ঢাকা,  শুক্রবার   ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ জাতীয় ]

বাংলাদেশ পুনর্গঠনে ৩-আর কৌশল, জাতিসংঘে জানালেন তারেক রহমান

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:০৯, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশ পুনর্গঠনে ৩-আর কৌশল, জাতিসংঘে জানালেন তারেক রহমান
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের বক্তব্য দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের পুনর্গঠনে ‘৩-আর’ কৌশল গ্রহণের কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই কৌশলের তিনটি স্তম্ভ হলো রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন। দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়ন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন ও বৈশ্বিক শান্তির বিষয়েও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ বিতর্কে দেওয়া প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তারেক রহমান বাংলায় ভাষণ দেন। এটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তার প্রথম বক্তব্য।

ভাষণের শুরুতে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের স্মরণ করেন তিনি।

Advertisement

তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্ত হয়েছে এবং এর মধ্য দিয়ে দেড় দশকের বেশি সময়ের শাসন ও শোষণের অবসান ঘটেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গুম, হত্যাকাণ্ড, অপহরণ, দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থ পাচারের মতো পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ আবার গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের পর দেশকে পুনর্গঠনে সরকার ৩-আর কৌশল নিয়েছে।

শিল্প ও কর্মসংস্থানে গুরুত্ব

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সামনে এখন সম্ভাবনার বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। জনমিতিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার জন্য সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

দেশকে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগীদের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।

তারেক রহমান জানান, তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের স্টার্টআপ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সুযোগ তৈরি করতে চলতি অর্থবছরে ৫ কোটি মার্কিন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

নারীর শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের আর্থসামাজিক রূপান্তরের পরিকল্পনায় নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নগদ অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত নারীদের বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার কথাও ভাষণে তুলে ধরেন তিনি।

‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন’ চান প্রধানমন্ত্রী

তারেক রহমান বলেন, শুধু নির্বাচনী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করাই সরকারের লক্ষ্য নয়; অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল যেন দেশের প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের কাছে পৌঁছায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

এ জন্য অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের জন্য বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালুর কথা জানান তিনি। এর মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ড।

পরিবারের নারী প্রধানের নামে দেওয়া ‘ফ্যামিলি কার্ড’কে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। বিভিন্ন খাতে চালু করা কার্ডগুলোকে সমন্বিত করে ভবিষ্যতে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

যুদ্ধ বন্ধে সংলাপ ও কূটনীতির আহ্বান

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানবসৃষ্ট সংঘাত অস্থিরতা, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সংকট তৈরি করছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। যুদ্ধ ও সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ তৈরি করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তারেক রহমান বলেন, যেকোনো সংঘাত সংলাপ, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। রাষ্ট্রগুলোর দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থের সুরক্ষা, সম্মান ও মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশ সাধারণ ও পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

ফিলিস্তিনের পাশে থাকার ঘোষণা

ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ফিলিস্তিনি জনগণের বৈধ দাবির প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারকে বাংলাদেশ সমর্থন করে বলেও জানান তিনি।

রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইলেন

রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চাপ হিসেবে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নয় বছরের বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে বাংলাদেশ।

এর ফলে দেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও কারণ মিয়ানমারে। তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদ প্রত্যাবাসনকেই সংকটের একমাত্র সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত তাদের জন্য জীবন রক্ষাকারী মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে সংকটের স্থায়ী সমাধানে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ও কার্যকর সহযোগিতা চান তিনি।

জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের দাবি

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশ অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হলেও বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান খুবই কম বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

আসন্ন কপ-৩১ সম্মেলনে জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তার বিষয়ে আরও কার্যকর বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান জানান তিনি।

তারেক রহমান বলেন, আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্ন ও সৌর জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বন্যা ও খরা মোকাবিলায় সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচির কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ বাড়ানো ও বড় জলাধারের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণের লক্ষ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের কথাও ভাষণে তুলে ধরেন তিনি।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বৈষম্য না বাড়ানোর আহ্বান

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্বের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জীবপ্রযুক্তি ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

তবে আজকের ডিজিটাল বৈষম্য যেন আগামী দিনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বৈষম্যে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহারে জাতিসংঘের কার্যকর নীতিকাঠামো তৈরিরও আহ্বান জানান তিনি।

অভিবাসন ও স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ

বাংলাদেশ নিয়মিত, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসন নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ রক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রক্রিয়া টেকসই করতে অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তারেক রহমান।

বাণিজ্য সহজীকরণ, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

‘বাংলাদেশ ফার্স্ট: বাংলাদেশ ফর অল’

ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের লক্ষ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না।

রাজনৈতিক মত, ধর্ম বা জাতিগত পরিচয় নির্বিশেষে সবাই যাতে সমান অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করতে পারে, এমন সমৃদ্ধ, আত্মনির্ভর, কল্যাণমুখী ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

তিনি বলেন, তরুণরা যেন ভয় বা বাধা ছাড়াই স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পায়, নারীরা যেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে এবং প্রতিটি শিশু যেন নিজের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পায়, এমন বাংলাদেশ গড়তে চায় সরকার।

ভাষণের শেষদিকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট: বাংলাদেশ ফর অল’।

জাতিসংঘের শান্তি ও বিশ্বশান্তির লক্ষ্যে সংস্থাটির নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বক্তব্য শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী।

এটি ছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রথম ভাষণ। তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও একই মঞ্চ থেকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে বক্তব্য দিয়েছিলেন বলে ভাষণে স্মরণ করেন তিনি।

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের সভাপতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। ২০২৬ সালের ২ জুন তিনি এ পদে নির্বাচিত হন এবং ৮১তম অধিবেশন ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে শুরু হয়েছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!