীর অপেক্ষায় তার মা সূর্যবান বেগম ও পরিবারের সদস্যরা। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ঘরের দরজা খুললেই হয়তো ছেলে ফিরে আসবে, প্রতিদিন এমন আশায় দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন সূর্যবান বেগম। কখনো দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকেন, কখনো পাশে বসে কাঁদেন। আবার কখনো নীরবে চোখের পানি মুছে মনে মনে প্রশ্ন করেন, ‘আমার ছেলে কোথায়, কেমন আছে, খেয়েছে তো?’

মাদারীপুর সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের ঘটকচর দত্তের হাট এলাকার এই মায়ের এমন অপেক্ষার দুই মাস পেরিয়ে গেলেও ছেলে সাইদুল বেপারীর (৩২) কোনো সন্ধান মেলেনি। ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেওয়া সাইদুল এখন লিবিয়ায় নিখোঁজ। ছেলের কোনো খোঁজ না পাওয়ায় উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তার পুরো পরিবারের।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সরেজমিন ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সাইদুলের বাড়িতে এক ধরনের নীরবতা। মায়ের চোখে ছেলের ফিরে আসার অপেক্ষা, আর তার স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তানের চোখে বাবাকে ফিরে পাওয়ার আকুতি।

Advertisement

সাইদুলের মা সূর্যবান বেগম জানান, ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে পরিবারের জমিজমা বিক্রি করার পাশাপাশি ধারদেনা ও সুদে টাকা নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা খরচ হলেও এখন পর্যন্ত ছেলের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে কোথায় আছে, কেমন আছে, কিছুই জানি না। প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকি। মনে হয়, এই বুঝি আমার ছেলে এসে ডাকবে। আমি আমার ছেলেকে বুকের মধ্যে ফিরে পেতে চাই।’

বাবার অপেক্ষায় দুই সন্তান

সাইদুলের অপেক্ষায় শুধু তার মা নন, স্ত্রী মেরি আক্তার ও দুই সন্তানও দিন গুনছে। চার বছরের মেয়ে বাবার সঙ্গে কথা বলার জন্য প্রায়ই মায়ের হাতে মোবাইল তুলে দেয়। কিন্তু ফোনের ওপাশে বাবার কণ্ঠ আর শোনা যায় না। বাবার কথা মনে পড়লেই কান্নায় ভেঙে পড়ে শিশুটি। আর ১১ মাসের ছেলে এখনো বুঝতেই পারে না কেন তার বাবা কাছে নেই।

কোলে ছোট সন্তানকে নিয়ে স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন মেরি আক্তার। দুই সন্তানকে কীভাবে বড় করবেন, সংসারের খরচ কীভাবে চালাবেন, এসব দুশ্চিন্তায় তার দিন কাটছে।

মেরি আক্তার বলেন, ‘আমার মেয়েটা প্রতিদিন আব্বুর সঙ্গে কথা বলতে চায়। মোবাইল সামনে এনে বলে, আব্বুর সঙ্গে কথা বলবে। কিন্তু আব্বু তো আর ফোনের ওপাশে নেই। আমি কীভাবে সন্তানদের মানুষ করব, বুঝতে পারি না।’

স্বজন জলিল বেপারীসহ কয়েকজন জানান, সাইদুল নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নিখোঁজ থাকায় নিত্যদিনের খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ সহযোগিতা করলে কোনোভাবে সংসার চলছে।

তাদের দাবি, সাইদুলের সন্ধান বের করার পাশাপাশি যারা তাকে বিদেশে পাঠানোর নামে প্রতারণা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

জমিজমা বিক্রি করে টাকা দেওয়ার অভিযোগ

সাইদুলের ভাই মাহিদুল বেপারীর অভিযোগ, ইতালি নেওয়ার কথা বলে দালালরা তার ভাইকে লিবিয়ায় নিয়ে যায় এবং পরে সেখানে একটি চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়। এরপর বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে পরিবারের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়।

তিনি বলেন, ‘দালাল আমাদের প্রলোভন দেখিয়ে আমার ভাইকে ইতালি নেওয়ার কথা বলে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। পরে মাফিয়ার কাছে বিক্রি করে দিয়ে আমাদের কাছ থেকে ৩৯ লাখ টাকা নিয়েছে। ঘরবাড়ি, জমিজমা ও সম্পত্তি সব বিক্রি করে দিয়েছি। এখন আমাদের থাকার মতো ঘরও নেই। আমরা দালালদের বিচার চাই এবং আমার ভাইয়ের সন্ধান চাই।’

স্থানীয় বাসিন্দা রুমিচা বেগম বলেন, স্থানীয়দের সহযোগিতায় কোনো দিন পরিবারটির খাবার জোটে, আবার কোনো দিন সহায়তা না পেলে শিশুদের নিয়ে অনাহারে থাকতে হয়। তিনি বলেন, ‘এভাবে মানুষ তাদের কতদিন সহযোগিতা করবে? সরকারের কাছে আমাদের দাবি, দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং সাইদুলকে খুঁজে বের করতে সহযোগিতা করা হোক।’

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘ওদের যা ছিল, অনেক কিছুই বিক্রি করে টাকা দেওয়া হয়েছে। এখন সম্পদও নেই, ছেলেটাও নেই। আমরা দিন এনে দিন খাই, তারপরও যতটুকু পারি পরিবারটিকে সহযোগিতা করি। আমরা চাই, সাইদুল কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে, তা দ্রুত জানা যাক।’

ইতালি নেওয়ার কথা বলে লিবিয়ায় পাঠানোর অভিযোগ

পরিবারের অভিযোগ, ঘটকচর এলাকার মৃত বাদশা ফরাজীর ছেলে আনোয়ার ফরাজী ২৩ লাখ টাকার বিনিময়ে সাইদুলকে ইতালি পাঠানোর প্রস্তাব দেন। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৫ সালের ৬ মে অগ্রিম ১২ লাখ টাকা নেওয়া হয়।

পরিবারের দাবি, ওই বছরের ৯ জুন শ্রীলঙ্কা ও দুবাই হয়ে ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে সাইদুলকে বিদেশে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে নেওয়ার পর একটি স্থানীয় চক্র তাকে জিম্মি করে বলে অভিযোগ স্বজনদের।

তাদের আরও দাবি, সাইদুলকে নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্টসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ধাপে ধাপে পরিবারের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা দেওয়ার পরও গত দুই মাস ধরে তার সঙ্গে পরিবারের কোনো যোগাযোগ নেই।

স্থানীয় সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পরিবার।

এরপর কোনো উপায় না পেয়ে গত ১১ সেপ্টেম্বর সাইদুলের বড় ভাই সামাদ হোসেন বাদী হয়ে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান অপরাধ প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনাল, মাদারীপুরে মামলা করেন। মামলায় আনোয়ার ফরাজী, শিল্পী আক্তার, বাদল জমাদ্দার, সাহেব আলী জমাদ্দার, মামুন বেপারী, ইভা বেগম ও ছলে বেগমসহ সাতজনকে আসামি করা হয়েছে।

টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার

তবে টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত আনোয়ার হোসেন ওরফে আনু। তিনি বলেন, ‘আমি তাদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নেইনি।’

অভিযুক্ত আনোয়ারের স্ত্রী শিল্পী আক্তারও পরিবারের দাবি করা টাকার পরিমাণ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তাদের কাছ থেকে ১৯ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।’

মাদারীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, সাইদুল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তার পরিবার আদালতে মামলা করেছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। আদালতের নির্দেশনা থানায় পৌঁছালে বিষয়টি নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হবে। এরপর তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: মাদারীপুর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!