ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ বিজ্ঞান বিস্ময় ]

কোমা- গুরুতর মস্তিষ্কীয় অস্বাভাবিকতার ফল

আল মামুন রিটন
প্রকাশিত: ১১:২৯, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কোমা- গুরুতর মস্তিষ্কীয় অস্বাভাবিকতার ফল
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোমাকে শুধু “ঘুমের মতো একটি অবস্থা” ভাবা ভুল। ঘুম একটি স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রিত শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। কোমা সাধারণত গুরুতর মস্তিষ্কীয় অস্বাভাবিকতার ফল।

আমরা যখন ঘুমিয়ে পড়ি, তখন আমাদের শরীর বিশ্রামে যায়। কিন্তু কমায় যাওয়া ঘুমের মতো স্বাভাবিক কোনো বিশ্রাম নয়। কোমা হলো এমন একটি গভীর অচেতন অবস্থা, যেখানে মানুষকে জাগানো যায় না এবং বাহ্যিক উদ্দীপনার প্রতি তার স্বাভাবিক সচেতন প্রতিক্রিয়া থাকে না। 

চোখ সাধারণত বন্ধ থাকে, ইচ্ছাকৃতভাবে কথা বলা বা নড়াচড়া করা সম্ভব হয় না। তবে কোমা মানেই মস্তিষ্ক সম্পূর্ণভাবে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে, এমন নয়। মস্তিষ্কের কিছু অংশ তখনও সক্রিয় থাকতে পারে এবং শরীরের মৌলিক অনেক কাজ চলতে থাকে।

Advertisement

What Does a Coma Feel Like? One Survivor's Story | URevolutionবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কোমাকে বোঝার কেন্দ্রে রয়েছে মস্তিষ্কের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। 
একটি হলো- 
সেরিব্রাল কর্টেক্স, যা চিন্তা, অনুভূতি, স্মৃতি, ভাষা ও সচেতন অভিজ্ঞতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। 
অন্যটি হলো- ব্রেনস্টেম এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত জাগ্রত অবস্থার নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়বিক ব্যবস্থা। সচেতন থাকার জন্য শুধু মস্তিষ্কের একটি অংশ সক্রিয় থাকলেই হয় না। 

বিভিন্ন স্নায়বিক নেটওয়ার্কের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ প্রয়োজন। গুরুতর আঘাত, স্ট্রোক, অক্সিজেনের অভাব, সংক্রমণ, বিষক্রিয়া, বিপাকীয় সমস্যা কিংবা মস্তিষ্কের অন্যান্য ক্ষতির কারণে এই ব্যবস্থাগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হলে কোমা সৃষ্টি হতে পারে।

এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। চোখ বন্ধ থাকা মানেই অচেতনতা নয়। ঘুমন্ত মানুষকে সাধারণত শব্দ বা স্পর্শের মাধ্যমে জাগানো যায়। কিন্তু কোমায় থাকা ব্যক্তিকে সাধারণ উদ্দীপনা দিয়ে জাগানো যায় না। 

আবার কোমা এবং ব্রেন ডেথও এক বিষয় নয়। ব্রেন ডেথ হলো মস্তিষ্কের সব কার্যক্রমের স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় অনুপস্থিতি, যার চিকিৎসাবিজ্ঞানে নির্দিষ্ট মানদণ্ড রয়েছে। কোমা অন্যদিকে একটি গভীর অচেতন অবস্থা, যার কারণ ও পরিণতি ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে।

  • তবে বিজ্ঞান যতটা পরিষ্কারভাবে কোমার শারীরবৃত্তীয় কারণ ব্যাখ্যা করতে পারে, একটি প্রশ্ন এখনো অনেক বেশি গভীর। একজন মানুষ যখন কোমায় থাকে, তখন তার নিজের ভেতরের অভিজ্ঞতা আসলে কেমন?

