ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ ধর্ম ]

মানুষের প্রতি ভালোবাসা ইসলামের শিক্ষা

মোহাম্মদ মামুন কবীর মোহাম্মদ মামুন কবীর
প্রকাশিত: ১৭:০০, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মানুষের প্রতি ভালোবাসা ইসলামের শিক্ষা
এআই দিয়ে তৈরি করা ছবি।

মানুষ সামাজিক জীব। একে অপরের ভালোবাসা, সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও মমতা ছাড়া সুন্দর সমাজ গড়ে ওঠে না। ইসলাম মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে মানুষের প্রতি দয়া, ভালোবাসা, ক্ষমা, সহযোগিতা ও কল্যাণকামিতার বহু নির্দেশনা রয়েছে। একজন মুমিনের ঈমান শুধু নামাজ, রোজা ও অন্যান্য ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের সঙ্গে তার আচরণও ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়।

ইসলাম এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেয়, যেখানে মানুষ পরস্পরের প্রতি দায়িত্বশীল হবে, অন্যের কষ্টে সহমর্মী হবে এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসবে।

মানুষকে সম্মান করার শিক্ষা

Advertisement

আল্লাহ তায়ালা মানুষকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর অবশ্যই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত ৭০)

এই আয়াত মানুষের মৌলিক মর্যাদার বিষয়টি স্পষ্ট করে। একজন মানুষ তার পরিচয়, সম্পদ কিংবা সামাজিক অবস্থানের কারণে নয়, বরং মানুষ হিসেবে সম্মানের অধিকারী। তাই কাউকে অপমান করা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা কিংবা অন্যায়ভাবে হেয় করা ইসলামের মানবিক শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সুরা হুজুরাতের ১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ মুমিনদের একে অপরকে উপহাস করতে নিষেধ করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে উপহাস না করে। কারণ যাকে উপহাস করা হচ্ছে, সে উপহাসকারীর চেয়ে উত্তম হতে পারে।

নিজের জন্য যা ভালোবাসি, অন্যের জন্যও

মানুষের প্রতি ভালোবাসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিসে। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা ভালোবাসে, তার ভাইয়ের জন্যও তা ভালোবাসে।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

এই হাদিস মানুষের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের একটি মৌলিক নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। আমরা নিজের জন্য সম্মান, নিরাপত্তা, সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য ও কল্যাণ চাই। একইভাবে অন্যের জন্যও এসব কামনা করা ইসলামের শিক্ষা।

কেউ বিপদে পড়লে তাকে নিয়ে হাসাহাসি না করে পাশে দাঁড়ানো, কেউ সাফল্য পেলে হিংসা না করে আনন্দিত হওয়া এবং অন্যের প্রয়োজনের সময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া এই শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ।

দয়া ও ভালোবাসা আল্লাহর রহমত পাওয়ার মাধ্যম

ইসলামে দয়ার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

অন্য একটি হাদিসে তিনি বলেছেন, ‘দয়ালুদের প্রতি পরম দয়ালু দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীর অধিবাসীদের প্রতি দয়া করো, তাহলে যিনি আকাশে আছেন তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (সুনান আবু দাউদ, জামে তিরমিজি)

অর্থাৎ মানুষের প্রতি দয়া করা শুধু সামাজিক সৌজন্য নয়; এটি আল্লাহর রহমত লাভের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একজন মুসলিমের হৃদয়ে মানুষের প্রতি মমতা থাকা উচিত।

প্রতিবেশীর প্রতি ভালোবাসা

ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

প্রতিবেশী অসুস্থ হলে তার খোঁজ নেওয়া, বিপদে সহযোগিতা করা, তার অধিকার নষ্ট না করা এবং নিজের আচরণে তাকে কষ্ট না দেওয়া ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

আজকের ব্যস্ত জীবনে একই ভবনে কিংবা একই এলাকায় বসবাস করেও অনেক মানুষ একে অপরের খোঁজ রাখেন না। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু প্রয়োজনের সময় নয়; বরং স্বাভাবিক সময়েও সৌহার্দ্য ও সহমর্মিতার ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে।

দুর্বল ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো

ইসলাম সমাজের দুর্বল মানুষের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এতিম, দরিদ্র, মিসকিন ও অসহায় মানুষের প্রতি সহানুভূতি দেখানোর নির্দেশ কোরআনে বারবার এসেছে।

সুরা আল-মাউন-এ আল্লাহ এমন ব্যক্তির সমালোচনা করেছেন, যে এতিমকে অবজ্ঞা করে এবং দরিদ্রকে খাবার দেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করে না।

অন্যদিকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি ও এতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারী জান্নাতে এভাবে থাকব’, এ কথা বলে তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙুলের দিকে ইঙ্গিত করেন। (সহিহ বুখারি)