এখান থেকে আমরা দর্শনের অঞ্চলে প্রবেশ করি।।চেতনা সম্পর্কে দর্শনের অন্যতম মৌলিক প্রশ্ন হলো, মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক কার্যকলাপ কীভাবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। 

What is a Coma?: Cases and Conditions - Hello Doctor

আমরা আলো দেখি, শব্দ শুনি, ব্যথা অনুভব করি, নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকি। কিন্তু এই অভিজ্ঞতাগুলো কেবল নিউরনের কার্যকলাপের সমষ্টি কি না, সেটিই এখনো গভীর দার্শনিক প্রশ্ন।

কোমা এই প্রশ্নটিকে আরও তীব্র করে তোলে। কারণ বাইরে থেকে একজন কোমায় থাকা মানুষ প্রায় সম্পূর্ণ প্রতিক্রিয়াহীন মনে হতে পারেন। কিন্তু বাহ্যিক প্রতিক্রিয়ার অনুপস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি সব ক্ষেত্রে একই বিষয় নয়। 

কিছু রোগীর ক্ষেত্রে পরবর্তী পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, শরীর দিয়ে সাড়া দিতে না পারলেও মস্তিষ্কে কিছু ধরনের সংগঠিত কার্যকলাপ থাকতে পারে। আধুনিক নিউরোইমেজিং ও ইলেক্ট্রোফিজিওলজিক্যাল গবেষণা এ কারণেই চেতনা সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে আরও জটিল করেছে।

Coma: Causes, diagnosis, treatment, and outlookদর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: 
আমরা কীভাবে নিশ্চিত হব যে অন্য একজন মানুষ সচেতন? আমি যখন বলি: “আমি ব্যথা অনুভব করছি”, তখন নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আমার সরাসরি জ্ঞান আছে। কিন্তু অন্য একজন মানুষ ব্যথা অনুভব করছেন কি না, তা আমি সরাসরি দেখতে পারি না। 

আমি তার কথা, আচরণ, শারীরিক প্রতিক্রিয়া এবং মস্তিষ্কের কার্যকলাপ দেখে অনুমান করি। এই সমস্যাকে দর্শনে অন্য মনের সমস্যা বা Problem of Other Minds বলা হয়।

কোমা এই সমস্যার সবচেয়ে কঠিন বাস্তব উদাহরণগুলোর একটি। একজন মানুষ যদি কথা বলতে না পারেন, চোখ দিয়ে যোগাযোগ করতে না পারেন এবং কোনো নির্দেশ অনুসরণ করতে না পারেন, তাহলে তার অভ্যন্তরে কোনো অভিজ্ঞতা আছে কি না, তা নির্ণয় করা অত্যন্ত কঠিন হতে পারে।

এ কারণেই কোমা শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় নয়। এটি আমাদের “মানুষ” বলতে কী বোঝায়, সেই প্রশ্নের কাছেও নিয়ে যায়। মানুষের পরিচয় কি তার শরীর? তার স্মৃতি? তার ব্যক্তিত্ব? নাকি তার সচেতন অভিজ্ঞতা?

ধরা যাক, একজন মানুষের শরীর জীবিত আছে, হৃদস্পন্দন চলছে, মস্তিষ্কের কিছু অংশ সক্রিয় রয়েছে, কিন্তু তার কোনো সচেতন অভিজ্ঞতা নেই। অন্যদিকে আরেকজন মানুষের শরীর প্রায় সম্পূর্ণ অচল, কিন্তু তার ভেতরে সচেতন চিন্তা ও উপলব্ধি রয়েছে। তাহলে কোন অবস্থায় একজন মানুষকে বেশি সচেতন বলা হবে?

  • দর্শনের মনদর্শন বা Philosophy of Mind দীর্ঘদিন ধরে চেতনার প্রকৃতি নিয়ে বিতর্ক করে আসছে। বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী চেতনা মস্তিষ্কের ভৌত কার্যক্রমের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত এবং মস্তিষ্কের কার্যক্রমের পরিবর্তনের সঙ্গে চেতনাও পরিবর্তিত হয়। 

অন্যদিকে দ্বৈতবাদী চিন্তাধারা মনে করে, মানসিক অভিজ্ঞতাকে শুধু ভৌত প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা কঠিন। কোমা এই বিতর্কের কোনো একটি পক্ষকে সরাসরি প্রমাণ করে না, কিন্তু প্রশ্নটিকে বাস্তব ও গভীর করে তোলে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোমাকে শুধু “ঘুমের মতো একটি অবস্থা” ভাবা ভুল। ঘুম একটি স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রিত শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। কোমা সাধারণত গুরুতর মস্তিষ্কীয় অস্বাভাবিকতার ফল। একইভাবে কোমা থেকে জেগে ওঠার সম্ভাবনাও নির্ভর করে এর কারণ, মস্তিষ্কের ক্ষতির মাত্রা, কতক্ষণ অবস্থা স্থায়ী হয়েছে এবং অন্যান্য চিকিৎসাগত বিষয়ের ওপর।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!