এ থেকে বোঝা যায়, অসহায় মানুষের দায়িত্ব নেওয়া ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ।

ক্ষমা ও সহনশীলতা

মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভুল-বোঝাবুঝি, রাগ ও বিরোধ তৈরি হতে পারে। ইসলাম এসব পরিস্থিতিতে প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমা ও সংশোধনের পথ দেখিয়েছে।

আল্লাহ বলেন, ‘যারা রাগ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে, আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৪)

কাউকে ক্ষমা করা সবসময় সহজ নয়। কিন্তু একজন মুমিন নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে অন্যের ভুল ক্ষমা করার চেষ্টা করেন। এর মাধ্যমে শুধু একটি সম্পর্কই রক্ষা হয় না, সমাজেও শান্তি ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পায়।

কথাবার্তায়ও ভালোবাসার প্রকাশ

মানুষকে ভালোবাসার অন্যতম প্রকাশ হলো সুন্দরভাবে কথা বলা। একটি ভালো কথা যেমন মানুষের মনে আনন্দ সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি একটি কটু কথাও দীর্ঘদিনের জন্য কাউকে কষ্ট দিতে পারে।

কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলো।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত ৮৩)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

তাই মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় অপমান, বিদ্রূপ, গালাগাল কিংবা অশালীন ভাষা পরিহার করা উচিত। ভালোবাসাপূর্ণ সমাজ তৈরিতে সুন্দর কথার ভূমিকা অনেক।

ভালোবাসা মানে অন্যায়ের সমর্থন নয়

ইসলামের মানুষের প্রতি ভালোবাসা অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়ার শিক্ষা দেয় না। বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেয়। কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে। ন্যায়বিচার করো, এটিই তাকওয়ার নিকটতর।’ (সুরা আল-মায়িদা, আয়াত ৮)

অর্থাৎ কাউকে ভালোবাসা মানে তার অন্যায়কে সমর্থন করা নয়। বরং প্রকৃত কল্যাণকামিতা হলো মানুষকে অন্যায় থেকে দূরে রাখা এবং ন্যায়ের পথে উৎসাহিত করা।

ছোট ছোট কাজেও প্রকাশ পায় ভালোবাসা

মানুষের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের জন্য সবসময় বড় কিছু করার প্রয়োজন নেই। একজন ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া, অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজ নেওয়া, পথ হারানো মানুষকে পথ দেখানো, কারও বোঝা বহনে সাহায্য করা কিংবা দুঃখী মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়াও ভালোবাসার প্রকাশ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমার ভাইয়ের মুখের ওপর তোমার হাসিও সদকা।’ (জামে তিরমিজি)

অর্থাৎ একজন মানুষের প্রতি আন্তরিক হাসি ও সুন্দর আচরণও ইসলামে মূল্যবান।

ভালোবাসার সমাজ গড়ার দায়িত্ব সবার

একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ শুধু আইন-কানুন দিয়ে তৈরি হয় না। মানুষের হৃদয়ে দয়া, দায়িত্ববোধ ও পরস্পরের প্রতি সম্মান তৈরি হওয়া প্রয়োজন। পরিবার থেকেই এই শিক্ষা শুরু হতে পারে। সন্তানকে ছোটবেলা থেকে বড়দের সম্মান করা, ছোটদের স্নেহ করা, দরিদ্রকে সাহায্য করা এবং কারও প্রতি অন্যায় না করার শিক্ষা দিতে হবে।

ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের প্রতি ভালোবাসা হলো ঈমানের সৌন্দর্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। নামাজ মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে দেয়, আর মানুষের প্রতি দয়া ও ভালোবাসা সেই ঈমানের সামাজিক সৌন্দর্য প্রকাশ করে।

পবিত্র কোরআন ও হাদিসের শিক্ষা থেকে স্পষ্ট, মানুষের প্রতি ভালোবাসা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক আদর্শ। সম্মান, দয়া, ক্ষমা, সহযোগিতা, সুন্দর কথা এবং ন্যায়বিচারের মাধ্যমে এই ভালোবাসা প্রকাশ করতে হয়।

নিজের জন্য যে কল্যাণ কামনা করি, অন্যের জন্যও তা কামনা করা, মানুষের কষ্ট লাঘব করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের উপকারে এগিয়ে আসাই ইসলামের সৌন্দর্য। একজন মানুষ যখন অন্য মানুষের জন্য কল্যাণের কারণ হয়ে ওঠেন, তখন তার ব্যক্তিগত জীবন যেমন সুন্দর হয়, তেমনি পরিবার ও সমাজেও শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!